মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে কামানের গর্জন আর ক্ষেপণাস্ত্রের ঝলকানিতে অস্থির হয়ে উঠেছে বিশ্ব জ্বালানি তেলের বাজার। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম সর্বকালের রেকর্ড ছুঁইছুঁই করলেও বাংলাদেশে ভিন্ন চিত্র। সংকটে সাশ্রয়ী হওয়ার বদলে সাধারণ মানুষ ও ডিলারদের মধ্যে শুরু হয়েছে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে কেনা।
গত এক মাসেই দেশে ডিজেল ও অকটেনের বিক্রি বেড়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ।
আতঙ্ক বনাম বাস্তবতা: কেন এই হাহাকার?
সাধারণত যুদ্ধাবস্থায় সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় মানুষ সঞ্চয়ী হয়, কিন্তু বাংলাদেশে পরিস্থিতি উল্টো। বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন) সূত্রে জানা গেছে, ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় চলতি মার্চ মাসের প্রথম ১০ দিনেই জ্বালানি তেলের চাহিদা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের জন্য পাম্পগুলোতে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার ফলে সরকার দেশের বাজারেও যেকোনো সময় দাম বাড়িয়ে দিতে পারে—এমন একটি আশঙ্কাই সাধারণ গ্রাহক থেকে শুরু করে বড় ডিলারদের বাড়তি মজুতে প্ররোচিত করছে। এটি এক ধরনের ‘কৃত্রিম সংকট’ তৈরির চেষ্টা হিসেবেও দেখছেন অনেকে। পাম্প মালিকদের একাংশ এবং বড় পরিবহন ব্যবসায়ীরা আগেভাগেই ট্যাঙ্ক পূর্ণ করে রাখছেন, যা বাজারে বাড়তি চাপের সৃষ্টি করছে।
বিপিসির অভয়: মজুত কি যথেষ্ট?
জ্বালানি খাতের এই অস্থিরতাকে স্রেফ ‘সাময়িক আতঙ্ক’ বা প্যানিক হিসেবে অভিহিত করেছে বিপিসি। সংস্থাটির মতে, সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। বিপিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, “বাজারে তেলের কোনো সংকট নেই, বরং মানুষের অতিরিক্ত কেনার মানসিকতাই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। প্যানিক কেটে গেলেই বিক্রি আবার স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসবে।”
সরবরাহ সচল রাখতে সরকার এরই মধ্যে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে। গত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তিনটি বড় জাহাজ মোট ৮৫ হাজার টন ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করেছে। এর মধ্যে একটি জাহাজ থেকে তেল খালাস প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে, বাকি দুটি জাহাজ পাইপলাইনে যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। অর্থাৎ, আগামী কয়েক মাসের জন্য দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে বলে দাবি করছে প্রশাসন।
এক নজরে বর্তমান চিত্র:
চাহিদা বৃদ্ধি: গত মাসের তুলনায় জ্বালানি তেলের বিক্রি বেড়েছে প্রায় ১৮%।
আমদানি পরিস্থিতি: চট্টগ্রামে পৌঁছেছে ৮৫ হাজার টন ডিজেলবাহী ৩টি জাহাজ।
বিক্রির ধরণ: ডিজেল ও অকটেনের চাহিদা সবচেয়ে বেশি, বিশেষ করে পরিবহন ও সেচ কাজে।
প্রধান কারণ: আন্তর্জাতিক বাজারে ঊর্ধ্বমূল্য এবং দেশে দাম বাড়ার গুজব।
বিশ্লেষণ: বৈশ্বিক অস্থিরতার দীর্ঘমেয়াদী আঁচ
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে ভর্তুকির চাপ কমাতে বাংলাদেশ সরকারকে হয়তো তেলের দাম সমন্বয় করতেই হবে। কিন্তু এখন যে গণ-মজুত শুরু হয়েছে, তা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কৃত্রিম মজুতের ফলে বাজারে যে নগদ অর্থের টান পড়ে, তা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মুহূর্তে ডিলার পর্যায়ে কড়া নজরদারি প্রয়োজন। যদি পাম্পগুলোতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তেল আটকে রাখা হয়, তবে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করবে।

