মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনার জেরে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। ইরানের আকস্মিক হামলার প্রেক্ষাপটে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এলএনজি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘কাতার এনার্জি’ তাদের উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। এই সিদ্ধান্তের প্রভাবে সোমবার ইউরোপের পাইকারি বাজারে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম এক লাফে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
অস্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্য ও জ্বালানি সংকট
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা আঞ্চলিক সংঘাত এবার জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত হানল। কাতার এনার্জি জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতা এবং হামলার কারণে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কর্মীদের নিরাপত্তা এবং অবকাঠামোগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে তারা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন ও সরবরাহ স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কাতার থেকে সরবরাহ বন্ধ হওয়া মানে ইউরোপের জন্য শীত পরবর্তী সময়ে জ্বালানি মজুত করার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ধাক্কা। ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কাতারের দিকে ঝুঁকেছিল। এখন সেই কাতার থেকেই সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মহাদেশটির শিল্পোৎপাদন ও গৃহস্থালি ব্যয় আকাশচুম্বী হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাজার পরিস্থিতির পরিসংখ্যান
সোমবার দিনের শুরুতেই বাজারে অস্থিরতা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। লেনদেনের শুরুর দিকে গ্যাসের দাম ২৫ শতাংশ বাড়লেও দুপুরের দিকে কাতার এনার্জির আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর তা ৫০ শতাংশে গিয়ে ঠেকে।
ইউরোপীয় গ্যাসের বেঞ্চমার্ক হিসেবে পরিচিত ডাচ টি-টিএফ (TTF) হাবে ফ্রন্ট-মান্থ চুক্তির দাম প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টায় (MWh) ১৪.৫৬ ইউরো বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬.৫২ ইউরোতে। আন্তর্জাতিক বাজারে যা প্রায় ১৫.৯২ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ-এর সমান।
এক নজরে আজকের বাজার পরিস্থিতি:
দাম বৃদ্ধি: এক দিনে সর্বোচ্চ ৫০% বৃদ্ধি।
বর্তমান মূল্য: ৪৬.৫২ ইউরো/MWh (প্রায় ১৫.৯২ ডলার/MMBtu)।
প্রধান কারণ: কাতারে ইরানের হামলা ও উৎপাদন স্থগিত।
প্রভাবিত অঞ্চল: সমগ্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বৈশ্বিক জ্বালানি চেইন।
দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও ভূ-রাজনীতি
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা মনে করছেন, এই সংকট কেবল ইউরোপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এলএনজির বাজারে কাতার একটি অন্যতম প্রধান শক্তি। তারা যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য উৎপাদন বন্ধ রাখে, তবে এশিয়ার দেশগুলোকেও (বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও চীন) চড়া দামে গ্যাস কিনতে হবে।
ইরানের এই পদক্ষেপকে অনেকে বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে দেখছেন। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা যদি লোহিত সাগর বা হরমুজ প্রণালী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়, তবে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। কাতার এনার্জির একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, “পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া মাত্রই আমরা পুনরায় কার্যক্রম শুরু করব।” তবে সেই “নিরাপদ সময়” কবে আসবে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না।
কাতার এনার্জির এই সাময়িক উৎপাদন স্থগিতকরণ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি অশনি সংকেত। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তেজনা, অন্যদিকে আকাশছোঁয়া জ্বালানি মূল্য—সব মিলিয়ে এক কঠিন সময়ের মুখোমুখি বিশ্ব।

