নিত্যপণ্যের বাজারে দাউদাউ করে জ্বলছে আগুনের লেলিহান শিখা। চাল, ডাল থেকে শুরু করে মাছ-মাংস—সবকিছুর দামই এখন সাধারণের নাগালের বাইরে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যমতে, গত ফেব্রুয়ারিতে খাদ্যখাতে মূল্যস্ফীতি এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৩০ শতাংশে, যা মাত্র এক মাস আগেই ছিল ৮.২৯ শতাংশ।
হেঁশেলে টান: পরিসংখ্যানের আড়ালে হাহাকার
রোববার (৮ মার্চ) প্রকাশিত বিবিএসের মাসিক প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতির এই উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। পরিসংখ্যান বলছে, পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় পর্যায়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.১৩ শতাংশে, যা জানুয়ারিতে ছিল ৮.৫৮ শতাংশ। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে খাদ্যখাতে। মাত্র ৩০ দিনের ব্যবধানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ১ শতাংশের বেশি।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার কিংবা সাধারণ পাড়া-মহল্লার দোকান—সবখানেই চিত্রটা একই। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো এখন বাজারের ফর্দ ছোট করতে করতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার উপক্রম। চালের দাম কেজিতে বেড়েছে কয়েক টাকা, আর শীতের সবজির বিদায়বেলায় আলুর চড়া দাম যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রোটিনের চাহিদা মেটানো মাছ ও মাংসের দাম তো আগে থেকেই আকাশছোঁয়া।
পরিসংখ্যানের ব্যবচ্ছেদ: গত বছরের তুলনায় পরিস্থিতি
বিবিএসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের ফেব্রুয়ারির তুলনায় খাদ্যপণ্যের দাম এবার আরও বেশি চড়া। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.২৪ শতাংশ, যা এবার সামান্য বেড়ে ৯.৩০ শতাংশে অবস্থান করছে। সাধারণ মূল্যস্ফীতি গত বছরের ৯.৩২ শতাংশের তুলনায় কিছুটা কম (৯.১৩ শতাংশ) হলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এর কোনো স্বস্তিদায়ক প্রভাব পড়েনি। কারণ, সাধারণ মানুষের আয়ের সিংহভাগই ব্যয় হয় খাদ্য কেনায়, আর সেখানেই আঘাতটা এসেছে সবচেয়ে বেশি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের সরবরাহ চেইন এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এই লাগামহীন মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ। টাকার অবমূল্যায়ন এবং জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্যের প্রভাবও বাজারের প্রতিটি স্তরে অনুভূত হচ্ছে।
এক নজরে মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান:
ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (খাদ্য): ৯.৩০% (জানুয়ারিতে ছিল ৮.২৯%)।
সাধারণ মূল্যস্ফীতি (ফেব্রুয়ারি ২০২৬): ৯.১৩%।
এক মাসের ব্যবধানে বৃদ্ধি (খাদ্য): ১.০১%।
ফেব্রুয়ারি ২০২৫ (খাদ্য): ৯.২৪%।
প্রভাবিত পণ্য: চাল, ডাল, সবজি, মাছ ও মাংস।
মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস ও নীতিনির্ধারণী চ্যালেঞ্জ
বাজারের এই ঊর্ধ্বগতি কেবল পরিসংখ্যানের হিসাব নয়, এটি হাজারো মানুষের জীবন সংগ্রামের গল্প। সরকারি কর্মজীবীদের বেতন বা বেসরকারি খাতের আয় যে হারে বাড়ছে, মূল্যস্ফীতির ঘোড়া ছুটছে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি গতিতে। ফলে প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষ করে যারা দৈনিক মজুরিতে কাজ করেন, তাদের পাতে এখন পর্যাপ্ত পুষ্টি জোগানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিং এবং টিসিবির মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য বিক্রির উদ্যোগ থাকলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপে কতটা সুফল আসবে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।

