ইরানের আধুনিক ইতিহাসের সবচাইতে প্রভাবশালী অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রয়াণের পর দেশটিতে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা মেনে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য গঠন করা হয়েছে তিন সদস্যের একটি শক্তিশালী ‘অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল’।
নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এই কাউন্সিলই এখন তেহরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু।
ক্ষমতার পালাবদল: আলিরেজা আরাফির উত্থান
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রয়াণে ইরানি শাসনতন্ত্রে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটির নীতিনির্ধারক সংস্থাগুলো। সংবিধানের ধারা অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতার অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এই বিশেষ কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে।
এই কাউন্সিলের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন ৬৭ বছর বয়সী প্রভাবশালী ধর্মতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি। তিনি বর্তমানে প্রভাবশালী ‘গার্ডিয়ান কাউন্সিল’-এর একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ইরানের শক্তিশালী সালিশি সংস্থা হিসেবে পরিচিত ‘এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিল’ (Expediency Council) আজ এক জরুরি সভায় আরাফিকে এই পদের জন্য চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করেছে।
কেন এই কাউন্সিল এত গুরুত্বপূর্ণ?
ইরানের শাসনব্যবস্থা বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে কিছুটা ভিন্ন। এখানে সর্বোচ্চ নেতাই হলেন চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী। খামেনির মৃত্যুর পর দেশটিতে যাতে কোনো ধরনের প্রশাসনিক বা নিরাপত্তা জনিত বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়, সেজন্যই এই তিন সদস্যের পরিষদ কাজ করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, আলিরেজা আরাফিকে এই কাউন্সিলে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি কেবল একজন দক্ষ আলেম নন, বরং ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর সাথেও তার গভীর যোগাযোগ রয়েছে। এই কাউন্সিল মূলত তিনটি কাজ করবে—রাষ্ট্রের দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের জন্য ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ (Assembly of Experts)-এর সাথে সমন্বয় করা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বহিঃবিশ্বের নজর
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা এবং ইরানের ওপর পশ্চিমা চাপের মধ্যে এই নেতৃত্বের পরিবর্তন তেহরানের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। খামেনির দীর্ঘ শাসনামলে যে কট্টরপন্থা ও প্রতিরোধের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, এই অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল তা কতটুকু ধরে রাখতে পারবে, তা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। বিশেষ করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনার মাঝে এই অন্তর্বর্তীকালীন শাসনব্যবস্থাকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলতে হবে।
ইরানি শাসনতন্ত্রের নতুন কাঠামো: প্রধান তথ্যসমূহ
কাউন্সিলের কাজ: নতুন সর্বোচ্চ নেতা বা ‘রেহবার’ নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনা করা।
আয়তুল্লাহ আলিরেজা আরাফি: প্রভাবশালী গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য এবং বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিলের অন্যতম নীতি নির্ধারক।
নির্বাচন প্রক্রিয়া: ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ নামক সংস্থাটি এখন খামেনির উত্তরসূরি বাছাইয়ে কাজ করবে, যাতে এই কাউন্সিল সব ধরনের প্রশাসনিক সহযোগিতা দেবে।
আইনি ভিত্তি: ইরানের সংবিধানের ১১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই অন্তর্বর্তীকালীন শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে।
ভবিষ্যতের গতিপথ কোন দিকে?
ইরানের রাজপথ এখন শোকাতুর, কিন্তু তেহরানের ক্ষমতার অলিন্দে চলছে ভবিষ্যৎ নেতার সন্ধানে চুলচেরা বিশ্লেষণ। আলিরেজা আরাফির মতো অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে সামনে আনা মূলত শাসনব্যবস্থায় স্থায়িত্ব বজায় রাখারই একটি সংকেত। তবে প্রশ্ন উঠছে, এই কাউন্সিল কি কেবল নামমাত্র তদারকি করবে, নাকি নতুন নেতা নির্বাচনে তারা কোনো নির্দিষ্ট আদর্শিক গোষ্ঠীর পক্ষে প্রভাব বিস্তার করবে?

