“সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ব্যাহতকারী কোনো উদ্ভট ধারণাকে প্রশ্রয় দিবেন না”



আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা গণতন্ত্র ও আইনের শাসনে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি দেশের সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। দেশের সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে এমন কোনো উদ্ভট ধারণাকে প্রশ্রয় না দেওয়ার ও আহবান জানান তিনি। তিনি বলেন, “আগামী ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গণতন্ত্র ও আইনের শাসনে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলসমূহ এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনুরোধ, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, এমন কোন উদ্ভট ধারণাকে প্রশ্রয় দেবেন না এবং ইন্ধন যোগাবেন না।” আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আজ সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে এই আহ্বান জানান।

ভাষনে তিনি ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে ‘স্মার্ট বাংলাদেশে’ পরিণত করার জন্য তার দলের লক্ষ্য তুলে ধরেন এবং অতীতের ভুলগুলো ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার এবং পুনরায় নির্বাচিত হলে সেই ভুলগুলো শোধরানোর একটি সুযোগ হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, “আপনারা নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে আপনাদের সেবা করার সুযোগ দিয়েছেন। আমি আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। এই দীর্ঘ চলার পথে যতটুকু অর্জন, তার সবটুকুই আপনাদের অবদান। আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া এ অর্জন করা সম্ভব হতো না। চলার পথে যদি কোন ভুল-ভ্রান্তি করে থাকি, তাহলে আপনারা ক্ষমা সুন্দর চোখে দেখবেন- এটাই আমার আবেদন। আবার সরকার গঠন করতে পারলে, ভুলগুলি শোধরাবার সুযোগ পাব। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে ‘নৌকা’ মার্কায় ভোট দিয়ে আমাকে আপনাদের সেবা করার সুযোগ দিন।”

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও জাতির পিতার কন্যা বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজীবন সংগ্রাম করেছেন এদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য, দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য। আমি বাবা, মা, ভাই সব হারিয়ে দুঃখ-বেদনাকে সম্বল করে আপনাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। আপনাদের মাঝে খুঁজে পেয়েছি- আমার বাবার স্নেহ, মায়ের মমতা এবং ভাইয়ের মায়া। আপনারাই আমার পরিবার, আমার উপর ভরসা রাখুন। আসুন, সকলে মিলে এই বাংলাদেশকে স্মার্ট সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের স্বপ্ন পূরণ করি। তিনি বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত টানা ৩ মেয়াদে আওয়ামী লীগ লীগ সরকার গণতান্ত্রিক ধারা ও স্থিতিশীলতা বজায় রেখে জনকল্যাণমুখী ও সুসমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে একটি সমতা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক দেশ বিনির্মাণের পথে জাতিকে অগ্রসরমান রেখেছে। ইতোমধ্যে উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের একটি টেকসই ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে।

বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জন করেছে। ২০২৬ সাল থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা শুরু হবে। তিনি বলেন, “উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার যে সুযোগ পাওয়া যাবে, তা কার্যকর করা এবং যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, তা একমাত্র আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেই মোকাবিলা করতে পারবে। বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রেক্ষিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছি”। তিনি বলেন, সম্ভাবনাময় বিশাল তরুণ সমাজ হবে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের মূল কারিগর। তারুণ্যের শক্তি বাংলাদেশের অগ্রগতি।

শেখ হাসিনা বলেন, “আমরা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রত্যাশা করছি। এই প্রথম বাংলাদেশে আইনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে আর্থিকভাবে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা নির্বাচন কমিশনের অধীনে ন্যাস্ত করা হয়েছে। সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনা করছে। আমাদের সরকার সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনকে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, গণমানুষের দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় আসে, দেশের মানুষের অর্থ-সামাজিক উন্নতি নিশ্চিত করে। জনগণের খাদ্য, নিরাপত্তা, চিকিৎসা, বাসস্থান, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ব্যাপক হারে অবকাঠামো উন্নয়ন হয়। জাতির পিতর দিয়ে যাওয়া দেশের পররাষ্ট্র নীতির প্রসংগ টেনে তিনি বলেন, আমরা শান্তিতে বিশ্বাস করি, সংঘাতে নয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সকলের সাথে বন্ধুত্ব কারো সাথে বৈরিতা নয়, এই নীতিতেই আমরা বিশ্বাস করি। এই নীতি নিয়েই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।
স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে আমরা বর্তমান যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার উপযোগী করে উন্নত করেছি।

তিনি বলেন,“আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই। প্যালেস্টাইন ও ইউক্রেইন যুদ্ধ বন্ধ হোক আমরা সেটাই চাই। প্যালেস্টাইনে যে গণহত্যা চলছে, আমরা তার অবসান চাই। বাংলাদেশ সব সময় প্যালেস্টাইনের জনগণের পক্ষে আছে। ”

শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে নির্বাচনী ইশতেহারে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনাকে ধারণ করে দেশ পরিচালনায় যে সাফল্য আমরা করতে পেরেছি তারই ধারাবাহিকতায় আমরা ২০২৪ সাল থেকে স্মার্ট সোনার বাংলা গড়ে তোলার ইশতেহার ঘোষণা দিয়েছি। এবারের ইশতেহারে জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে যে বিষয়গুলি উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্য থেকে যে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছি আমি তা আপনাদের সামনে উল্লেখ করছি:
১. সর্বস্তরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সুরক্ষা ও চর্চার প্রসার করা।
২. দ্রব্যমূল্য সকলের ক্রয় ক্ষমতার আওতার মধ্যে রাখার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
৩. কর্মোপযোগী শিক্ষা ও যুব সমাজের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।
৪. আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
৫. উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা যান্ত্রিকীকরণ ও উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া।
৬. কৃষি পণ্য ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলা।
৭. গ্রাম পর্যায়ে পর্যন্ত অবকাঠামো এবং শিল্প কলকারখানা গড়ে তুলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।
৮. ব্যাংক বীমা ও আর্থিক খাতের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
৯. নিম্ন আয়ের মানুষদের স্বাস্থ্য সেবা সুলভ করা।
১০. সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় সকলকে যুক্ত করে ব্যক্তি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
১১. আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করে গড়ে তোলা ও তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
১২. সাম্প্রদায়িকতা ও সকল ধরনের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূল করা।

শেখ হাসিনা বলেন, গত ২৭ ডিসেম্বর আপনাদের সামনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে তুলে ধরেছি। বিশদভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছি কি অবস্থায় দেশকে পেয়েছিলাম, আর আপনাদের জীবনমান উন্নয়নে কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পেরেছি। দেশের যে উন্নয়নের ধারা সূচিত হয়েছে, তা টেকসই করে আরও উন্নত জীবন যাতে আপনারা পান- আপনাদের ভোটে নির্বাচিত হতে পারলে আগামী ৫ বছরে আমরা কি কি কাজ করব সেই ব্যাখ্যা তুলে ধরেছি। তিনি বলেন, আজকে আপনাদের কাছে নৌকা মার্কায় ভোট চাইতে হাজির হয়েছি। এই উন্নয়নকে টেকসই করা, আপনাদের জীবন মান উন্নত করা, আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত স্মার্ট সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ চাই।

আরও পড়ুনঃ হার্টের বন্ধু কি মস্তিষ্কের শত্রু?

শেখ হাসিনা বলেন, উৎপাদন বৃদ্ধি করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দারিদ্র্য হ্রাস, ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারগুলির ঘরবাড়ি ও জীবন জীবিকার স্থায়ী ব্যবস্থা করা, যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থায় আমাদের আজকের শিশু এবং তরুণদের সুশিক্ষিত করা, স্বাস্থ্যসেবা আরও উন্নত করা, ১০০টা অর্থনৈতিক অঞ্চলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, প্রতি উপজেলায় কারিগরি ও কম্পিউটার ট্রেনিং এর সুযোগ সৃষ্টি করেছি তা সম্পন্ন করা, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন কর্মক্ষেত্র খুঁজে বের করা, গ্রামের মানুষের জন্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা, রাস্তাঘাট উন্নত করা, বিদ্যুৎ, সুপেয় পানি ও স্যানিটেশনের যে ব্যবস্থা নিয়েছি- তা টেকসই করে সকল মানুষের জীবনমান উন্নত করাই আওয়ামী লীগ সরকারের লক্ষ্য। তিনি বলেন,“আপনাদের মূল্যবান ভোটে নির্বাচিত হয়ে আরেকটিবার সরকার গঠন করতে পারলে আমাদের গৃহীত কর্মসূচিগুলি বাস্তবায়ন করে আপনাদের জীবনমান আরও উন্নত করার সুযোগ পাবো।” শেখ হাসিনা বলেন, আমরা নদী, খাল, পুকুর, জলাধার খনন, ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণ, বনায়ন সৃষ্টি, উপকূলীয় অঞ্চলে সবুজ বেষ্টনী তৈরি করে সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, নদী ভাঙ্গনের হাত থেকে দেশের জনগণকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করবো। তিনি বলেন, সড়ক, রেল, নৌ, বিমান পথ ও সেবা উন্নত করে যোগাযোগ অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন করা হবে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, অধিক ফসল উৎপাদন, খাদ্য সংরক্ষণ, খাদ্য ও কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াজাত করা, দেশের চাহিদা পূরণ করা ও বিদেশে রপ্তানির উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার কাজ অব্যাহত থাকবে বলেও উল্লেখ করেন।

তাঁর সরকারের রপ্তানি বাণিজ্য সম্প্রসারণ নীতি অব্যাহত রাখার প্রসংগ টেনে তিনি বলেন, রপ্তানি বাণিজ্য সম্প্রসারণ করার লক্ষ্যে নতুন বাজার খুঁজে বের করা, উপযুক্ত পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা হবে। সে ক্ষেত্রে ডিজিটাল ডিভাইস, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত, ঔষধ, কুটির শিল্প, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও ভারী শিল্প উৎপাদন, জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ রিসাইক্লিনং শিল্প, ও কারখানা গড়ে তোলার কাজ অব্যাহত থাকবে। ব্যাপক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তিনি বলেন, এই লক্ষ্যে কৃষি পণ্য, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, প্রযুক্তি বিজ্ঞান, পরমাণু গবেষণা, এ্যায়ারোস্পেস ও এভিয়েশন গবেষণা, সমুদ্র গবেষণা, জলবায়ু পরিবর্তন গবেষণার জন্য ইন্সটিটিউশন ও গবেষণাগার তৈরির কাজ সম্পন্ন করতে হবে।

অর্থনীতির যে কোনো সূচকে বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০০৯ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়ে উৎকর্ষতা সাধন হয়েছে। ২০০৯ সালে জিডিপির পরিমাণ ছিল মাত্র ১০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৩ সালে জিডিপির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ৪৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যায়। আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মোট ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ৭ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। ২০০৯ সালের জুন পর্যন্ত ২২ হাজার কোটি টাকার মন্দ ঋণ ছিল, যা মোট ঋণের ১০.৫ শতাংশ। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস শেষে ছিল ১ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকার মন্দ ঋণ, যা মোট প্রদত্ত ঋণের ৯.৯ শতাংশ। তিনি বলেন, “যারা সমালোচনা করেন- দুঃখের বিষয় যে, তারা সঠিক তথ্যটা জাতির সামনে তুলে ধরেন না। দেশের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা তাদের চরিত্র। মনে হয়, বাংলাদেশের জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নতি দেখলে তারা বিমর্ষ হয়ে পড়ে।”

তিনি বলেন, ১৫ বছর আগের বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশের মধ্যে বিরাট ব্যবধান। মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটেছে। মানুষ আজ স্বপ্ন দেখে উন্নত জীবনের। স্বপ্ন দেখে সুন্দরভাবে বাঁচার। প্রবৃদ্ধি ৭.২৫ শতাংশ, মাথাপিছু আয় ৫ গুণ বৃদ্ধি। বাজেটের আকার ১২ গুণ বৃদ্ধি। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ১৩ গুণ বৃদ্ধি। জিডিপির আকার ১২ গুণ বৃদ্ধি। বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ৩৬ গুণ বৃদ্ধি। রপ্তানি আয় ৫ গুণ বৃদ্ধি। বার্ষিক রেমিটেন্স ৬ গুণ বৃদ্ধি। বৈদেশিক বিনিয়োগ এফডিআই ৫ গুণ বৃদ্ধি। একজন কৃষি-শ্রমিকের ক্রয় ক্ষমতা ৩ গুণ বৃদ্ধি। শ্রমিকদের মজুরি ৯ গুণ বৃদ্ধি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬ গুণ বৃদ্ধি। রপ্তানি আয় ৫ গুণ বৃদ্ধি। দারিদ্র্য হার ৪১.৫১ শতাংশ থেকে ১৮.৭ শতাংশে হ্রাস। অতি দারিদ্র্য হার ৫ গুণ কমেছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৮ গুণ বৃদ্ধি। বিদ্যুৎ সুবিধা ভোগের হার ২৮ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি। সাক্ষরতার হার ৭৬.৮ শতাংশ বৃদ্ধি। কারিগরি শিক্ষা ২২ গুণ বৃদ্ধি। দানাদার শস্য উৎপাদন ৪ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি প্রমত্তা পদ্মার ওপর নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু ও বিভিন্ন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রসংগ টেনে বলেন, আমরা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছি। ঢাকায় মেট্রোরেল চালু করেছি, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে, পাতাল রেলের কার্যক্রম উদ্বোধন করেছি। রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছি। উদ্বোধন করা হয়েছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল। চট্টগ্রামে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম পাতাল সড়কপথ- ‘বঙ্গবন্ধু টানেল’ নির্মাণ করেছি। কক্সবাজারে দৃষ্টিনন্দন রেলস্টেশন স্থাপন করে ঢাকা-কক্সবাজার রেল রুট চালু করেছি। ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ উৎক্ষেপণ করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা নির্বাচন কমিশন সংস্কার এবং জনগণের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ায় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন উদ্যোগ এবং বিএনপি-জামায়াতের নির্বাচনের নামে প্রহসন ও দু:সানের কিছু খন্ডচিত্রও তাঁর ভাষণে তুলে আনেন।

তিনি বলেন, দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। অবসান হয় হত্যা, ক্যু ও সামরিক শাসনের। ’৭৫-পরবর্তী অবৈধ সরকারগুলোর জনবিচ্ছিন্নতা, লুটপাট ও দর্শনবিহীন রাষ্ট্র পরিচালনা বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাহীন রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ পরিচিতি পেয়েছিল বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং ভিক্ষুক-দরিদ্র-হাড্ডিসার মানুষের দেশ হিসেবে।

আওয়ামী লীগ প্রধান বলেন, ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন থেকে ২০০১ সালের ১৫ জুলাই- এই ৫ বছর পূর্ণ করে ২৬ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বপ্রথম শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। দেশ যখন আর্থিক স্থবিরতা কাটিয়ে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মহাসড়কে অভিযাত্রা শুরু করে, ঠিক তখনই ২০০১ সালে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বিএনপি-জামাত আবার ক্ষমতায় আসে। রাষ্ট্রীয় ছত্রছায়ায় শুরু হয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের উপর নির্যাতন-নিপীড়ন। ২১ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়। শুধু রাজনৈতিক কারণে বহু চলমান উন্নয়ন প্রকল্প স্থগিত করে দেওয়া হয়। ‘হাওয়া ভবন’ খুলে অবাধে চলতে থাকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ ও দু:শাসন। তিনি বলেন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশে গ্রেনেড হামলা করে ২২ নেতা-কর্মীকে হত্যা এবং ৫০০’র বেশি মানুষকে আহত করে। জেলায় জেলায় বোমা হামলা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অস্ত্রের ঝনঝনানি, সেশন জট, ছাত্রছাত্রীদের অনিশ্চিত জীবন ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়কার সাধারণ চালচিত্র। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, অস্ত্র চোরাকারবারি, মানি লন্ডারিং, ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ, হাওয়া ভবনের দ্বৈত শাসনে জনজীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছিল।