‘জুলাই গণহত্যার বিচার: থামবে না আইনি প্রক্রিয়া’


'জুলাই গণহত্যার বিচার: থামবে না আইনি প্রক্রিয়া'

জুলাই-আগস্টের নৃশংস গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া কোনো বাধায় থমকে যাবে না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি স্পষ্ট জানান, বর্তমান বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে বিচার কাজ চালিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট ‘সবুজ সংকেত’ পাওয়া গেছে।

বিচারের গতিতে আপস নেই

পনেরো বছরের শাসনের পতনের পর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দমনে যে নিষ্ঠুরতা চালানো হয়েছিল, তার বিচার এখন ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন চিফ প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, “বিচার যেভাবে চলছে, ঠিক সেভাবেই চলবে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা অন্য কোনো কারণে এই প্রক্রিয়ায় শিথিলতা আসার সুযোগ নেই।”

তাজুল ইসলাম আরও উল্লেখ করেন যে, গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসা বর্তমান সরকার বিচারের স্বচ্ছতা ও নিরবচ্ছিন্নতা বজায় রাখতে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেন, “সরকার আমাদের আস্বস্ত করেছে যে তারা ন্যায়বিচারের পক্ষে। আমরা যে স্বাধীনভাবে এবং পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি, তাতে সরকারের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।”

আদালতে কান্নার রোল: স্বজনহারাদের সাক্ষ্য

এদিন ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারিক প্যানেলে জুলাই হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা উঠে আসে। মিরপুর এলাকায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হওয়া দুই শিক্ষার্থী—ফজলে রাব্বি ও তানহার বাবারা যখন সাক্ষ্য দিচ্ছিলেন, তখন আদালত কক্ষে এক বিষণ্ণ পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

শহীদ ফজলে রাব্বির বাবা আদালতকে জানান, সেদিন কোনো উসকানি ছাড়াই আন্দোলনকারী ছাত্রদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়েছিল। অন্যদিকে, শহীদ তানহার বাবা তার একমাত্র সন্তানকে হারানোর আর্তনাদ তুলে ধরেন। তাদের সাক্ষ্যে সরাসরি অভিযুক্ত করা হয়েছে সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং তৎকালীন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের শীর্ষ নেতাদের। প্রসিকিউশন পক্ষ জানিয়েছে, এসব জবানবন্দি মামলার রায় ঘোষণার ক্ষেত্রে অকাট্য প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে।

এক নজরে আজকের কার্যক্রমের মূল তথ্য:

  • সাক্ষ্য প্রদান: মিরপুরের দুই শহীদ শিক্ষার্থীর পিতার জবানবন্দি গ্রহণ।

  • অভিযুক্তের তালিকা: ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান।

  • গুম মামলা: র‍্যাবের টিএফআই সেলে গুম-নির্যাতন মামলার শুনানি পিছিয়ে ২৫ ফেব্রুয়ারি ধার্য।

  • গাজীপুর মামলা: গাজীপুরে গুম করে হত্যার অভিযোগের পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ ২ মার্চ।

ষড়যন্ত্র ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

তাজুল ইসলাম তার বক্তব্যে বিচার বানচালের অপচেষ্টা সম্পর্কেও সতর্ক করেন। তিনি জানান, বিচারের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতে একটি মহল থেকে ষড়যন্ত্রের তথ্য পাওয়া গেছে, যা প্রসিকিউশন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে। ট্রাইব্যুনাল-১ এ র‍্যাবের আলোচিত ‘আয়নাঘর’ বা টিএফআই সেলে গুম ও নির্যাতনের মামলার অগ্রগতি নিয়েও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পরবর্তী ন্যায়বিচারের অগ্নিপরীক্ষা। বিএনপি সরকারের ‘গ্রিন সিগন্যাল’ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দৃঢ় অবস্থান সেই শহীদ পরিবারগুলোর দীর্ঘশ্বাসের অবসান ঘটাতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিচারের এই ধারা অব্যাহত থাকলে তা বাংলাদেশের ইতিহাসে দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভাঙার এক নতুন অধ্যায় হয়ে থাকবে। আগামী কয়েক সপ্তাহের সাক্ষ্যগ্রহণ এই মামলাকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।