'এগিয়ে যেতে হলে নারীদের স্বাবলম্বী হতে হবে'



সাকিব আহমেদ
বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে অনেক ক্ষেত্রেই নারীরা অনেক বেশি অবহেলিত, নির্যাতিত। নারীদের জন্য, তাদের ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করেন ঢাকার কে এম দাস লেন-এ অবস্থিত সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অধ্যাপক কানিজ ফাতেমা। পেপারস লাইফকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিঁনি তাঁর শিক্ষকতা ও নারীদের পক্ষে নিজের কাজ নিয়ে কথা বলেছেন।
পেপারস লাইফ : আসসালামুআলাইকুম।
কানিজ ফাতেমা : ওয়ালাইকুমআসসালাম
পেপারস লাইফ : কেমন আছেন?
কানিজ ফাতেমা: জ্বী, আলহামদুলিল্লাহ।
পেপারস লাইফ : কার অনুপ্রেরণায় শিক্ষকতায় আসা?
কানিজ ফাতেমা : প্রথম অনুপ্রেরণা পরিবার থেকে এসেছে। আমার বাবা ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। তিনি চাইতেন যে আমরা শিক্ষক হই। মূলত আমার বাবার কাছ থেকেই এসেছে।
পেপারস লাইফ : এত বছরের শিক্ষকতায় কোনো ভালো-খারাপ অভিজ্ঞতা?
কানিজ ফাতেমা : অবশ্যই ভালো অভিজ্ঞতাই বেশি, খারাপ অভিজ্ঞতা নেই। ককারণ, আমি মেয়েদের কলেজে চাকরি করি। মেয়েরা সাধারণত দেখা যায় মেয়েরা খুব নিয়ম মেনে চলে, ডিসিপ্লিন্ড হয়। তারা খুব পছন্দ করে আমাকে, মনে হয় আরকি (হেসে)। সেকারণেই ভালো অভিজ্ঞতাই বেশি। আমি অত্যন্ত অনুপ্রাণিত বোধ করি যখন মেয়েরা আমাকে রেসপেক্ট করে।
পেপারস লাইফ : এত বছরের শিক্ষকতায় যখন আপনার ছাত্রীরা আপনাকে বলে আপনি তাদের আদর্শ শিক্ষক, তখন কেমন বোধ করেন?
কানিজ ফাতেমা : আমার ভীষণ ভালো লাগে। আমি সারাজীবনে যা শিখেছি, সেগুলো যাতে আমি তাদেরকে শিখিয়ে যেতে পারি। আমি সেটাই চেষ্টা করি, আমার মধ্যে ভালো যা কিছু আছে তা যেন আমি আমার স্টুডেন্টদের শিখিয়ে যেতে পারি।
পেপারস লাইফ : বর্তমানে শিক্ষার অনেক কিছুই তো পরিবর্তিত হয়েছে, সেই পরিবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থার ভালো দিক ও খারাপ দিক আপনার কাছে কি মনে হয়?
কানিজ ফাতেমা : আমাদের বর্তমান পদ্ধতি হচ্ছে সৃজনশীল পদ্ধতি। আসলে, আমরা যেভাবে পড়াশোনা করে এসেছি তার চাইতেও সৃজনশীল পদ্ধতিতে আমি মনে করি একজন স্টুডেন্টদের অনেক ক্রিয়েরিভিটি, ইনোভেশন এই পদ্ধতি থেকে হতে পারে। কারণ সৃজনশীল পদ্ধতিতে স্টুডেন্টের তার চিন্তাভাবনা প্রকাশ করার কিছু ক্ষেত্র থাকে এবং তারা অনেক বিষয় নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশে এই পদ্ধতিতে পড়াশোনা করা হয়। আমাদের দেশে এটা নতুন পদ্ধতি। আমাদের সময়ে আমরা যেভাবে পড়াশোনা করেছি, তার চাইতেও এই পদ্ধতিতে মেধা বিকাশের অনেক সুযোগ থাকে। আর খারাপ দিক, অনেক স্টুডেন্টরা পড়াশোনা করে না। তারা না পড়েই দেখা যায় অনুমানের উপর কিছু ভুল উত্তর করে। তবে আমি মনে করি খারাপ দিকের চেয়েও ভালো দিকটাই বেশি।
পেপারস লাইফ : শিক্ষক না হলে কি করতেন?
কানিজ ফাতেমা : শিক্ষক না হলে অনেক কিছুই করতাম। যেমন আমি গান করি, ফ্যাশন ডিজাইনিং করি। নিজের ছোট খাটো একটা ফ্যাশন ডিজাইনিং ফ্যাক্টরি আছে, আমার আইটি বিজনেস আছে। অনেক কিছুই করতাম হয়ত। তবে আমি গায়িকা হতাম। কারণ, এটা আমার প্যাশন।
পেপারস লাইফ : বর্তমান পরীক্ষা ব্যবস্থায় প্রশ্ন ফাঁসের একটা বিষয় চলে আসে। যাতে শিক্ষার্থীদের যথেষ্ট মূল্যায়ন হয় না। এ বিষয়কে আপনি কি চোখে দেখেন?
কানিজ ফাতেমা: এটা অত্যন্ত  দুঃখজনক ব্যাপার যে, আমাদের প্রশ্ন ফাঁসের একটা ঘটনা ঘটে। যেটা হয়ত আমরা সঠিকভাবে চিন্তা করি, তবে প্রতিরোধ করা সম্ভব। এটা ঠিক, প্রশ্ন ফাঁসের ফলে যারা সত্যিকারের মেধাবী তাদের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। প্রযুক্তিগত ভাবে যদি আমরা আরো উন্নত হতে পারি, তবে এটাও কমিয়ে আনা সম্ভব।
পেপারস লাইফ : বর্তমানে অসদুপায় অবলম্বন এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সম্পর্কে কি বলতে চান?
কানিজ ফাতেমা : মুখস্ত করার ব্যাপারটা কমিয়ে এনে আমরা যদি শিক্ষার্থীদের বুঝে পড়ার মানসিকতা তৈরি করলে তাদের আর অসদুপায় অবলম্বন করতে হচ্ছে না। পড়াটাকে তাদের কাছে আরো আকর্ষনীয় করতে পারলে এই সমস্যা অনেক কমে আসবে। এর জন্য প্রযুক্তির সাহায্য নিতে হবে।
পেপারস লাইফ : আপনি তো নারীদের জন্য অনেক কিছুই করেন। এই ভাবনাটা আপনার কোথা থেকে আসলো?
কানিজ ফাতেমা : আমাদের সমাজে মেয়েরা অনেক ক্ষেত্রেই অত্যন্ত নির্যাতিত, অবহেলিত। সেই জন্যই আমি মনে করি, মেয়েরা যদি নিজেরা স্বাবলম্বী হতে পারে তাহলেই এই নির্যাতনগুলো কমে আসবে। সেই জন্যই আমি মূলত নারীদের ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করি।
পেপারস লাইফ : কিভাবে নারীরা অধিকার আদায়ে সক্ষম হবে বলে আপনি মনে করেন?
কানিজ ফাতেমা : যদি নারীরা স্বাবলম্বী হয়, অন্তত অর্থনৈতিকভাবে অন্যের উপর নির্ভরশীল না হয়, নিজেরা যদি কিছু করতে পারে – ছোট খাট যেকোনো কাজ করে অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হয়, তাহলে তাদের নির্যাতনের পরিমাণ কমে আসবে বলে আমি মনে করি।
পেপারস লাইফ : নারীদের ক্ষমতায়নের ব্যাপারে তাদের উদ্দেশ্যে কি মেসেজ দিবেন?
কানিজ ফাতেমা : আমার একটাই কথা, প্রথম পড়াশোনা করতে হবে। পড়াশোনা শেষে আমরা যে জ্ঞান অর্জন করেছি সেটা যদি আমরা কাজে লাগাই তাহলে তারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারবে। নারীর ক্ষমতায়নই বড় কথা নয়, তাদের আরো সহনশীল হতে হবে। তাদের মনে রাখতে হবে, তারা মায়ের জাত। তাহলে তারা আরো এগিয়ে যাবে। আমার একটাই মেসেজ, সবাই যাতে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করে। কখনো যেন অন্যের দ্বারস্থ হতে না হয়।
পেপারস লাইফ : সামনে আপনার আয়োজিত একটি অনুষ্ঠান আছে। সে সম্পর্কে পাঠকদের কি জানতে চান?
কানিজ ফাতেমা : আমার অনুষ্ঠানটির নাম জয়ন্তিকা। এটিও আসলে নারীদের ক্ষমতায়ন নিয়ে। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের কাজ যেমন : ফ্যাশন ডিজাইনিং, আউট সোর্সিং, ফ্রিল্যান্সিং, আরো বিভিন্ন কাজ শিখে কিছু একটা করে। নারীদের শোষণ সেখান থেকেই হয়, যখন তাদের অন্যের কাছে হাত পাততে হয়। সেটা যাতে না করতে হয়, সেই জন্যই আমার একটি প্রচেষ্টা। তারা কিভাবে অর্থনৈতিকভাবে মুক্তি পেতে পারে এটাই হচ্ছে আমার প্রোগ্রামের মূল উদ্দেশ্য।
পেপারস লাইফ : আপনার আইডল?
কানিজ ফাতেমা : আমার আইডল শেখ হাসিনা। কারন উনি এত দুঃখ কষ্টের মধ্য দিয়ে যেয়েও দেশের হাল ধরেছেন। তাই আমার আইডল তিনি।