বিশ্বজুড়ে খাদ্যসংকটে থাকা শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় নাম উঠেছে বাংলাদেশের। গত এক বছরে দেশের দেড় কোটিরও বেশি মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা। জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে চলতি বছরেও পরিস্থিতির নাটকীয় উন্নতির সম্ভাবনা কম বলে সতর্ক করা হয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস ২০২৪’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের খাদ্য পরিস্থিতির এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অ্যাগেইনস্ট ফুড ক্রাইসিস কর্তৃক প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বের খাদ্যসংকটে থাকা মোট মানুষের দুই-তৃতীয়াংশই মাত্র ১০টি দেশে ঘনীভূত, যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এই তালিকায় থাকা অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জাতিসংঘ, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্মিলিত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের ১ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার ‘সংকটজনক পর্যায়-৩’-এ অবস্থান করছিল। আরও আশঙ্কার কথা হলো, প্রায় ৪০ লাখ মানুষ ছিল ‘জরুরি পর্যায়-৪’-এ, যা দুর্ভিক্ষের আগের ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
সংকটের মূলে কী?
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের এই খাদ্যসংকটের পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ কাজ করছে। প্রথমত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ববাজারে পণ্যের আকাশচুম্বী দাম এবং ডলার সংকটের কারণে আমদানিকৃত খাদ্যশস্যের চড়া মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট অনিয়মিত বন্যা ও খরা কৃষি উৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে দেশের উপকূলীয় ও চরাঞ্চলের মানুষ দীর্ঘমেয়াদী অপুষ্টির শিকার হচ্ছে।
প্রতিবেদনের মূল পরিসংখ্যান:
তীব্র খাদ্যসংকট: ১ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ বর্তমানে পর্যায়-৩ (সংকটজনক) স্তরে রয়েছে।
জরুরি অবস্থা: ৪০ লাখ মানুষ পর্যায়-৪ (জরুরি) স্তরে রয়েছে, যাদের জন্য তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রয়োজন।
শীর্ষ ১০-এ অবস্থান: বিশ্বের মোট খাদ্যসংকটে থাকা জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ বাংলাদেশের বাসিন্দা।
ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস: ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের আশা নেই বললেই চলে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বাজারে চাল, ডাল ও তেলের দাম যেভাবে লাগামহীনভাবে বেড়েছে, তাতে নিম্নবিত্ত তো বটেই, মধ্যবিত্তের পাতেও খাবারের পরিমাণ ও পুষ্টিমান কমেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা সংকটের মতো মানবিক পরিস্থিতিও বাংলাদেশের সীমিত সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে, যা সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তাকে আরও নাজুক করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কেবল চালের উৎপাদন বাড়িয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন বহুমুখী খাদ্য উৎপাদন এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি। যদি মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো না যায় এবং প্রান্তিক কৃষকদের ভর্তুকি নিশ্চিত না করা হয়, তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর এই পূর্বাভাস আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে পুষ্টির অভাবে শিশুদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশে দেড় কোটির বেশি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি একটি মানবিক বিপর্যয়। ২০২৬ সালকে সামনে রেখে কৃষি ও সমাজকল্যাণ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার সমন্বয় এখন সময়ের দাবি।

