দেশে চলমান করোনা সংক্রমণের ফলে সিগারেটসহ সব ধরনের তামাকজাত পণ্যের উৎপাদন, সরবরাহ, বিপণন ও বিতরণ সাময়িকভাবে বন্ধের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে বুধবার (২০ মে) দুপুরে জানিয়েছিলেন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন।
তবে বিকেলে একই মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সামগ্রিক বিবেচনায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে এ শিল্প চালু রাখা যুক্তিসঙ্গত হবে বলে শিল্প মন্ত্রণালয় মনে করে। এর মাধ্যমে কার্যত সিগারেটসহ তামাক পণ্য উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধ হচ্ছে না বলেই জানানো হলো।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, তামাক উৎপাদন এবং তামাকজাতীয় পণ্য সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ মর্মে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনকে উদ্ধৃত করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে পরিবেশিত সংবাদের প্রতি শিল্প মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে।
“এ বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য হলো, বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের প্রাথমিক পর্যায়ে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি ও লকডাউনের সূচনালগ্নে দুটি তামাক কোম্পানির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শিল্প মন্ত্রণালয় হতে যথাক্রমে গত ৩ এপ্রিল এবং ৫ এপ্রিল আবেদনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্টদের কাছে অনুরোধপত্র প্রেরণ করে।
পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব গত ৯ এপ্রিল জরুরি সেবা ও সরবরাহ শৃঙ্খল যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাসহ পরিপত্র জারি করেন। এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব গত ২৪ মার্চ জরুরি সেবা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ বিষয়ে একটি প্রেসনোট জারি করেন।”
“উল্লেখ্য, ১৯৫৬ সালের The Control of Essential Commodities Act অনুযায়ী সিগারেট একটি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য। এ বিবেচনায় শিল্প মন্ত্রণালয় কোভিড-১৯ সংক্রমণ চলাকালে তামাক কোম্পানির উৎপাদন সরবরাহ ও পরিবহনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহায়তার অনুরোধ জানিয়ে পত্র দিয়েছিল”- বলা হয় বিজ্ঞপ্তিতে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অধীন জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের উদ্দেশ্যের সাথে শিল্প মন্ত্রণালয়ের কোনো ভিন্নতা নেই। শিল্প মন্ত্রণালয়ও প্রধানমন্ত্রীর ২০৪১ সালের মধ্যে ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার ঘোষণার নীতিকে পূর্ণাঙ্গভাবে সমর্থন করে এবং এ লক্ষ্যে কাজ করছে।
“টোব্যাকো বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। এ শিল্পের সাথে দেশের হাজার হাজার প্রান্তিক চাষী এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি জড়িত। জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হলেও শিল্পোন্নত দেশগুলোসহ গোটা বিশ্বে এখন পর্যন্ত তামাক শিল্প চালু রয়েছে। বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এককভাবে এ শিল্পের অবদান সবচেয়ে বেশি। আমাদের জাতীয় রাজস্ব আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ এ শিল্পখাত থেকে আসে।
তাই এই শিল্প হুট করে বন্ধ করে দেয়া হলে, একদিকে যেমন দেশ বিরাট অংকের রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হবে, অন্যদিকে তেমনি বিপুল পরিমাণে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগও বন্ধ হয়ে যাবে। আবার তামাক পাতা না কিনলে প্রান্তিক চাষিরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এছাড়া এ ধরনের সিদ্ধান্ত আমাদের দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি নেতিবাচক ধারণা দেবে। ফলে আমাদের বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ধূমপান কিংবা তামাকজাতীয় পণ্যের ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হলেও এর সেবনকারীরা তা জেনে-শুনেই সেবন করছেন। এ শিল্প সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিলেও তারা এটি সেবন করবেন।
এক্ষেত্রে ব্যক্তিগত মোটিভেশন ছাড়া শুধু সাময়িক উৎপাদন বন্ধ করে করোনাকালে ধূমপান প্রতিরোধ করা যাবে না। অধিকন্তু এর উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে কালোবাজারিরা উৎসাহিত হবে এবং আমদানিকৃত সিগারেটসহ তামাকজাত পণ্যের মাধ্যমে দেশ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা ও রাজস্ব আয় হারাবে। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অধীন জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল ধূমপায়ী ও তামাক জাতীয় পণ্য সেবীদের মধ্যে এটি পরিহারের জন্য প্রচার জোরদার করতে পারে।
শিল্প মন্ত্রণালয় বলছে, করোনা পরিস্থিতিতে এমনিতেই বৈশ্বিক অর্থনীতির মতো বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে যথেষ্ট চাপ তৈরি হয়েছে এবং আগামী দিনে অনিবার্যভাবে এই চাপ বাড়বে।
করোনা প্রাদুর্ভাবের ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিল্প-কারখানা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকটা স্থবির হয়ে রয়েছে। এতে করে প্রান্তিক পর্যায়ে অনেক লোকজন বেকার হয়ে গেছেন।
প্রধানমন্ত্রী সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে নগদ অর্থ ও ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচি গ্রহণ করলেও উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সরকারের জন্য দীর্ঘদিন এটি চালিয়ে নেয়া কষ্টকর হবে। এই অবস্থায় বিদ্যমান কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং শিল্প উৎপাদন বন্ধ করলে, তা হবে জাতীয় মারাত্মক ক্ষতি।
“সামগ্রিক বিবেচনায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে এ শিল্প চালু রাখা যুক্তিসঙ্গত হবে বলে শিল্প মন্ত্রণালয় মনে করে। পাশাপাশি ধূমপান ও তামাক জাতীয় পণ্য সেবনের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাধিক গবেষণা পর্যালোচনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সম্প্রতি জানিয়েছে, অধূমপায়ীদের তুলনায় ধূমপায়ীদের কোভিড-১৯ সংক্রমণে মারাত্মকভাবে অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। এছাড়াও গবেষণা দেখা গেছে, কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত ধূমপায়ীর মৃত্যুঝুঁকিও ১৪ গুণ বেশি।
এতে আরও বলা হয়, কোভিড-১৯ সংক্রমণ মোকাবিলায় ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সাময়িকভাবে সিগারেট ও তামাকজাত পণ্য ক্রয়-বিক্রয়, সীসা বার, উন্মুক্তস্থানে পানের পিক ফেলার মতো বিষয়গুলো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশেও কোভিড-১৯ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় সরকার কোভিড-১৯ মোকাবিলায় বহুমাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে। স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ ক্রমবর্ধমান কোডিড-১৯ রোগ প্রতিরোধে, শনাক্তকরণ ও চিকিৎসাসেবা প্রদানে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে দেশের তামাক কোম্পানিগুলোকে উৎপাদন, সরবরাহ ও বিপণন করার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয় কর্তৃক বিশেষ অনুমতিপত্র প্রদান করা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
চিঠিতে বলা হয়, জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা মোকাবিলা এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি হ্রাস করতে প্রণীত সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮-এ সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধে বাজার, গণজমায়েত সাময়িকভাবে বন্ধ, দেশের অভ্যন্তরে একস্থান থেকে অন্যস্থানে চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু তামাক কোম্পানিগুলো শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত নির্দেশনার অজুহাতে এ আইন লঙ্ঘন করে চলেছে।
কোভিড-১৯ সংক্রমণ ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় এগিয় নিতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা বিশেষ প্রয়োজন উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ১৫ বছরের ঊর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর ৩ কোটি ৭৮ লাখ তামাক সেবন করে (গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোবাকো সার্ভে ২০১৭) ও তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে বছরে ১ লাখ ৬১ হাজারের অধিক লোক মারা যায় (দ্য টোবাকো এটলাস, ২০১৮)।
তামাক খাত থেকে রাজস্ব আয়ের চাইতে তামাকজনিত রোগব্যাধির চিকিৎসা ব্যয় অনেক বেশি। বাংলাদেশ সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করেছে এবং এর আলোকে ২০১৩ সালে ‘ধুমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন’র সংশোধনী পাস ও ২০১৫ সালে বিধিমালা জারি করেছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থে করোনা ভাইরাসজনিত কোভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তামাক কোম্পানিকে দেয়া অনুমতি প্রত্যাহারসহ সকল তামাক কোম্পানির উৎপাদন, সরবরাহ, বিপণন এবং তামাকপাতা ক্রয়-বিক্রয় কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করার জন্য চিঠির শেষ অংশে অনুরোধ করা হয়।

