(সপ্তম পর্বের পর)
বিকেলের মিষ্টি আলো চোখে পড়তেই ঘুম ভেঙে গেল সাদের। রাতের উত্তেজনা, লম্বা জার্নিতে শরীর ভেঙে আসছিল। এখন ফ্রেশ লাগছে খুব। ঘুম ভাঙলেও বিছানা থেকে নামতে আলসেমি লাগছে সাদের। চিৎ হয়ে শুয়ে সিলিংয়ে থাকা ফ্যানের ঘূর্ণন দেখছে। পাশের দুই বিছানায় ফাহিম ও নিলয় এখনো ঘুমোচ্ছে।
নাহ! তাদের ডাকার কোনো প্রয়োজন নেই। সবাই খুব ক্লান্তির সময় পার করেছে। একটু ঘুমোক ওরা। এখনই ডাকার প্রয়োজন নেই। রাতে গাড়িতে ঘুমালেও কারোরই ঠিক মতন ঘুম হয় নি। তাই বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়ার সাথে সাথেই ঘুম! শান্তির ঘুম বোধহয় একেই বলে।
ঘুমের কারণে দুপুরে খাওয়া হয়নি। দুপুর পেরিয়ে এখন বিকেল। একটু ক্ষুধা ক্ষুধা লাগছে। আলসেমি লাগা সত্বেও বিছানা ছেড়ে উঠে বাথরুমে গেলো সাদ। ফ্রেশ হয়ে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এলো। আনিস চাচাকে খুঁজছে। নীচে নেই। বাগানের দিকে খুঁজে দেখার কথা ভাবলো। সেখানে থাকতে পারে।
কোথাও দেখা নেই আনিস চাচার। বাগানের মাঝে বড় একটি টি-টেবিল। এর চারপাশে ছড়ানো ছিটানো বেশকিছু চেয়ার। এর পাশে একটা দোলনা দুলছে। সেই দোলনায় দোল খাচ্ছে অমি আর সানজিদা।
‘মহারাজের ঘুম ভাঙল?’ সাদকে দেখে জিজ্ঞেস করল অমি।
বড় একটা হাই তুলে মাথা নাড়িয়ে সম্মত জানালো সাদ। চেয়ার টেনে দুজনের মুখোমুখি বসে বলল, ‘আমি মোটেও মহারাজ নই।’
‘এই জন্যই মরার মতো ঘুমিয়ে ছিলি?’ বলল অমি। ‘এত করে ডাকলাম! কারো কোনো সাড়াশব্দ নেই।’ অবাক হলো সাদ। এমনিতে তার ঘুম খুব পাতলা। একটু শব্দতেই ঘুম ভেঙে যায়। সেখানে অনেকক্ষন ধরে ডাকার পরও ঘুম ভাঙল না! কি করে সম্ভব?’
‘আহা!’ অমিকে বাঁধা দিয়ে বলল সানজিদা। ‘কাল সারারাত এত জার্নিতে ঘুমাতেই পারে। আমরাও কি কম ঘুমিয়েছি নাকি?’ প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিল অমি। ওর কথা কানে না নিয়ে সাদকে জিজ্ঞেস করল সানজিদা, ‘বাকি দুইজন কই?’
‘ওরা এখনো ঘুমাচ্ছে।’ জবাব দিলো সাদ।
‘এখনো ঘুমাচ্ছে!’ অবাক হলো অমি। উঠে দাঁড়াল। ‘এখনই ওদের তুলে আনছি। এখানে কি এসেছি ঘুমানোর জন্য?’ বলেই ছুটতে শুরু করল অমি।
‘দাঁড়া, আমিও আসছি।’ অমির পিছনে পিছনে দৌড়াতে লাগল সানজিদা। সাদের কি যাওয়া উচিৎ? একবার ভাবল যাবে। পরে আবার চিন্তা করল, না থাক। ওদের কাজ ওরাই করুক। এখানে ভালো লাগছে। এখান থেকে দূরের নদী দেখা যায়। কলকল, চলাচল করে বয়ে যাচ্ছে ঢেউ। সেদিক থেকে বয়ে আসা মিষ্টি বাতাস এসে লাগছে মুখে। কেমন এক অদ্ভূত প্রশান্তিতে ছেয়ে যাচ্ছে মন! হারিয়ে যেতে ইচ্ছে হয় এই প্রকৃতির মাঝে।
সাদের প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাওয়া আর হলোনা। কেননা, বাড়ির ভিতর থেকে অমির কন্ঠ ভেসে আসছে। নিলয় আর রিফাতকে ঘুম থেকে তুলে বিজয়ীর বেশে আসছে অমি আর সানজিদা। ‘তোদের জন্য দুপুরে না খেয়ে বসে আছি,’ আসতে আসতে বলল অমি। ‘আর তোরা এভাবে ঘুমাবি?’
ঠিকই বলেছে অমি। সবারই ক্ষুধা লেগেছে। আনিস চাচাকে খুঁজে বের করে খাবার দিতে বলল অমি। ডাইনিং টেবিলে যেয়ে ওরা দেখে সে এক এলাহী কান্ড। খিচুড়ি, দুই পদের মাছ, মুরগী ভুনা, গরুর মাংস ভুনা, চিংড়ি মালাইকারি, বেশ কয়েক পদের ভর্তা। এত সব খাবার দেখে হাসি ফুটেছে রিফাতের মুখে। বাকিদের চোখ বড় বড়। এত খাবার কে খাবে? অনেক দিন পর অমি এসেছে, সেই সাথে তার বন্ধুরা প্রথমবার এই গ্রামের অতিথি হয়ে এসেছে। তাই এত আপ্যায়ন।
তৃপ্তির সাথে খাওয়া শেষ করল সবাই। আনিস চাচাকে অসংখ্য ধন্যবাদ দিল, এত সুস্বাদু খাবার খাওয়ানোর জন্য। চাচা জানালো তার বউয়ের হাতের রান্না। কিন্তু চাচীর সাথে দেখা জন্য আফসোস করল সবাই।
‘হ্যাঁ, চাচা।’ বলল ঐশী। ‘চাচীকে দেখলাম না সারাদিন।’
‘তোমরা তো ঘুমাচ্ছিলে,’ জবাব দিলো আনিস চাচা। ‘তাই দেখা হয় নাই। সারাদিন কাজকর্মে ব্যস্ত ছিল অনেক। রাতে খাবার টেবিলে দেখা হবে।’
বিশাল বাড়িতে অনেক মানুষজন থাকলেও একজনের সাথে আরেকজনের অনেক সময় দেখা হয় না। খাওয়া শেষে ঐশী প্রস্তাব দিলো এই পড়ন্ত বিকেলে গ্রামটা ঘুরে আসা যাক! সবাই এক কথায় রাজি। ঘুরতেই তো এসেছে। বাসায় বসে থাকার কোনো মানে হয় না।
বিকেলের মিষ্টি রোদে গ্রামের মেঠো পথে হত্যার মজাই আলাদা। পুকুর পাড়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিলো সাদ। বাকিদের কোনো আপত্তি নেই।
সূর্যের আলো মিলিয়ে যেতে বসেছে। পুকুরের স্বচ্ছ পানিতে আবছা সূর্যের প্রতিচ্ছবি যেন এক রহস্যময় আবহ তৈরি করে। পুকুরের পর ঘেঁষে এসে দাঁড়ালো সবাই। এক হিম শীতল বাতাসের ঝাপটা এসে লাগলো মুখে। পুকুরের অপর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য নারিকেল গাছ। নারিকেল গাছের সারির ফাঁক গলে দূরে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা তাল গাছ দেখা যাচ্ছে। যেন আকাশ ছোঁয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা। সেই তাল গাছের মাথার ফাঁকে হারিয়ে যাচ্ছে বিকেলের সূর্য। পৃথিবীকে আঁধারে গ্রাস করতে তার শত আয়োজন। শহরের চারদেয়ালে এমন দৃশ্য দেখা যায় না।
‘অপূর্ব না?’ বলল সানজিদা। কেউ কোনো জবাব দিলো না। এমন দৃশ্য উপভোগ করতে হয়। কথা বলে সময় নষ্ট করার মানে হয় না।
একটু একটু করে সূর্য হারিয়ে যাচ্ছে দূরের দিগন্তে। সেই সাথে ধীরে ধীরে আঁধার নামছে। এমন সময় বিকট শব্দে কেঁপে উঠল মাটি। প্রকৃতির মাঝে এমনভাবে হারিয়ে গিয়েছিল, বিকট এ শব্দে রীতিমতো চমক উঠল সবাই। অমি এত জোরে চিৎকার করে উঠেছিল, সাথে ভয়ে লাফিয়ে উঠেছিল একটু হলেই পুকুরে পড়ে যেত। ভাগ্য ভালো, সময় মতো ফাহিম তাকে ধরে ফেলেছে।
কিসের আওয়াজ? আকাশের দিকে তাকালো সাদ। আকাশ তো পরিস্কার! মেঘের ছিটেফোঁটা নেই। বজ্রপাত না। তাহলে?
আবারো একইভাবে বিকট আওয়াজ। মনে হলো পায়ের নিচের মাটি যেন কেঁপে উঠেছে। ভয়ের চোটে সাদের বহু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল অমি। আর নিলয়কে ধরল সানজিদা। আকস্মিক এ ঘটনায় এমন বিহ্বল হয়ে উঠল সবাই, কারো মুখে কোনো কথা নেই।
‘কিসের আওয়াজ?’ বিস্ময়ের ঘোর কাটতেই নীরবতা ভেঙে জিজ্ঞেস করল নিলয়। কেউ কোনো জবাব দিলো না। নিলয়ের মতো একই প্রশ্ন সবার মনে। কেউ জানেনা এই অচেনা আওয়াজ কিসের।
চলবে…
পেপারস লাইফ/গল্প/সাকিব আহমেদ
পড়ুন:

