ইরানের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বহুমুখী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে নজিরবিহীন গোলাবারুদ সংকটে যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাতের প্রভাবে পেন্টাগনের অস্ত্র ভাণ্ডারে টান পড়ায় এখন কঠিন নীতিগত সিদ্ধান্তের মুখোমুখি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। মার্কিন সামরিক শক্তি বিশ্বের কোন প্রান্তে কতটুকু ব্যয় করা হবে, তা নিয়ে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে চরম দ্বিধাবিভক্তি।
গোলাবারুদ সংকটে যুক্তরাষ্ট্র!
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী হিসেবে পরিচিত হলেও, সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমেরিকার সীমাবদ্ধতাগুলোকে নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সচল রাখতে গিয়ে মার্কিন গোলাবারুদের মজুদ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে।
বিশেষ করে ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লোহিত সাগর এবং সিরিয়া-ইরাক সীমান্তে নিয়মিত অভিযান চালাতে গিয়ে উচ্চ প্রযুক্তির ইন্টারসেপ্টর এবং প্রিসিশন-গাইডেড মিউনিশনের অভাব দেখা দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সামরিক ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও, খোদ পেন্টাগনের কর্মকর্তারা এখন স্বীকার করছেন যে—চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন বৃদ্ধি করা বর্তমান শিল্প কাঠামোর পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কৌশলী দোলাচলে ওয়াশিংটন
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এখন একটি ‘জিরো-সাম গেম’ বা শূন্য-যোগফল খেলায় অংশ নিতে হবে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইরানের প্রভাব খর্ব করা, অন্যদিকে এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য মোকাবিলা করা—এই দুই নৌকায় পা দিয়ে চলা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এখন দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ আগে থেকেই মার্কিন স্টকে টান ফেলেছিল, আর এখন ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের সম্ভাবনা সেই ক্ষতকে আরও গভীর করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—তারা কি মধ্যপ্রাচ্যের বালুচরে সমস্ত গোলাবারুদ শেষ করবে, নাকি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য কিছু অবশিষ্ট রাখবে?
সংকটের মূল কারণ ও পরিসংখ্যান
অব্যাহত ব্যয়: মধ্যপ্রাচ্যে গত কয়েক মাসে হুতি ও ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র বিলিয়ন ডলার মূল্যের গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে।
উৎপাদন ঘাটতি: যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শিল্প কারখানাগুলো বর্তমানে যে গতিতে অস্ত্র উৎপাদন করছে, তা যুদ্ধের ময়দানে ব্যবহারের গতির চেয়ে অনেক ধীর।
অগ্রাধিকারের সংকট: পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ রিপোর্টে বলা হয়েছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার (যেমন—প্যাট্রিয়ট মিসাইল) মজুদ এখন সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
ট্রাম্পের চ্যালেঞ্জ: যুদ্ধবিরোধী ভাবমূর্তির প্রতিশ্রুতি দিলেও মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের চাপে ট্রাম্পকে হয় নতুন যুদ্ধে জড়াতে হবে, না হয় কৌশলগত পিছুটান নিতে হবে।
গোলাবারুদ ফুরিয়ে আসা কেবল সামরিক সক্ষমতার বিষয় নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সদিচ্ছারও পরীক্ষা। ট্রাম্প প্রশাসনকে সম্ভবত খুব শীঘ্রই কোনো একটি ফ্রন্ট থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে হবে। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যখনই কোনো পরাশক্তি সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে অতি-বিস্তৃত (Overextended) হয়ে পড়ে, তখনই তাদের আধিপত্যের পতন শুরু হয়।

