নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। নারীপ্রধান পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আওতায় আনতে চালু হচ্ছে বিশেষ ‘ফ্যামিলি কার্ড’।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) বনানীর টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। প্রাথমিক ধাপে দেশের ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবার এই সুবিধার আওতায় আসছে।
ক্ষমতায়নের নতুন দিগন্ত
সোমবার (৯ মার্চ) সচিবালয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন সরকারের এই নতুন পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, সমাজকাঠামোয় নারীর অবদানকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতেই এই উদ্যোগ। দীর্ঘকাল ধরে অনেক পরিবারে নারীই প্রধান উপপার্জনকারী বা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হওয়া সত্ত্বেও সামাজিকভাবে তা উপেক্ষিত ছিল। এখন থেকে সেই পরিবারগুলো রাষ্ট্রের খাতায় ‘নারীপ্রধান পরিবার’ হিসেবে বিশেষ পরিচয় ও সুবিধা পাবে।
মন্ত্রী বলেন, “এটি কেবল একটি কার্ড নয়, বরং নারীর ক্ষমতায়নের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। এই কার্ডের মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষার বিভিন্ন ভাতা ও সুবিধা সরাসরি নারীর হাতে পৌঁছে দেওয়া হবে, যা পরিবারে তাঁর মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।”
কেন এই উদ্যোগ ও পাইলট কর্মসূচি?
বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে শহুরে বস্তি এলাকায় অসংখ্য নারী একাই সংসার টেনে চলেছেন। অনেক ক্ষেত্রে স্বামী পরিত্যক্তা, বিধবা বা কর্মক্ষম পুরুষহীন পরিবারের মূল চালিকাশক্তি নারী। সরকারের এই বিশেষ কার্ড মূলত এই গোষ্ঠীটিকে লক্ষ্য করেই তৈরি করা হয়েছে।
প্রথম ধাপে পাইলট প্রকল্প হিসেবে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মোট ৩৭ হাজার ৫৬৭টি পরিবারকে নির্বাচন করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ১০টায় রাজধানীর কড়াইল বস্তি সংলগ্ন বনানীর টিঅ্যান্ডটি মাঠে এই বিতরণ কর্মসূচির সূচনা করবেন প্রধানমন্ত্রী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডিজিটাল ডাটাবেজের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে সুবিধাভোগীদের হাতে কার্ড তুলে দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে এই কর্মসূচি সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের।
ফ্যামিলি কার্ডের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:
পরিচয়ের স্বীকৃতি: পরিবারে নারীকে ‘প্রধান’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় দলিলের মাধ্যমে স্বীকৃতি প্রদান।
সরাসরি সুবিধা: সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় রেশন, নগদ সহায়তা বা চিকিৎসা সুবিধা সরাসরি এই কার্ডের মাধ্যমে পাওয়া যাবে।
আর্থিক স্বাধীনতা: পরিবারের খরচের নিয়ন্ত্রণ নারীর হাতে থাকায় অপচয় রোধ ও শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি: প্রতিটি কার্ড একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে, ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হবে।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পরিবারের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ যখন নারীর হাতে থাকে, তখন সেই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির পেছনে বেশি ব্যয় হয়। ফ্যামিলি কার্ড চালুর ফলে কেবল নারীর মর্যাদা বাড়বে না, বরং জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিগুলো আরও সঠিক নিশানায় পৌঁছাবে। বিশেষ করে কড়াইল বস্তির মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার নারীরা, যারা প্রতিদিন জীবনসংগ্রামে লড়াই করছেন, তাঁদের জন্য এটি একটি বড় রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।

