সোনার দামের উত্তাপে হিমশিম জুয়েলারি ব্যবসা: বাজার কমেছে ২০ শতাংশ!


gold #paperslife

দেশে সোনার দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় জুয়েলারি ব্যবসায় মন্দা ভাব বিরাজ করছে। এক ভরি সোনার অলংকার কিনতে এখন গুনতে হচ্ছে দুই লাখ টাকার বেশি (ভ্যাট ও মজুরিসহ), যা অধিকাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। ফলে ক্রেতার আনাগোনা কমে গেছে, আর সোনার বাজারের আকার ছোট হচ্ছে দিন দিন। ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, গত পাঁচ বছরে অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের কারণে সোনার বিক্রি ৮০ শতাংশের মতো কমেছে।

করোনা মহামারির পর থেকে সোনার ব্যবসায় মন্দা শুরু হয়। বিশ্ববাজারে অস্থিরতা এবং দেশে ক্রমবর্ধমান দামের কারণে উৎসব-পার্বণেও মানুষ এখন আর আগের মতো সোনা কিনছে না। শখের বশে সোনার অলংকার কেনা প্রায় বন্ধ, এমনকি বাধ্যতামূলক কেনাকাটাও কমে গেছে। জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মীদের বেতন-ভাতা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন মালিকরা। অনেকে ব্যবসার পরিসর ছোট করছেন, এবং সামনে আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশের সোনার বাজারের আকার ছিল প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা, যা এখন ২০ শতাংশ কমে দেড় লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বাজুসের সাবেক সভাপতি ওয়াদুদ ভূইয়া বলেন, “সোনার দামের ওপর বাংলাদেশের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। বিশ্ববাজারে অল্প কয়েকজন, বিশেষ করে ইসরায়েলি ব্যবসায়ীরা, এই বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। সোনার বাজার এখন জুয়াড়িদের হাতে চলে গেছে, যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে।”

আরও পড়ুনঃ জাপানে বাংলাদেশি শ্রমিক প্রেরণে নতুন সক্রিয়তা: ১ লাখ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য, চুক্তি ও প্রশিক্ষণ প্রকল্প চালু

বিশ্ববাজারে সোনার দাম রেকর্ড গড়েছে। মঙ্গলবার (১৬ সেপ্টেম্বর) প্রতি আউন্স সোনার দাম ৩,৬৯১ ডলারে পৌঁছেছে, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর প্রভাবে বাংলাদেশে বুধবার (১৭ সেপ্টেম্বর) থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। বর্তমানে ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম ১,৮৯,৬২২ টাকা, ২১ ক্যারেট ১,৮২,০০২ টাকা, ১৮ ক্যারেট ১,৫৫,১৪৩ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির সোনা ১,২৮,৭০১ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভ্যাট (৫%) এবং মজুরি (৬%) যোগ করে ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার অলংকারের দাম দাঁড়ায় ২,১০,৪৮০ টাকা।

গত সাড়ে পাঁচ বছরে দেশে সোনার দাম বেড়েছে ২১৪ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় তিনগুণ। ২০০০ সালে ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম ছিল ৬,৯০০ টাকা, ২০১৮ সালে ৫০,০০০ টাকা, ২০২৩ সালে ১ লাখ এবং ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১.৫ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। চলতি বছরের সাড়ে নয় মাসে দাম বেড়েছে ৩৭ শতাংশ।

আরও পড়ুনঃ নির্বাহী আদেশে দল নিষিদ্ধের বিরোধিতা বিএনপির

বাজুস জানায়, চোরাচালানের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ২০০ কোটি টাকার সোনা দেশে ঢুকছে, যা বছরে ৭৩ হাজার কোটি টাকার সমান। এই অবৈধ কারবারের পেছনে দেশি-বিদেশি সিন্ডিকেট কাজ করছে, যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে। বাজুসের স্ট্যান্ডিং কমিটি অন ট্যারিফ অ্যান্ড ট্যাক্সেশনের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বলেন, “আমেরিকার শুল্ক নীতি, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, এবং চীন-ভারতের মতো দেশের সোনা মজুতের প্রবণতা দাম বাড়ার অন্যতম কারণ। খনি থেকে সরবরাহও কমে গেছে।”

ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কিছু জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সামাজিক রীতিতে সোনার অলংকার উপহার দেওয়ার প্রচলনও কমে গেছে। এখন দুই আনার একটি ছোট অলংকারের দাম ৩০ হাজার টাকা, যা অনেকের জন্য নগদ অর্থ উপহারের চেয়ে কম আকর্ষণীয়।