গণমাধ্যমের খোলনলচে বদলানোর ঘোষণা মন্ত্রীর, নিশ্চিত হবে সর্বোচ্চ স্বাধীনতা


গণমাধ্যমের খোলনলচে বদলানোর ঘোষণা মন্ত্রীর, নিশ্চিত হবে সর্বোচ্চ স্বাধীনতা

দেশের গণমাধ্যম কাঠামোকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে এবং সাংবাদিকতার পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বড় ধরনের সংস্কারের ইঙ্গিত দিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে বরিশাল সার্কিট হাউজে এক গুরুত্বপূর্ণ সভা শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান, অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে সংবাদপত্রের আগামীর গতিপথ।


অবাধ তথ্যের প্রতিশ্রুতি

বরিশাল সফরের দ্বিতীয় দিনে সার্কিট হাউজে স্থানীয় প্রশাসন ও সুধী সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন মন্ত্রী। বৈঠক শেষে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আমরা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চাই যেখানে জনগণের কাছে অবাধ তথ্য সরবরাহ কোনো বাধাগ্রস্ত হবে না। তবে এই স্বাধীনতার সঙ্গে জবাবদিহিতার একটি ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। সাংবাদিকসহ সকল স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই সেই জবাবদিহিতার পরিধি নির্ধারণ করা হবে।” মন্ত্রীর এই বক্তব্যকে দেশে মুক্ত সাংবাদিকতার পথ সুগম করার একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

সনাতনী কাঠামো থেকে আধুনিক ইকোসিস্টেমে উত্তরণ

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বর্তমান প্রচার মাধ্যমের কাঠামোগত দুর্বলতার কথা অকপটে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে বিশ্ব যে আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর ইকোসিস্টেমের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, আমাদের দেশীয় গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনা এখনও সেই মানে পৌঁছাতে পারেনি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “তথ্য মন্ত্রণালয় যখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তখন বর্তমানের এই ডিজিটাল বিপ্লব বা তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক প্রচারণার ধারণা ছিল না। ফলে সময়ের প্রয়োজনে যে আমূল পরিবর্তন দরকার ছিল, তা এতদিনেও হয়ে ওঠেনি।”

মন্ত্রী আরও যোগ করেন যে, ডিজিটাল মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে প্রচলিত আইন ও ব্যবস্থাপনা অনেক ক্ষেত্রেই অকার্যকর হয়ে পড়ছে। তাই পুরো মন্ত্রণালয় এবং গণমাধ্যম নীতিমালাকে আধুনিক ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে একটি স্মার্ট মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলাই বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।


মন্ত্রীর বক্তব্যের মূল বিষয়

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সংস্কার নিয়ে মন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

  • অংশীজনদের অংশগ্রহণ: কোনো একক সিদ্ধান্তে নয়, বরং সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্ট সবার মতামতের ভিত্তিতেই নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে।

  • সর্বোচ্চ স্বাধীনতা: পেশাদার সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে সব ধরণের প্রতিবন্ধকতা দূর করে সর্বোচ্চ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি।

  • প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন: অ্যানালগ বা সনাতনী মাধ্যম থেকে বেরিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর বিশ্বমানের ইকোসিস্টেম তৈরি করা।

  • জবাবদিহিতা: স্বাধীনতার পাশাপাশি তথ্যের সঠিকতা ও বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখতে একটি স্বচ্ছ জবাবদিহিতা কাঠামো নিশ্চিত করা।

  • মন্ত্রণালয়ের সংস্কার: পুরনো আমলের প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে তথ্য মন্ত্রণালয়কে প্রযুক্তি ও আধুনিক মনস্ক করে গড়ে তোলা।


আগামীর চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা

তথ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন দেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং মুক্ত মতপ্রকাশ নিয়ে নানা বিতর্ক চলছে। জহির উদ্দিন স্বপনের এই ঘোষণায় সাংবাদিকদের দীর্ঘদিনের দাবিগুলো প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে কেবল মৌখিক ঘোষণা নয়, আইনগত পরিবর্তন এবং মাঠ পর্যায়ে তার প্রয়োগ কতটা স্বচ্ছ হবে—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ের সাংবাদিকরা যেন কোনো প্রকার ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করতে পারেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন। বরিশালের স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তথ্য অফিসের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করা হবে যাতে প্রান্তিক মানুষের কাছে সরকারি তথ্য সহজে পৌঁছায়।

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের এই সাহসী ও সময়োপযোগী বক্তব্য গণমাধ্যম কর্মীদের মাঝে আশার আলো সঞ্চার করেছে। একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং স্বাধীন গণমাধ্যম কেবল গণতন্ত্রকেই শক্তিশালী করে না, বরং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের আয়না হিসেবে কাজ করে।