বিশ্বের সবচেয়ে শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও এক ধাপ অবনতি হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) সর্বশেষ ‘দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২৫’ অনুযায়ী, ১৮২টি দেশের মধ্যে নিম্নক্রম অনুযায়ী (সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত) বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৩তম। ১০০-এর স্কেলে বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়িয়েছে ২৪, যা বৈশ্বিক গড় স্কোর ৪২-এর তুলনায় অনেক নিচে।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানানো হয়। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই সূচকের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, গত বছরের তুলনায় বাংলাদেশের স্কোর ১ পয়েন্ট বাড়লেও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সামগ্রিক র্যাঙ্কিংয়ে দেশটি পিছিয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ছিল তালিকার ১৪তম অবস্থানে।
স্কোর বাড়লেও র্যাঙ্কিংয়ে পেছানোর নেপথ্যে
এবারের সূচকে বাংলাদেশের ২৪ স্কোর পাওয়াকে ড. ইফতেখারুজ্জামান একটি ‘মিশ্র বার্তা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেন, “স্কোর ১ পয়েন্ট বাড়ার পেছনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফলে সৃষ্ট একটি ইতিবাচক প্রত্যাশা ও পরিবর্তনের আবহ কাজ করেছে। তবে রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, মাঠপর্যায়ে দুর্নীতির স্থায়িত্ব এবং স্বচ্ছতার অভাবের কারণে সামগ্রিক অবস্থানে আমরা পিছিয়েছি।”
টিআইবির বিশ্লেষণে বলা হয়, ২০২৪ সালটি বাংলাদেশের জন্য ছিল রাজনৈতিক পালাবদলের বছর। স্বৈরাচারী ও ‘চোরতন্ত্র’ (Kleptocracy) ভিত্তিক শাসনের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগগুলো আন্তর্জাতিক মহলে কিছু আশার সঞ্চার করেছিল। কিন্তু দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) অকার্যকর রাখা, সম্পদ বিবরণী প্রকাশের প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়া এবং আমলাতন্ত্রের ‘দলীয়করণ’ থেকে বেরিয়ে আসতে না পারার ফলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
একনজরে দুর্নীতির চালচিত্র: ২০২৫
| সূচক বিবরণ | তথ্য ও পরিসংখ্যান |
|—|—|
| বৈশ্বিক অবস্থান (নিম্নক্রম) | ১৩তম (২০২৪ সালে ছিল ১৪তম) |
| বৈশ্বিক অবস্থান (উচ্চক্রম) | ১৮২টি দেশের মধ্যে ১৫০তম |
| প্রাপ্ত স্কোর (১০০-এর স্কেলে) | ২৪ (২০২৪ সালে ছিল ২৩) |
| বৈশ্বিক গড় স্কোর | ৪২ |
| দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থান | আফগানিস্তানের পর দ্বিতীয় সর্বনিম্ন (সবচেয়ে খারাপ) |
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে ভুটান ৭১ স্কোর নিয়ে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। এরপর ভারত ও মালদ্বীপের স্কোর ৩৯। অন্যদিকে বাংলাদেশ ২৪ স্কোর পেয়ে এই অঞ্চলে কেবল ১৬ স্কোরধারী আফগানিস্তানের ওপরে অবস্থান করছে।
এবারের বৈশ্বিক সূচকে ৮৯ স্কোর নিয়ে বরাবরের মতো সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন বা কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে ডেনমার্ক শীর্ষে রয়েছে।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে আছে যথাক্রমে ফিনল্যান্ড (৮৮) ও সিঙ্গাপুর (৮৪)। বিপরীতে মাত্র ৯ স্কোর নিয়ে যৌথভাবে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হয়েছে দক্ষিণ সুদান ও সোমালিয়া।
ভবিষ্যৎ ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি প্রধান স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, দুর্নীতি কোনো অনিবার্য ভাগ্য নয়। শ্রীলঙ্কা ও নেপালের মতো দেশগুলো যখন কঠোর বিচারিক পদক্ষেপ ও ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান উন্নত করছে, তখন বাংলাদেশ সেই সুযোগ হারাচ্ছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আমরা দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছি। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কেবল প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই খন্দক থেকে ওঠা সম্ভব নয়। দুদককে সত্যিকারের স্বাধীন করা, পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনা এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।”
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালের এই প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা। সংস্কারের যে ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা যদি দৃশ্যমান কার্যক্রমে রূপান্তর না হয়, তবে আগামীতে দুর্নীতির গ্রাস আরও গভীর হতে পারে।

