ভারত থেকে সরকারি পর্যায়ে আমদানি করা চালের মান যাচাই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রাথমিক পরীক্ষায় খাবার উপযোগী হিসেবে ছাড়পত্র পাওয়ার পর চট্টগ্রামের হালিশহর কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদামে (সিএসডি) সংরক্ষিত ১৩৫ টন চালে বিষাক্ত উপাদান আফলাটক্সিনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিষয়টি সামনে আসার পর চালের প্রাথমিক পরীক্ষা, সংরক্ষণ ও সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপ খতিয়ে দেখার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
হালিশহর সিএসডির ব্যবস্থাপক ইকবাল মাহমুদ চালের মধ্যে আফলাটক্সিন পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, অধিকতর পরীক্ষার জন্য নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে।
খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এমভি এইচটি পাইওনিয়ার জাহাজে করে চালগুলো ভারত থেকে আনা হয়। গত ২১ জুলাই জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছায়। পরদিন খাদ্য অধিদপ্তরের পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি দলের উপস্থিতিতে চালের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরীক্ষার প্রতিবেদনে চাল খাবার উপযোগী বলে উল্লেখ করা হলে ২৪ ও ২৫ জুলাই সেগুলো খালাস করা হয়।
পরে চালের একটি অংশ ঢাকার তেজগাঁও সিএসডি, চট্টগ্রামের হালিশহর ও দেওয়ানহাট সিএসডি এবং গাজীপুরের জয়দেবপুর স্থানীয় খাদ্যগুদামে পাঠানো হয়। তবে গুদামে পৌঁছানোর পর চালের মান নিয়ে আপত্তি জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। চাল খাবারের অনুপযোগী হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তাঁরা। এ অবস্থায় পরিবহন ঠিকাদাররাও চালের পরিবহন স্থগিত রাখেন। বিষয়টি লিখিতভাবে খাদ্য সচিব ও খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে জানানো হয়।
এরপর চালের মান পুনরায় যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত ১৭ আগস্ট গাজীপুরের ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের শস্যমান ও পুষ্টি বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শরীফা সুলতানা দীপ্তির নেতৃত্বে দুই সদস্যের একটি দল চট্টগ্রামে যায়। দলটি হালিশহর ও দেওয়ানহাট সিএসডির কয়েকটি চালের স্তূপ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে। সেই পরীক্ষাতেই হালিশহর সিএসডির ১৩৫ টন চালে আফলাটক্সিনের উপস্থিতি ধরা পড়ে।
খাদ্য বিভাগ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জসিম উদ্দিন খানের নির্দেশে সাড়ে ৯ হাজার টন চালের বিতরণ সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে মান পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পরীক্ষায় ১৩৫ টন চালে ক্ষতিকর উপাদানটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। হালিশহর সিএসডির ব্যবস্থাপক ইকবাল মাহমুদ ও দেওয়ানহাট সিএসডির ব্যবস্থাপক হামিম রহমান জানিয়েছেন, বাকি চাল নিয়ম অনুযায়ী বিতরণ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম খাদ্য বিভাগের চলাচল ও সংরক্ষণ শাখার নিয়ন্ত্রক রেজোয়ান সাকিবও বিষয়টি জানার কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, এ ঘটনায় অধিকতর পরীক্ষার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
আফলাটক্সিন এক ধরনের বিষাক্ত পদার্থ, যা অ্যাসপারজিলাস প্রজাতির ছত্রাক থেকে তৈরি হয়। আর্দ্রতা ও অনুকূল পরিবেশে শস্য সংরক্ষণ করা হলে এ ধরনের ছত্রাক জন্মাতে পারে। খাদ্যে আফলাটক্সিনের উপস্থিতি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গাজীপুর ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের শস্যমান ও পুষ্টি বিভাগের সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আলী বলেন, আফলাটক্সিনযুক্ত খাবার দীর্ঘদিন গ্রহণ করলে যকৃৎ বা লিভারের ক্ষতি হতে পারে। পাশাপাশি লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
প্রাথমিক পরীক্ষায় খাবার উপযোগী হিসেবে বিবেচিত চালের পরবর্তী পরীক্ষায় ক্ষতিকর উপাদান শনাক্ত হওয়ার ঘটনায় এখন কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথম পরীক্ষায় কেন তা ধরা পড়েনি, চালের মান পরিবহন বা সংরক্ষণের সময় পরিবর্তিত হয়েছে কি না এবং বিতরণ করা চালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি।
অধিকতর পরীক্ষার ফল ও তদন্তের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করছে চালের মান নিয়ে তৈরি হওয়া এই উদ্বেগের পূর্ণ চিত্র।

