পারস্য উপসাগরের ভূ-রাজনৈতিক স্নায়ুকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালিতে চলমান অচলাবস্থা নিরসনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে চীন। বেইজিং স্পষ্ট জানিয়েছে, এই কৌশলগত জলপথে নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার ‘একমাত্র ও প্রধান উপায়’ হলো মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সম্প্রতি এক উচ্চপর্যায়ের ফোনালাপে এই মন্তব্য করেছেন।
বেইজিং-মস্কো ফোনালাপ: কূটনীতির নতুন মেরুকরণ
বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক রুট হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে টেলিফোনে বিস্তারিত আলোচনা করেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, দুই দেশের শীর্ষ কূটনীতিকরা বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও এর বৈশ্বিক প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ওয়াং ই জোর দিয়ে বলেন যে, সামরিক শক্তি প্রয়োগ বা পাল্টাপাল্টি হুমকি দিয়ে জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বরং সংঘাতের মূলে থাকা রাজনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধান করা এবং একটি কার্যকর যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নই হবে বর্তমান সংকটের টেকসই সমাধান। তিনি মনে করেন, সংঘাতের আগুনে ঘি না ঢেলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত আলোচনার টেবিলে সব পক্ষকে বসানো।
কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি?
হরমুজ প্রণালি কেবল একটি জলপথ নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ওমান এবং ইরানের মধ্যবর্তী এই প্রণালিতে সামান্যতম অস্থিরতাও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী করে দেয়। বর্তমান আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর হামলা বা জব্দ করার ঘটনা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
চীন, যারা বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি আমদানিকারক, তাদের জন্য এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা জাতীয় নিরাপত্তার সমতুল্য। বেইজিং মনে করে, লোহিত সাগর থেকে শুরু করে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত যে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে, তা আদতে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংকটের অংশ। আর এই সংকটের চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে যুদ্ধবিরতির মধ্যে।
আলোচনার মূল নির্যাস:
সমাধানের সূত্র: হরমুজ প্রণালিতে সংকট নিরসনের প্রধান চাবিকাঠি হলো যুদ্ধবিরতি।
কূটনৈতিক ঐক্য: চীন ও রাশিয়া এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফেরাতে যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।
বাণিজ্যিক ঝুঁকি: সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট ও পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা।
চীনের অবস্থান: বেইজিং মধ্যপ্রাচ্যে কোনো প্রকার সামরিক হস্তক্ষেপের বিপক্ষে এবং রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে।
গভীর সংকটে বিশ্ব বাণিজ্য
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াং ই-র এই মন্তব্য পশ্চিমা শক্তিগুলোর ওপর একটি প্রচ্ছন্ন চাপ। বিশেষ করে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সামরিক পাহারার মাধ্যমে জাহাজ চলাচল সচল রাখার চেষ্টা করছে, তখন চীন রাজনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বেইজিংয়ের এই অবস্থানের পেছনে তাদের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত থাকলেও, এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ছাড়া বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা অনিশ্চিত।
হরমুজ প্রণালি যদি দীর্ঘ সময় ধরে অস্থির থাকে, তবে তার প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে তা মরণকামড় দেবে। চীনের এই ‘যুদ্ধবিরতির আহ্বান’ শেষ পর্যন্ত যুদ্ধরত পক্ষগুলো কতটা আমলে নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্ব বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ গতিপথ।

