‘আগ্রাসন থামলে তবেই থামবে ইরান’, জাতিসংঘে হুঁশিয়ারি তেহরানের


‘আগ্রাসন থামলে তবেই থামবে ইরান’, জাতিসংঘে হুঁশিয়ারি তেহরানের

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে যুদ্ধের কালো মেঘ আরও ঘনীভূত হচ্ছে। মঙ্গলবার জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আলী বাহরেনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ইরান তার ‘প্রতিরক্ষামূলক অভিযান’ অব্যাহত রাখবে।

একইসঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করে তিনি বলেছেন, বিদেশি শক্তির হামলার জন্য কারো মাটি ব্যবহার করতে দিলে তা ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে গণ্য হবে। অন্যদিকে, চরম উত্তেজনার মুখে নিজেদের নাগরিকদের দ্রুত ১৪টি দেশ ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।


তেহরানের অনড় অবস্থান ও আঞ্চলিক হুঁশিয়ারি

জেনেভায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে আলী বাহরেনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ইরানের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইরান কোনো যুদ্ধ চায় না, তবে আক্রান্ত হলে হাত গুটিয়ে বসে থাকার পাত্রও তারা নয়। রাষ্ট্রদূত বলেন, “যতক্ষণ না পর্যন্ত এই অবৈধ আগ্রাসন বন্ধ হচ্ছে, ততক্ষণ আমাদের আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ ও সামরিক অভিযান চলতেই থাকবে। এটি আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।”

তবে আলী বাহরেনির বক্তব্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ছিল প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি তাঁর সরাসরি হুঁশিয়ারি। তিনি উল্লেখ করেন, যদি কোনো প্রতিবেশী দেশের সামরিক ঘাঁটি ইরান বা অন্য কোনো স্বাধীন দেশের ওপর হামলার কাজে ব্যবহার করা হয়, তবে ইরান সেই ঘাঁটিকে শত্রুশক্তির অংশ হিসেবে বিবেচনা করবে এবং সেখানে হামলা চালাতে দ্বিধা করবে না।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বার্তাটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ধারক দেশগুলোর প্রতি একটি প্রচ্ছন্ন হুমকি।

ওয়াশিংটনের ‘রেড অ্যালার্ট’: ১৪ দেশ ত্যাগের নির্দেশ

ইরানের এই কঠোর অবস্থানের পরপরই নড়েচড়ে বসেছে ওয়াশিংটন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তার কথা ভেবে এক নজিরবিহীন সতর্কতা জারি করেছে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর। কনস্যুলার বিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরা নামদার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বার্তায় জানান, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘গুরুতর ঝুঁকি’ তৈরি হয়েছে।

পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে ১৪টি নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, সেখানে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকরা যেন বর্তমানে উপলব্ধ যেকোনো পরিবহন ব্যবস্থা ব্যবহার করে দ্রুততম সময়ে সেই দেশগুলো ত্যাগ করেন। মোরা নামদারের মতে, পরিস্থিতি যে কোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে, তাই বিলম্ব না করে প্রস্থান করাই শ্রেয়। যদিও ওই ১৪টি দেশের নাম সরাসরি প্রকাশ করা হয়নি, তবে ধারণা করা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য ও এর সংলগ্ন অস্থিতিশীল অঞ্চলগুলোই এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে।


উত্তপ্ত পরিস্থিতির মূল পয়েন্টগুলো একনজরে:

  • ইরানের অবস্থান: আগ্রাসন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিরক্ষা অভিযান ও পাল্টা হামলা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা।

  • প্রতিবেশীদের প্রতি সতর্কবার্তা: বিদেশি হামলার জন্য ভূমি ব্যবহারের অনুমতি দিলে সেই দেশগুলো ইরানের নিশানায় পড়বে।

  • মার্কিন পদক্ষেপ: নিরাপত্তার খাতিরে নিজ নাগরিকদের জরুরি ভিত্তিতে ১৪টি দেশ ছাড়ার চূড়ান্ত নির্দেশ।

  • কূটনৈতিক শঙ্কা: পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হওয়ায় বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

বিশ্লেষণী দৃষ্টি: যুদ্ধের দাবানল কি তবে অনিবার্য?

একদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রাসী মেজাজ, অন্যদিকে ইরানের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়া অবস্থান—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে। ইরানের রাষ্ট্রদূতের এই বক্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তারা দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে নেমেছে।

বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলার যে হুমকি দেওয়া হয়েছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। ওমান, কাতার বা কুয়েতের মতো দেশগুলো এখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই ক্ষমতার লড়াইয়ে বলির পাঁঠা হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।