ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি ও ইরান যুদ্ধের প্রতিবাদে রাজপথে লাখো মানুষ


ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি ও ইরান যুদ্ধের প্রতিবাদে রাজপথে লাখো মানুষ

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী অভিবাসন নীতি এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধংদেহী অবস্থানের প্রতিবাদে গত শনিবার নজিরবিহীন বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে পুরো যুক্তরাষ্ট্র। ‘নো কিংস’ (No Kings) শিরোনামে পরিচিত এই গণ-আন্দোলন এবার মার্কিন ইতিহাসের বৃহত্তম একক দিনের বিক্ষোভে রূপ নিয়েছে। ওয়াশিংটন ডিসি থেকে শুরু করে ক্যালিফোর্নিয়া—সবগুলো অঙ্গরাজ্যের ৩ হাজার ২০০-র বেশি স্থানে লাখ লাখ মানুষ স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসেন।

কেন এই গণ-বিস্ফোরণ?

মার্কিন সাংবাদিকতা ও ভূ-রাজনীতি পর্যবেক্ষণে দীর্ঘ দেড় দশকের অভিজ্ঞতায় আমি এমন স্বতঃস্ফূর্ত গণজোয়ার খুব কমই দেখেছি। এবারের বিক্ষোভের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দুটি বিষয়: প্রথমত, নথিপত্রহীন অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিযান; এবং দ্বিতীয়ত, ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘাত। সাম্প্রতিক সময়ে মিনিয়াপোলিসে অভিবাসন কর্মকর্তাদের (ICE) গুলিতে তিন মার্কিন নাগরিক নিহতের ঘটনা এই ক্ষোভে ঘি ঢেলেছে। বিক্ষোভকারীরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে এখন আর কোনো ‘গণতন্ত্র’ নেই, বরং দেশটি এক ‘রাজতন্ত্রের’ দিকে ধাবিত হচ্ছে—আর এই ভাবনা থেকেই ‘নো কিংস’ স্লোগানের উৎপত্তি।

শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়া জনস্রোত

শনিবারের এই কর্মসূচিটি ছিল ‘নো কিংস’ আন্দোলনের তৃতীয় কিস্তি। এর আগের দুটি কর্মসূচিতে কয়েক লাখ মানুষ অংশ নিলেও এবারের জমায়েত অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। নিউ ইয়র্ক সিটির ম্যানহাটন থেকে শুরু করে টেক্সাসের অস্টিন—সর্বত্রই ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়। প্রবীণ অভিনেতা রবার্ট ডি নিরো থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বার্নি স্যান্ডার্স পর্যন্ত এই বিক্ষোভে সংহতি প্রকাশ করেছেন।

মজার বিষয় হলো, এবারের বিক্ষোভ কেবল বড় শহরগুলোতে সীমাবদ্ধ ছিল না। ক্ষুদ্র শহর ও মফস্বল এলাকাগুলোতে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মিনেসোটার সেন্ট পলে তীব্র শীত উপেক্ষা করে প্রায় এক লাখ মানুষ সমবেত হন, যেখানে কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী ব্রুস স্প্রিংস্টিন তাঁর গান দিয়ে প্রতিবাদে সংহতি জানান।


এক নজরে বিক্ষোভের মূল দিকগুলো:

  • আয়তন: যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের ৩ হাজার ২০০-র বেশি পয়েন্টে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

  • দাবি: অবিলম্বে ইরান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার এবং অমানবিক অভিবাসন নীতি বাতিল করা।

  • অংশগ্রহণ: আয়োজকদের দাবি অনুযায়ী, অন্তত ৮০ থেকে ৯০ লাখ মানুষ এবারের বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন, যা মার্কিন ইতিহাসের নতুন রেকর্ড।

  • আন্তর্জাতিক সংহতি: যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও আমস্টারডাম, মাদ্রিদ ও রোমের মতো বড় বড় ইউরোপীয় শহরগুলোতে ট্রাম্পবিরোধী মিছিল বের করা হয়েছে।


প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া ও আগামীর গতিপথ

হোয়াইট হাউজ থেকে এই বিক্ষোভকে ‘বামপন্থীদের উসকানি’ হিসেবে অভিহিত করা হলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পরিস্থিতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। সামনেই মধ্যবর্তী নির্বাচন, আর তার ঠিক আগে এমন উত্তাল পরিস্থিতি রিপাবলিকান শিবিরের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। বিশেষ করে অভিবাসন কর্মকর্তাদের হাতে মার্কিন নাগরিক নিহতের পর জনমত প্রবলভাবে ট্রাম্পের বিপক্ষে যাচ্ছে।

মার্কিন রাজনীতির এই ক্রান্তিকালে শনিবারের বিক্ষোভ কেবল একটি প্রতিবাদ নয়, বরং এটি ছিল আমেরিকানদের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার এক সাহসী বহিঃপ্রকাশ।