নেপালে নির্বাচনে তারুণ্যের জয়গান: ক্ষমতায় আসছে ‘জেন-জি’


নেপালে নির্বাচনে তারুণ্যের জয়গান: ক্ষমতায় আসছে ‘জেন-জি’

নেপালে সাধারণ নির্বাচনের পর ভোট গণনায় বইছে পরিবর্তনের প্রবল হাওয়া। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর বিপ্লবের কারিগর ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ (আরএসপি) প্রাথমিক ফলাফলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে রয়েছে। দীর্ঘদিনের প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোকে হটিয়ে দিয়ে নেপালের শাসনভার গ্রহণ করতে যাচ্ছে তরুণ প্রজন্মের পছন্দের এই নতুন রাজনৈতিক শক্তি।


ব্যালটে বিপ্লবের প্রতিফলন

নেপালের রাজনীতিতে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস ছিল এক টার্নিং পয়েন্ট। সেই সময়কার বিশাল গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণরা এবার রাজপথ ছেড়ে ব্যালট পেপারে নিজেদের শক্তির জানান দিল। কাঠমান্ডুসহ নেপালের প্রধান শহরগুলোতে আরএসপি প্রার্থীদের অগ্রযাত্রা দেখে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে ‘গণতান্ত্রিক সুনামি’ হিসেবে অভিহিত করছেন। জেন-জি (Gen-Z) বা বর্তমান প্রজন্মের ভোটারদের অভাবনীয় সমর্থন দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে।

প্রথাগত দলগুলোর দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার বিরুদ্ধে নেপালিরা যে একটি বিকল্প খুঁজছিলেন, এই নির্বাচনের ফলাফল তারই প্রতিফলন। আরএসপি কেবল একটি দল হিসেবে নয়, বরং একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

র‌্যাপার থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে বালেন্দ্র শাহ

এই নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত মুখ হলেন কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র এবং জনপ্রিয় র‌্যাপার বালেন্দ্র শাহ, যিনি সর্বমহলে ‘বালেন’ নামে পরিচিত। সেপ্টেম্বর অভ্যুত্থানের সময় প্রশাসনের অংশ হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি তার অকুণ্ঠ সমর্থন তাকে তরুণদের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করেছিল। সংগীতের মঞ্চ থেকে রাজনীতির ময়দানে বালেনের এই রূপান্তর নেপালের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।

নেপালের তরুণ ভোটারদের সিংহভাগই তাকে আগামীর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান বলে বিভিন্ন জনমত জরিপে উঠে এসেছে। কাঠমান্ডুর মেয়র থাকাকালীন তার জনহিতকর কাজ এবং সাহসিকতা তাকে সাধারণ মানুষের কাছে আস্থার প্রতীক করে তুলেছে। বালেনের এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তাই মূলত আরএসপি-র সাফল্যের প্রধান জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছে।

নেতৃত্বে অভিজ্ঞ ও সাহসী জুটি

বালেন্দ্র শাহ যদি হন এই দলের তারুণ্যের মুখ, তবে এর সাংগঠনিক মেরুদণ্ড হলেন দলের চেয়ারম্যান রবি লামিছানে। সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং তুখোড় টেলিভিশন সাংবাদিক হিসেবে লামিছানে আগে থেকেই নেপালে ব্যাপক পরিচিত। নিজের জনপ্রিয় লাইভ শো-তে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের মুখোশ উন্মোচন করে তিনি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন।

সাংবাদিকতা থেকে রাজনীতিতে আসা এই নেতা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ঘোষণা দিয়ে এবারের নির্বাচনে প্রচার চালিয়েছিলেন। রবি লামিছানের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং বালেন্দ্র শাহের তারুণ্যের তেজ—এই দুইয়ের মিশেলই আরএসপি-কে ক্ষমতার কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।


এক নজরে নেপাল নির্বাচনের মূল চিত্র:

  • বিজয়ী দল: রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি)।

  • প্রধান কারিগর: ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী তরুণ প্রজন্ম।

  • হেভিওয়েট প্রার্থী: বালেন্দ্র শাহ (সাবেক মেয়র ও র‌্যাপার) এবং রবি লামিছানে (সাবেক সাংবাদিক)।

  • ভোটের প্রবণতা: প্রথাগত পুরনো দলগুলোর ব্যাপক ভরাডুবি।

  • প্রধান অঙ্গীকার: দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং তারুণ্যনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি।


ভবিষ্যৎ নেপাল ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি

নেপালের এই রাজনৈতিক পরিবর্তন কেবল দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথাগত দলগুলো যেখানে ভারত বা চীনের দিকে ঝুঁকে থাকত, সেখানে আরএসপি-র মতো নতুন দল ‘নেপাল ফার্স্ট’ নীতিতে বিশ্বাসী। তারা বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে স্বনির্ভর নেপাল গড়ার ডাক দিয়েছে।