রোগীদের সবচেয়ে কম সময় দেন বাংলাদেশের চিকিৎসকরা। রোগীপ্রতি গড়ে ১ মিনিটেরও কম সময় দিচ্ছেন তারা।
চিকিৎসা সাময়িকী ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে (বিএমজে) প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশের চিকিৎসকরা রোগীপ্রতি ব্যয় করেন গড়ে মাত্র ৪৮ সেকেন্ড।
যদিও মোটামুটি চিকিৎসাসেবা দিতেও রোগীপ্রতি কমপক্ষে গড়ে ১০ মিনিট সময় বরাদ্দ রাখা উচিত বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। অনেক দেশের চিকিৎসকরা আবার এর চেয়েও বেশি সময় ব্যয় করছেন রোগীপ্রতি কনসালটেশনে।
এক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছে সুইডেন। বিএমজেতে প্রকাশিত গবেষণার ফলাফলও বলছে, সুইডেনের চিকিৎসকরা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা একজন রোগীর জন্য সময় বরাদ্দ রাখছেন ২২ মিনিটের বেশি।
গবেষণার জন্য ৬৭টি দেশের ১৯৪৬-২০১৬ পর্যন্ত ৭০ বছরের সংরক্ষিত তথ্য-উপাত্ত, জরিপ, স্টপওয়াচভিত্তিক পর্যবেক্ষণ, অডিও-ভিডিও টেপসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করেন গবেষকরা। তথ্য সংগ্রহে সহায়তা নেয়া হয়েছে বিভিন্ন দেশে জেনারেল প্র্যাকটিশনারদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন অব ন্যাশনাল কলেজেস, একাডেমিজ অ্যান্ড একাডেমিক অ্যাসোসিয়েশনস অব জেনারেল প্র্যাকটিশনার্স/ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানসের (ডব্লিউওএনসিএ) স্থানীয় সদস্যদের।
এর বাইরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও নিরাপদ ওষুধের প্রচারণায় কাজ করা ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্ক ফর দ্য র্যাশনাল ইউজ অব ড্রাগসের (ইউআইএনআরইউডি) ডাটাবেজের উপাত্ত ব্যবহার করেছেন গবেষকরা। সংগৃহীত এসব তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে রোগীদের পেছনে চিকিৎসকদের সময় ব্যয়সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন যুক্তরাজ্য, পর্তুগাল ও ফিনল্যান্ডের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালের সাতজন গবেষক। গত ৩১ জুলাই গবেষণাটি গৃহীত হয়। আর প্রকাশ করা হয় গত অক্টোবরে। এখন পর্যন্ত এ ধরনের সবচেয়ে বড় গবেষণা বলা হচ্ছে এটিকে।
২ কোটি ৮৫ লাখ কনসালটেশন পরীক্ষা করে গবেষকরা দেখিয়েছেন, রোগীপ্রতি ৫ মিনিটেরও কম সময় দেন ১৫টি দেশের চিকিৎসকরা। দেশগুলোর মধ্যে ভারতের চিকিৎসকরাও রোগীপ্রতি গড়ে দুই-আড়াই মিনিট সময় ব্যয় করেন। পাকিস্তানের রোগীদের জন্য সে দেশের চিকিৎসকরা বরাদ্দ রাখেন দেড় মিনিট সময়। চীনের রোগীরা তাদের চিকিৎসকদের কাছ থেকে পান ২ মিনিট সময়। আর বাংলাদেশের রোগীরা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় তাদের চিকিৎসকদের কাছ থেকে পান পৌনে ১ মিনিটের কিছু বেশি সময়।
এ সময়কে কম বলে মানছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও। জানতে চাইলে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, একজন রোগীকে ৪৮ সেকেন্ড সময় দেয়া অবশ্যই কম। এটা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে বিএমজেতে যে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে, সেখানে ১৯৯৩-৯৪ সালের তথ্যও রয়েছে।
রোগীর পেছনে চিকিৎসকদের মাথাপিছু সময় ব্যয়ের পরিমাণকে মানসম্পন্ন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই রোগীদের কম সময় দেয়ার ফলাফল কী হচ্ছে, সে সম্পর্কেও আলোকপাত করা হয়েছে গবেষণায়।
বলা হয়েছে, রোগীর পেছনে চিকিৎসকদের কনসালটেশন টাইম বা পরামর্শকালের সময় যত কম হবে, স্বাস্থ্যসেবার মানও তত খারাপ হবে। এতে সাধারণত রোগীর চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যায়। একই সঙ্গে বাড়ে রোগীর অতিমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের শঙ্কাও। নষ্ট হয় চিকিৎসক-রোগী পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক।
অন্যদিকে কনসালটেশন টাইম যত দীর্ঘ হয়, স্বাস্থ্যসেবার মানও তত উন্নত হয়। এ ব্যাপারে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিষণ্নতাসহ নানা মানসিক রোগের চিকিৎসায় রোগীর সঙ্গে চিকিৎসকের অতিবাহিত সময়ের বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে কম সময়ের মধ্যে রোগী বিদায়ের প্রবণতা রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধার সৃষ্টি করে। এছাড়া একাধিক রোগে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায়ও দীর্ঘায়িত কনসালটেশন বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তার পরও বাংলাদেশের চিকিৎসকরা রোগীপ্রতি কেন এত কম সময় দিচ্ছেন, সে কারণও ব্যাখ্যা করেছেন গবেষকরা। তারা বলছেন, চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়ার জন্য এখানকার রোগীদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেয়ার ব্যবস্থা খুব একটা নেই। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে একজন চিকিৎসককে দিনে ৯০ জন রোগী দেখতে হয়। একই ব্যবস্থাপত্রে কয়েকজনকে চিকিৎসা দেয়ার নজিরও আছে।
একজন রোগীর পেছনে কমপক্ষে ১০-১৫ মিনিট সময় দেয়া উচিত বলে মনে করেন ডব্লিইএইচওর সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক। তিনি বলেন, একজন রোগীর নাম ও বয়স জিজ্ঞাসা করতেই ৪৮ সেকেন্ড সময় চলে যায়। এছাড়া রোগীর অতীত ও বর্তমান এবং পারিবারিক ইতিহাসও জানতে হয়। এসবসহ ব্যবস্থাপত্র লিখতেই ১০-১৫ মিনিট সময় নেয়া উচিত।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাধারণ রোগব্যাধি নির্ণয় ও ব্যবস্থাপনা ছাড়া অন্য সব ব্যাধির ক্ষেত্রেই একজন চিকিৎসক রোগীর পেছনে ৫ মিনিটের কম সময় ব্যয় করলে সেখান থেকে খুব একটা সুফল আসে না। এছাড়া বিশেষজ্ঞের বিশেষায়িত সেবাদানের ক্ষেত্রেও এটি বড় ধরনের বাধা হয়ে উঠতে পারে।
যেসব দেশে স্বাস্থ্যসেবা খাতের চাহিদা অনেক বেশি, স্বাভাবিকভাবেই সেসব দেশের চিকিৎসকদের প্রতি রোগীপিছু সময় ব্যয়ের পরিমাণও বেশি হবে বলে প্রত্যাশা করা হয়। কিন্তু বাড়তি চাহিদার এসব দেশে রোগীদের পেছনে চিকিৎসকদের ব্যয়কৃত সময়ের পরিমাণ সবচেয়ে কম বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
দেশের রোগীপিছু চিকিৎসকের বরাদ্দকৃত সময় ও মাথাপিছু স্বাস্থ্যব্যয়ের সমানানুপাতিক সম্পর্ক দেখিয়ে গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় চিকিৎসকদের রোগীপ্রতি ব্যয়কৃত সময়কে দারিদ্র্যের অন্যতম সূচক হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এমনকি শিল্পোন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রেও এ কথা সত্য।
অন্যদিকে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় গড় কনসালটেশন টাইমের ক্ষেত্রে বেশ অবনতি দেখা যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ফলে এসব দেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা খাতে উন্নতির সুযোগ কম। এছাড়া এ খাতে প্রয়োজনীয় সম্পদের সরবরাহ দেয়া না হলে ক্রমবর্ধিত জনসংখ্যা বড় একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, রোগীপ্রতি সময় ব্যয়ে সবচেয়ে এগিয়ে স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশ সুইডেন। সেখানকার রোগীর পেছনে চিকিৎসকদের মাথাপিছু সময় ব্যয়ের পরিমাণ সাড়ে ২২ মিনিট। মোটামুটি এগিয়ে থাকা দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসকদের রোগীপ্রতি ব্যয়কৃত সময়ের পরিমাণ ২১ মিনিট। এছাড়া যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় চিকিৎসকরা রোগীদের সময় দিচ্ছেন যথাক্রমে ১০ ও ১৫ মিনিট করে। এশিয়ার দেশ সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকরা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় রোগীদের দিচ্ছেন গড়ে সাড়ে ৯ মিনিট সময়।
