আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানো: সাইফুলসহ ৬ জনের মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ


আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানো: সাইফুলসহ ৬ জনের মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আশুলিয়ায় ছয়জনের মরদেহ ভ্যানে স্তূপ করে পুড়িয়ে দেওয়ার সেই বীভৎস ঘটনায় সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামসহ ছয় আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।

রোববার (১৫ মার্চ) ট্রাইব্যুনাল এই ঐতিহাসিক মামলার ৫৯১ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন, যেখানে উঠে এসেছে ক্ষমতার অপব্যবহার ও মানবতাবিরোধী অপরাধের নৃশংস চিত্র।


জুলাই-আগস্টের ক্ষত: রায়ের সারসংক্ষেপ

২০২৪ সালের সেই রক্তঝরা দিনগুলোতে আশুলিয়া থানা এলাকায় সাতজনকে হত্যা এবং ছয়জনের মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় এই রায় ঘোষণা করা হলো। ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, তৎকালীন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগের ক্যাডার বাহিনী পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ও প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা চালিয়েছিল। পূর্ণাঙ্গ রায়ে ঘটনার ভয়াবহতা বিশ্লেষণ করে আদালত একে ‘মানবতার বিরুদ্ধে চরম অপরাধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

রায়ের গভীরে: কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি ও প্রমাণের সীমাবদ্ধতা

৫৯১ পৃষ্ঠার এই সুবিশাল রায়ে আদালত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেছেন, মামলার বেশ কয়েকজন আসামি—যাদের মধ্যে ২, ৩, ৪, ৫, ৭, ৮ ও ৯ নম্বর অভিযুক্ত রয়েছেন—হয়তো এই গণহত্যার মূল পরিকল্পনাকারী বা চূড়ান্ত রাজনৈতিক উৎস ছিলেন না। তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ বাস্তবায়নে এবং অপারেশন পরিচালনায় তাদের সক্রিয় ভূমিকার কারণেই তাদের ওপর এই অপরাধের দায় বা ‘কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’ বর্তেছে।

আদালত আরও জানান, প্রসিকিউশন পক্ষ কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে সরাসরি লাশ পোড়ানোর ঘটনায় যুক্ত থাকার বিষয়ে যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রমাণের এই দুর্বলতার কারণে কয়েকজন আসামির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি এড়ানো সম্ভব হয়েছে এবং সাজা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। তবে সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সরাসরি উসকানি ও নির্দেশনার বিষয়টি তথ্য-প্রমাণে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ায় তাদের সর্বোচ্চ সাজা বহাল রাখা হয়েছে।

এই রায়টি বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে কোনো রাজনৈতিক নেতা যখন তার ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালায়, তখন তার পরিণতি কী হতে পারে—এই রায় তারই প্রতিফলন। আশুলিয়ার সেই ভ্যানের ওপর লাশের স্তূপের ছবি সারা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আদালত আজ সেই নির্মমতার বিচারিক সিলমোহর দিলেন।

তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পূর্ণাঙ্গ রায়ে প্রমাণের যে সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে, তা ভবিষ্যতে অন্যান্য মামলার ক্ষেত্রে প্রসিকিউশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ ও ফরেনসিক রিপোর্টের ওপর আরও গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি এই রায়ের মাধ্যমে পুনরায় সামনে এসেছে।