প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠিত ‘জাপান সেল’ জাপানে বাংলাদেশি জনশক্তি প্রেরণের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই সিদ্ধান্তগুলো প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নির্দেশনায় নেওয়া হয়েছে, যা কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য হ্রাসে সহায়ক হবে। মন্ত্রণালয় থেকে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে প্রেরিত একটি চিঠিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
গত ৩ সেপ্টেম্বর প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত তৃতীয় সভায় এই সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয়। সভায় জোর দেওয়া হয়েছে জাপান সেলের কার্যক্রম জনগণের কাছে তুলে ধরতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সেক্রেটারির মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালানোর উপর। ফেসবুক পোস্টে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এবং জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূতের উদ্ধৃতি প্রকাশ করা হবে, যা প্রধান উপদেষ্টার অফিসিয়াল পেজে প্রচারিত হবে।
জাপানকে বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জাপান টাইমসের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ২০৪০ সালের মধ্যে জাপানে কর্মক্ষম জনশক্তির ঘাটতি ১ কোটি ১০ লাখে পৌঁছাতে পারে। এই ঘাটতি পূরণে বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য জাপান বিভিন্ন ভিসা ক্যাটাগরি খোলা রেখেছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালে জাপানে প্রায় ৩৫,০০০ বাংলাদেশি কর্মী কাজ করছেন, যা পরবর্তী বছরগুলোতে আরও বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের অনুপ্রেরণায় এই সুযোগ বৃদ্ধির জন্য ন্যাশনাল বিজনেস সাপোর্ট কো-অপারেটিভ ফেডারেশন (এনবিসিসি), জাপান-বাংলা ব্রিজ রিক্রুটিং এজেন্সি লিমিটেড (জেবিবিআরএ) এবং কাইকোম ড্রিম স্ট্রিট বিডি কোম্পানি লিমিটেডের (কেডিএস) সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তিগুলোর মাধ্যমে পরবর্তী পাঁচ বছরে ১ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী জাপানে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
শ্রমবাজার সম্প্রসারণে ‘জাপান ডেস্ক’ চালু করা হয়েছে, যা শ্রমবাজারের চাহিদা যাচাই, কর্মসংস্থানের সুযোগ চিহ্নিতকরণ ও প্রচার, কর্মীদের জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল টেস্ট, তথ্যসংগ্রহ এবং জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের কাজ করবে। ড. আসিফ নজরুল বলেন, “জনশক্তি রপ্তানির মূল লক্ষ্য কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য বিমোচন। জাপান ডেস্ক এই লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।” জাপানের রাষ্ট্রদূত জানান, জাপান সরকার এখন দক্ষ ও মানসম্পন্ন কর্মী নিয়োগে জোর দিচ্ছে। এজন্য জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ ও টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কেডিএস বিশেষ করে নার্সিং সেক্টরে দক্ষ কর্মী পাঠাতে প্রশিক্ষণ ক্যাম্পাস গড়ে তুলবে।
ইতিমধ্যে একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জাপান সেলের ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজ চালু, যোগাযোগের জন্য বিশেষ ই-মেইল খোলা, জাপানি ভাষা শেখার মোবাইল অ্যাপস প্রচার, কর্মপ্রার্থীদের জন্য শিক্ষাঋণ চালু, অতিরিক্ত পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপন, অনলাইন ভাষা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু, ভাষা পরীক্ষার্থীদের তথ্যভাণ্ডার তৈরি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে তদারকি কমিটি গঠন। এছাড়া ভাষা শিক্ষকদের সম্মানী বৃদ্ধি, ভিসা আবেদন প্রক্রিয়ার সমস্যা সমাধান এবং জাপানের সহায়তায় ১ লাখ কর্মী প্রশিক্ষণের প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে।
বর্তমানে স্পেসিফায়েড স্কিলড ওয়ার্কার (এসএসডব্লিউ) ক্যাটাগরির ছয়টি খাতে—কৃষি, নির্মাণ, কেয়ার ওয়ার্কার, বিল্ডিং ক্লিনিং, অটোমোবাইল পরিবহন ও শিল্প খাতে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ চলছে। ভবিষ্যতে ১৬টি খাতে এই সুযোগ বাড়ানো হবে। ২০২৭ সাল থেকে টেকনিক্যাল ইন্টার্ন ট্রেনিং প্রোগ্রামের (টিআইটিপি) পরিবর্তে এমপ্লয়মেন্ট ফর স্কিল ডেভেলপমেন্ট (ইএসডি) চালু হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং জাপান ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় নতুন প্রশিক্ষক পাঠানো হবে।
অন্যদিকে, আগামী নভেম্বর মাসে টোকিও ও নাগোইয়াতে বাংলাদেশি প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠান ও জাপানি নিয়োগকর্তাদের মধ্যে ‘ম্যাচ মেকিং ইভেন্ট’ অনুষ্ঠিত হবে। এই ইভেন্টে বাংলাদেশ থেকে জাপানে কর্মী নিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা জানান, জাপানে প্রেরণ খরচ সৌদি আরবের মতোই (প্রায় ৬-৭ লাখ টাকা), কিন্তু উচ্চ বেতন এবং দক্ষতা-ভিত্তিক চাকরির সুযোগের কারণে এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য লাভজনক। তবে, দক্ষ কর্মী তৈরির অভাবে বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে আছে, যা দূর করতে নতুন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

