অনলাইনে শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মুখে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে মেটা। জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপে যুক্ত হচ্ছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যেখানে অভিভাবকদের অনুমতি ও সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া শিশুরা অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে পারবে না। স্মার্টফোনের অবাধ ব্যবহারের যুগে শিশুদের সাইবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এই বৈপ্লবিক উদ্যোগ।
সাইবার সুরক্ষায় মেটার নতুন ঢাল
বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির আশীর্বাদ যেমন আছে, তেমনি এর আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিপদগুলোও উপেক্ষা করার মতো নয়। বিশেষ করে করোনাকালীন সময় থেকে পড়াশোনা ও যোগাযোগের প্রয়োজনে শিশুদের হাতে স্মার্টফোন চলে আসায় তাদের অনলাইন নিরাপত্তার বিষয়টি এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে মেটার মালিকানাধীন হোয়াটসঅ্যাপ একটি বিশেষ সংস্করণ বা ফিচার সেট নিয়ে কাজ করছে, যা মূলত শিশু ও কিশোর ব্যবহারকারীদের জন্য তৈরি।
দীর্ঘ ১৫ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে আমরা দেখেছি কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। হোয়াটসঅ্যাপের এই নতুন উদ্যোগটি মূলত সেই ক্ষতিকর দিকগুলো কমিয়ে আনার একটি প্রয়াস। মেটা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন এই ব্যবস্থায় শিশুদের অ্যাকাউন্ট খোলার সময় থেকেই অভিভাবকের সরাসরি সম্পৃক্ততা বাধ্যতামূলক করা হবে। অর্থাৎ, মা-বাবার স্মার্টফোনের সাথে সন্তানের অ্যাকাউন্টটি লিঙ্ক করা থাকবে, যার মাধ্যমে তারা রিয়েল-টাইম তদারকি করতে পারবেন।
নিয়ন্ত্রণ ও সীমাবদ্ধ যোগাযোগ
সাধারণ হোয়াটসঅ্যাপে আমরা যে অবাধ স্বাধীনতার সুবিধা পাই, শিশুদের সংস্করণে তা থাকবে না। এখানে নিরাপত্তার স্বার্থে অনেক ফিচারে কাঁচি চালানো হয়েছে। যেমন, শিশুরা চাইলেই অপরিচিত কাউকে মেসেজ পাঠাতে পারবে না বা অজানা কোনো গ্রুপে যুক্ত হতে পারবে না। অভিভাবকরা নির্ধারণ করে দেবেন সন্তান কার কার সাথে চ্যাট করতে পারবে। এমনকি কতক্ষণ অ্যাপটি ব্যবহার করা যাবে, তার জন্য থাকছে ‘স্ক্রিন টাইম’ লিমিট সেট করার সুযোগ।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারনেটে ওত পেতে থাকা সাইবার অপরাধী বা ‘অনলাইন প্রিডেটর’দের হাত থেকে শিশুদের বাঁচাতে এই ধরনের কঠোর ফিল্টারিং অত্যন্ত জরুরি ছিল। মেটা এমনভাবে সেটিংসগুলো সাজিয়েছে যাতে সাধারণ মেসেজিং অ্যাপের মজা বজায় থাকলেও গোপনীয়তা ও সুরক্ষা কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়।
নতুন নিরাপত্তা ফিচারের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:
অভিভাবকের অনুমতি: অ্যাকাউন্ট তৈরি এবং লগইন করার জন্য মা-বাবার স্মার্টফোন থেকে ডিজিটাল সম্মতির প্রয়োজন হবে।
যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা: শুধুমাত্র কন্টাক্ট লিস্টে থাকা অনুমোদিত ব্যক্তিদের সাথেই শিশুরা চ্যাট করতে পারবে।
মনিটরিং ড্যাশবোর্ড: অভিভাবকরা তাদের নিজস্ব ফোন থেকেই দেখতে পাবেন সন্তান কাদের সাথে কথা বলছে এবং কতটা সময় অনলাইনে ব্যয় করছে।
বিজ্ঞাপন ও ট্র্যাকিং মুক্ত: শিশুদের এই অ্যাকাউন্টে কোনো বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন দেখানো হবে না এবং তাদের ডেটা ট্র্যাক করার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ থাকবে।
অনিরাপদ কন্টেন্ট ফিল্টার: এআই (AI) প্রযুক্তির মাধ্যমে আপত্তিকর শব্দ বা ছবি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্লক করে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।
বিশেষজ্ঞ মত ও আগামীর পথ
বাংলাদেশেও বর্তমানে শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি অংশ কাটছে ডিজিটাল স্ক্রিনে। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মেটার এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও তারা মনে করেন, কেবল অ্যাপের ফিচারের ওপর ভরসা করলেই চলবে না। অভিভাবকদের সচেতনতা এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে। কারিগরি সুরক্ষা তখনই কার্যকর হয় যখন এর সাথে পারিবারিক গাইডলাইন যুক্ত থাকে।
হোয়াটসঅ্যাপের এই নতুন উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে ডিজিটাল অভিভাবকত্বের (Digital Parenting) পথে একটি মাইলফলক। এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত আপডেট নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ইন্টারনেট জগত গড়ার প্রতিশ্রুতি। তবে মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তির দেয়াল যতই উঁচু হোক না কেন, সন্তানের সাথে খোলামেলা আলোচনা এবং তাদের অনলাইন কার্যক্রমের প্রতি গভীর নজরদারিই হলো শ্রেষ্ঠ সুরক্ষা।

