নয়নরাঙা – শেষ অধ্যায় | সাকিব আহমেদ




‘নয়ন মামা, উঠো।’ দিয়ার ডাক শুনতে পেলো নয়ন। ‘আর কত ঘুমাবে? যাবে না? সময় যে চলে যাচ্ছে!’

‘উঠছি।’ ঘুমজড়িত কণ্ঠেই বলল নয়ন। কাল রাতে ঘুমোতে দেরি হয়েছে। অফিসের কিছু কাজ ছিল, শেষ করেই ঘুমিয়েছে। আজ অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে। প্রতি বছরই এই দিনে অফিস যায় না নয়ন। কাজকর্ম করে না। নিজের পুরোটা সময় অতিবাহিত করে বিশেষ এক কাজে।

নাহ! বিশেষ কোনও আনন্দের কাজে সময় ব্যয় করে না। নয়নের কাছে আজকের এই দিন বিষাদের, বেদনার। কেননা, বিশ বছর আগের এই দিনে সে হারিয়েছে তার সবচেয়ে কাছের বন্ধুটিকে। রাঙার নিথর, নিস্তব্ধ হয়ে থাকা দেহটিকে কবরের মাঝে শুইয়ে এসেছে। যেখান থেকে রাঙা ফেরেনি। সবার কাছ থেকে চলে গিয়েছে দূরে।

সেদিনের পর থেকে প্রতি বছর এই দিনে কোনও কাজ করে না নয়ন। রাঙার জন্য দোয়া-দরুদ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, ওপারে রাঙার ভালো থাকার জন্য প্রার্থনা করে। রাঙার কবরের সামনে যেয়ে পড়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা!

নয়নরাঙা | সাকিব আহমেদ  

প্রথম প্রথম এ দিনে রাঙার কবরের কাছে একা যেতো নয়ন। অনন্যা অনেকবার যেতে চাইলেও নয়ন কখনো নিয়ে যেতো না। কেন নিতে চাইতো না নয়ন, জানেনা অনন্যা। জিজ্ঞেস করেনি কখনো। নয়নের উপর তার অগাধ বিশ্বাস, ভরসা। তাই নিজে থেকে নয়ন কোনও কিছু না বললে জোর করে জানার চেষ্টা করে না অনন্যা।

অনন্যা নয়নের বিবাহিতা স্ত্রী। যেদিন রাঙা মারা যায়, সেদিন দুইজনের বিয়ে হবার কথা ছিল। কিন্তু তা আর হয়নি! রাঙার মৃত্যু সবকিছু স্তব্ধ করে দিয়েছিল। থমকে দিয়েছিল নয়নের গতিপথ। এমন অবস্থায় নয়নের পাশে কেবল একজনই ছিল – অনন্যা। ভরসা দিয়েছে, বিশ্বাস দিয়েছে! আর অপেক্ষা করেছে নয়নের জন্য। কখনো জোর করেনি নয়নকে। নয়নের মতের উপর নিজের পুরো ভবিষ্যৎ ছেড়ে দিয়েছিল। এমন এক মেয়েকে কষ্ট দিতে চায়নি নয়ন। তাই নেহাত, বাধ্য হয়েই বিয়ে করেছে। বিয়ের পর নয়ন বুঝেছে, এমন মেয়ে লাখে একটা মেলে। খুব বড় ভাগ্য না হলে জীবন সঙ্গিনী হিসেবে এমন কাউকে পাওয়া যায় না! ও হ্যাঁ, নয়নের জন্য এই অনন্যাকে রাঙাই খুঁজে তো বের করেছে। অথচ বন্ধুর ভালো থাকা সুখে থাকা দেখে যেতে পারেনি রাঙা!

রাঙার মৃত্যুবার্ষিকীতে আগে নয়ন একা গেলেও, বেশ কয়েক বছর তার সঙ্গী হিসেবে জুটেছে দিয়া। দিয়া রাঙার মেয়ে। যেদিন রাঙার মৃত্যু হয়, সেদিনই পৃথিবীর আলো দেখা মেয়েটা কখনোই মায়ের আদর পায়নি। সেই মায়ের আদর দিয়ে দিয়াকে বড় করেছে অনন্যা। আর বাবার মত স্নেহ দিয়ে আগলে রেখেছে দিয়ার প্রিয় নয়ন মামা।

রাঙার মৃত্যুর তিন বছর পর রাঙার হাজবেন্ড সেলিমও মারা যায়। তার মৃত্যু নয়নের কাছে একটা রহস্য! যার সুরাহা আজও করা সম্ভব হয়নি। ডাক্তারের মতে, হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে সেলিম। আত্মীয়রা বলে, রাঙার চলে যাওয়ার দুঃখ-শোকে টিকে থাকতে পারেনি সেলিম। নয়ন অবশ্য এসব মানতে পারে না! রাঙার চলে যাওয়ার পর এভাবে সেলিমের চলে যাওয়া পাথর করে দিয়েছে তাকে।

‘এখনও রেডি হও নাই?’ দিয়ার গলা শুনতে পেলো নয়ন।

‘আর পাঁচ মিনিট।’ জবাব দিলো নয়ন। পাঁচ মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে দিয়াকে নিয়ে বের হলো নয়ন। উদ্দেশ্য রাঙার কবরস্থান।

‘চুপ কেন, মামা?’ জিজ্ঞেস করল দিয়া। রিকশা করে নয়নের সাথে মায়ের কাছে যাচ্ছে। যে মায়ের আদর কখনো পায়নি সে। মা বলে ডাকতে পারেনি। মায়ের কোলে মাথা রেখে ঠাকুমার ঝুলি শুনতে পারেনি।

‘নারে, কিছু না।’ বলল নয়ন।

‘মা’র কথা মনে পড়ছে?’

‘তোর বাবা’র কথাও।’ বলল নয়ন। দিয়া জানে, তার মা-বাবাকে অসম্ভব ভালোবাসে তার নয়ন মামা। দিয়াকেও খুব ভালোবাসে নয়ন। নিজের মেয়ের মতো করেই মানুষ করছে। সব আবদার পূরণ করছে। দিয়ার জন্মের চার বছর পর অনন্যার কোলে জুড়ে এসেছিল ফুটফুটে এক মেয়ে। যার নাম আঁখি। আঁখির সাথে দিয়ার কোনও পার্থক্য করেনি নয়ন আর অনন্যা। বরং আঁখি আর দিয়াকে নিজের দুই মেয়ে বলেই পরিচয় দেয় দুই জন। ওরাও দুই বোনের মতো একে অপরের সাথে লেগে থাকে। একজন ছাড়া আরেকজন যেন অসম্পূর্ণ!

‘তোর বাবা-মা কত স্বার্থপর দেখেছিস?’ কিছুক্ষণ থেমে বলল নয়ন। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু আড়ালের জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। দিয়াকে দেখাতে চায় না, তার শক্ত-সমর্থ, পাথর হয়ে যাওয়া নয়ন মামা ভেতর থেকে তার চেয়েও বেশি নরম। ‘আমাকে এভাবে একা ফেলে চলে গেলো। একবার ভাবল না, আমার কি হবে? আমি কি নিয়ে থাকব। আমি তো তাদের জন্যই সেবার দেশে এসেছিলাম। আর ওরা?’

আবার নয়নরাঙা | সাকিব আহমেদ  

চুপচাপ নয়নের কথা শুনছে দিয়া। কিছু বলছে না। নয়ন কখনো কাউকে কিছু বলে না। নিজের মনের কষ্ট নিজের ভেতরেই রাখতে পছন্দ করে। ভেতরে ভেতরে জ্বলে পুড়ে ছারখার হলেও বাইরে থেকে শান্ত চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই, কত কষ্ট বুকের ভেতর পুষে রেখেছে। কেউ জানেনা, কেউ বুঝে না। আজ সব কষ্ট বের করার সুযোগ দিচ্ছে দিয়া।

‘এখন তোরাই আমার সব।’ বলল নয়ন। ‘তুই আর আঁখি আছিস বলেই বেঁচে থাকার শক্তি পাই।’

‘আর, অনন্যা মামী?’ জিজ্ঞেস করল দিয়া। দিয়ার কথায় হাসল নয়ন। বলল, ‘ওকে আমি আমার অস্তিত্ব মনে করি। আমার জীবনের সাথে অর কোনও পার্থক্য নেই। ওর কথা আলাদা!’

কথা বলতে বলতে কবরস্থানে এসে পৌঁছল ওরা। রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। রাঙার কবর খুঁজে পেতে বেগ পেতে হলো না। এই বিশ বছরে এতবার কবরটার সামনে এসেছে নয়ন, পুরো রাস্তা তার মাথায় ম্যাপের মতো গেঁথে গিয়েছে।

রাঙার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে অপলক চোখে চেয়ে আছে নয়ন। নীরব মনে প্রার্থনা করছে। ওপারে যেন ভালো থাকে তার প্রিয় বন্ধুটি। দিয়া জানে, এ সময় নয়ন কথা বলবে না। বেশ কয়েক বছর ধরেই নয়নকে এভাবে দেখছে দিয়া। নীরব নয়নের বুকের ভেতরের উথাল পাতাল যন্ত্রণা অনুভব করার চেষ্টা করছে দিয়ে, কিন্তু পারছে না।

মায়ের মুখ কখনো দেখেনি দিয়া। শুধু ছবিতেই দেখেছে। মা যে কতটা ভাগ্যবতী ছিল তা উপলব্ধি করতে পারে সে। এমন বন্ধু পাওয়া তো ভাগ্যের ব্যাপার! শুধু জীবিত থেকে এমন ভালোবাসা না পাওয়ার আক্ষেপ হয়ত মা অন্য পৃথিবী থেকেই করছে।

এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে ইতোমধ্যে। দিয়ার ভার্সিটিতে ক্লাস আছে। ইম্পরট্যান্ট ক্লাস, যেতে হবে। আলতো করে নয়নের কাঁধে হাত রাখল দিয়া। ফিরে তাকাল নয়ন। কেমন যেন শূন্য দৃষ্টি। তাকিয়ে আছে, অথচ মনে হচ্ছে দেখছে না কিছুই দেখছে না।

‘মামা, আমার ক্লাস আছে।’ বলল দিয়া। ‘যেতে হবে।’ অবশেষে সম্বিৎ ফিরে পেলো যেন নয়ন।

‘এখনই যাবি?’ জিজ্ঞেস করল নয়ন।

‘হ্যাঁ,’ জবাব দিলো দিয়া। নাহলে যে দেরি হয়ে যাবে।’

‘চল, আমি তোকে দিয়ে আসছি।’

‘না, না!’ বাঁধা দিলো দিয়া। ‘তুমি শুধু আমাকে রিকশা ঠিক করে দাও। আমি চলে যেতে পারব।’

দিয়ার জন্য রিকশা ঠিক করে দিলো নয়ন। দিয়ার যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে রয়েছে। মা-বাপ মরা মেয়েটাকে অনেক ভালোবাসে নয়ন। সেদিন সেলিম মারা যাওয়ার পর দিয়াকে যখন নিজের কাছে আনতে চেয়েছিল, অনেকেই বাঁধা দিয়েছে। সেলিমের বাবা মা, মানে দিয়ার দাদা-দাদি চেয়েছিল তারাই তাদের নাতনীকে মানুষ করবে। কিন্তু নয়ন নাছোড়বান্দা। তার জেদের কাছে সবাই হার মেনেছিল অবশেষে। দিয়ার আত্মীয় স্বজন সবাই মাঝে মাঝেই দিয়াকে এসে দেখে যায়। দিয়াও সময় সুযোগ পেলে তাদের কাছ থেকে ঘুরে আসে। কিন্তু নয়ন কখনো দিয়াকে চোখের আড়াল করে না। নিজের কাছে রেখেই মানুষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

চোখের আড়াল হয়ে পড়েছে দিয়ার রিকশাটা। নয়ন ঘুরল আবার কবরস্থানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। এই দিনে সারাদিন এখানেই পড়ে থাকে সে। এমন সময় একটি কণ্ঠ শুনতে পেলো নয়ন।

‘আমার জন্য অপেক্ষা করছিলি?’ কণ্ঠটা জিজ্ঞেস করল। নয়ন পাশ ফিরে তাকাল, হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে রাঙা।

‘এত দেরি করলি যে?’ জিজ্ঞেস করল নয়ন।

‘দিয়া ছিল তো!’ জবাব দিলো রাঙা। ‘ওর সামনে কিভাবে আসি?’

‘ও তো আর তোকে দেখতে পেতো না!’ বলল নয়ন। হ্যাঁ, রাঙাকে কেউ দেখতে পায় না। কেবল নয়নের সামনেই আসে রাঙা। অন্য কেউ সামনে থাকলেও রাঙা কারও নজরে পড়ে না। প্রথম প্রথম নয়নের মনে হতো সে কি পাগল হয়ে গেছে? শুধু সেই কেন রাঙাকে দেখবে? হ্যালুসিনেশন? এসব ভেবে ভেবে অস্থির হয়ে থাকত একসময়। এরপর আসতে আসতে উপলব্ধি করেছে, রাঙা কেবল বন্ধুত্বের কারণেই ফিরে ফিরে আসে। বারবার ফিরে আসে। নয়নের কাছে ফিরে আসে।

কাব্যকথা | সাকিব আহমেদ  

এ ঘটনা কাউকে বলেনি নয়ন। বললে হয়ত অনেকেই তাকে পাগল ভাববে। তাই নিজের মনের মাঝেই রেখেছে বিষয়টা। মাঝে মাঝে অবশ্য নয়নের মনে হয়, আসলেই কি রাঙা আসে? নাকি সব তার মনের ভুল? সেসব ভাবতে চায় না নয়ন। রাঙা আসে, রাঙার সাথে মন খুলে কথা বলতে পারে, এটাই তো শান্তির।

‘এভাবে আর কতদিন এখানে আসবি?’ কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করল রাঙা।

‘যতদিন সক্ষমতা আছে।’ হেসে জবাব দিলো নয়ন।

‘তোর উচিৎ অনন্যার পাশে থাকা।’ বলল রাঙা। ‘আঁখি আর দিয়াকে মানুষ করার দায়িত্ব তোর। এভাবে আমাকে নিয়ে পড়ে থেকে আর কতদিন? এবার আমাকে ভুলে যা।’

রাঙার এ কথায় কিছুক্ষণ চেয়ে রইল নয়ন। তারপর বলল, ‘তোকে ভুলে যেতে বলছিস? তুই জানিস রাঙা, আমি আমাকে ভুলে যেতে পারি, তোকে ভুলে যেতে পারব না। তুই না হয় আমাকে ছেড়ে দূরে চলে গিয়ে দিব্যি আছিস। আমি তো তোর মতো এতটা স্বার্থপর নই।’

নয়নের কথার কি জবাব দেবে রাঙা? কিছুই বুঝছে না। আসলে জবাব দেওয়ার কিছু নেইও! রাঙা জানে, তাকে ছাড়া নয়ন বড্ড একা হয়ে গিয়েছে। নয়ন যে প্রতিনিয়ত তাকে মিস করে, এও বুঝে রাঙা। কিন্তু কিছু যে করার নেই! যেখানে রাঙা চলে গিয়েছে সেখান থেকে ফিরে আসা রাঙার পক্ষে সম্ভব না।

‘অনেক হয়েছে,’ নীরবতা ভেঙে বলল রাঙা। ‘এবার বাসায় যা। সবাই তোর জন্য অপেক্ষা করছে।’

কিছুক্ষণ রাঙার সাথে বসে থেকে বাসায় ফিরে এলো নয়ন। আবার কবে রাঙার সাথে দেখা হবে জানেনা। এখন সে চাইলেও দেখা হওয়া সম্ভব না। রাঙার মন যখন চাইবে, এসে দেখা দিবে। ততক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা!

স্ক্রিনের আলোয় পড়াশোনা | সাকিব আহমেদ  

ঘড়িতে রাত দুইটা বাজে। নিজের স্টাডিরুমে কাজ করছে নয়ন। অফিসের বেশ কিছু কাজ বাকি আছে, শেষ করেই ঘুমাবে।

‘আর কতক্ষণ এভাবে কাজ করবি? ঘুমাতে যাবি না?’ রাঙার কণ্ঠে রাতের নীরবতা ভেঙে খানখান। কাজ করায় এতোটা মশগুল ছিল নয়ন, রাঙার কণ্ঠে চমকে উঠেছে। রাঙাকে দেখল, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে চেয়ে রয়েছে।

‘তোর এই স্টাডিরুমটা আমার বেশ পছন্দের। বাইরের প্রকৃতি দেখা যায়।’ বলল রাঙা। ‘আকাশে কি সুন্দর চাঁদ উঠেছে। এসে দেখে যা।’

রাঙার পাশে এসে দাঁড়াল নয়ন। সত্যি আজকের চাঁদটা বড্ড বেশি সুন্দর। কবির ভাষায়, ঠিক যেন ঝলসানো রুটি। নয়নের কাছেও তার এই স্টাডিরুম বেশ পছন্দের। বিল্ডিংয়ের ১৫ তলার এই রুম থেকে প্রকৃতির এক অপরূপ শোভা দেখা যায়। সে কারণেই এই ঘরকেই স্টাডিরুম বানিয়েছে নয়ন। কাজ করতে করতে ক্লান্তি এলে এভাবে জানালার পাশে এসে দাঁড়ায় সে। মন ভালো হয়, সমস্ত অবসাদ দূর হয়ে যায়।

‘তুই এই অসময়?’ রাঙাকে জিজ্ঞেস করল নয়ন।

‘তোকে দেখতে ইচ্ছা করল,’ জবাব দিলো রাঙ্গা। ‘তাই চলে এলাম।’

‘আমি যদি ঘুমিয়ে থাকতাম?’

‘তাহলে তোকে দেখেই চলে যেতাম। তোকে দেখতে এসেছি, কথা বলতে নয়।’

‘তোর যখন ইচ্ছা হয়, দেখা করতে আসতে পারিস। দেখতে আসতে পারিস। অথচ আমি চাইলেও পারি না। সব যে তোর ইচ্ছা মতোই হয়!’

নয়নের এ কথার জবাব দিলো না রাঙা। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘রাত অনেক হয়েছে। ঘুমাতে যা। কাল অফিস আছে না?’

‘হুম, যাই।’ বলল নয়ন। এরপর জিজ্ঞেস করল, ‘আবার কবে আসবই?’

‘যখন মন চাইবে।’ হেসে জবাব দিলো রাঙা। বিদায় নিয়ে চলে গেলো। মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে গেলো যেন! কিভাবে আসে, কিভাবে যায় – বুঝে না নয়ন। বুঝতে অবশ্য চেষ্টা করে না। রাঙার এভাবে আসা, কথা বলাই নয়নের কাছে মূল্যবান।

অনলাইন এক্সাম | সাকিব আহমেদ  

অফিসের কাজে বাইরে যেতে হচ্ছে নয়নকে। বুলেটের গতিতে ছুটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বাইক। নয়নের এই এক অভ্যাস! বাইকে একা থাকলে এতো জোরে ছুটে, কখন জানি এক্সিডেন্ট হয়ে যায়। সাথে অন্যকেউ থাকলে অবশ্য শান্তভাবেই বাইক চালায়।

‘এত জোরে যে বাইক চালাচ্ছিস, এক্সিডেন্ট হবে যে!’ রাঙার কণ্ঠে ফিরে তাকালো নয়ন। বাইকের পেছনে বসে আছে রাঙা। কখন এসে পিছনে বসেছে, চিন্তা করারও সুযোগ পেলো না।

‘হলে তো ভালোই হয়!’ বলল নয়ন। ‘তোর কাছে চলে যেতে পারব।’

‘ডিয়ার স্যার, আপনাকে আমি এত সহজে আমার কাছে নিচ্ছি না। আপনাকে এখানে অনেকের প্রয়োজন। অনেক কাজ করা বাকি। তুই না থাকলে আঁখি আর দিয়াকে কে দেখবে?’ বলল রাঙা। সেটাও কথা। আঁখি, দিয়াই তো এখন নয়নের সবকিছু। ওদের জন্যই তো বেঁচে আছে।

‘কিন্তু, তুই এখন? এসময়?’ জিজ্ঞেস করল নয়ন।

‘তোর সাথে বাইকে চড়তে ইচ্ছে হলো, তাই চলে এলাম।’ জবাব দিলো রাঙা। ‘কিন্তু তুই যে এতো জোরে বাইক চালাস, ঠিক না!’

‘ভয় পাচ্ছিস?’

‘মরা মানুষের আবার কিসের ভয়?’

‘তাহলে?’ নয়নের এ কথার জবাব দিলো না রাঙা। ‘রাঙা,’ গলা চড়িয়ে ডাকল নয়ন। জবাব নেই। পিছন ফিরে দেখতে যাবে রাঙা আছে কি নেই, এমন সময় একটি বাস এসে সজোরে ধাক্কা দিলো নয়নের বাইকে। এরপর? সব অন্ধকার।

দস্যিপনা | সাকিব আহমেদ  

অপরিচিত নাম্বার সাধারণত রিসিভ করে না তিথি। কি মনে করে আজ রিসিভ করল। তিথি নয়নের ছোট বোন। ওপাশের কথা শুনে হাত থেকে শুরু করে পুরো শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। ভাইয়া এক্সিডেন্ট করেছে, যেতে হবে। মোবাইলে নিজের হাজবেন্ড জয়ের নাম্বারে ডায়েল করল তিথি। দুইবার রিং হতেই রিসিভ করল জয়। জানালো নয়নের এক্সিডেন্টের খবর।

‘তুমি এখনই বেরিয়ে পড়ো।’ বলল জয়। ‘আমি আসছি।’ একটু থেমে জিজ্ঞেস করল, ‘ভাবিকে জানিয়েছ?’

‘না,’ জবাব দিলো তিথি। ‘কিভাবে বলব বুঝতে পারছি না।’

‘দিয়াকে কল দিয়ে জানাও। দেরি করো না, বেরিয়ে পড়ো।’ বলল জয়। খুব দ্রুত রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়ল তিথি। বেরোতে বেরোতে দিয়াকে কল দিলো। নয়নের কথা জানিয়ে বলল, তাড়াতাড়ি হাসপাতালে চলে আসতে। অনন্যা আর আঁখিকে নিয়ে আসতে বলে ফোন কেটে দিলো।

হাসপাতালে পৌঁছাতে লাগল ২০ মিনিট। তিথির মনে হতে লাগল অনন্তকাল সে রাস্তায় চলছে। রাস্তা যেন ফুরোতে চায় না। অবশেষে হাসপাতালে পৌঁছল সে। রিসিপশন থেকে জানালো, নয়নকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে।

যে তিথিকে ফোন দিয়ে নয়নের খবর জানিয়েছিলো, সে আইসিইউ’র সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে জানলো, কিভাবে এক্সিডেন্ট হয়েছে নয়নের। তিনজনকে সাথে নিয়ে সেই নয়নকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। নয়নের ফোনের কল লিস্টে প্রথম নম্বরে বোন লেখা দেখে সেই নম্বরে কল দিয়েছে।

‘অনেক ধন্যবাদ আপনাকে,’ বলল তিথি। ‘আপনি না থাকলে হয়ত বিপদ হয়ে যেতো।’

‘কি যে বলছেন!’ বিনয়ের সাথে বলল লোকটি। ‘এ তো আমার দায়িত্ব। মানুষ যদি মানুষের উপকারে না আসে, তাহলে কি করে হবে?’

আরেকবার ধন্যবাদ জানালো তিথি। বিদায় নিয়ে চলে গেলো লোকটি। তার যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই হাসপাতালে এসে পৌঁছেছে দিয়া, আঁখি, অনন্যা আর জয়। ডাক্তার জানিয়েছে, নয়নের অবস্থা ভালো না। উপরওয়ালার কাছে প্রার্থনা করতে।

পাড়ার ক্রিকেট | সাকিব আহমেদ  

‘আমি তো ঝগড়া হলে রাগ করে বলতাম এতো মানুষ মরে তুই মরিস না কেন, কিন্তু আমি তো মন থেকে কখনোই চাইনি এমনটা হোক।সব আমার জন্য হলো, সব হয়তো আমার বদ দোয়ার ফসল। কিন্তু আমি তো ঠাট্টার ছলেই ওসব বলতাম। আমি আর কখনো ঝগড়া বা মারামারি করবোনা। তুই ফিরে আয় প্লিজ!’ নয়নের মাথার কাছে বসে একা একাই কথা বলছে তিথি। আর কাঁদছে। সবসময় ভাইয়ের সাথে ঝগড়া করেছে, মারামারি করেছে। পান থেকে চুন খসলেই অসম্মান করেছে। আজ মনে হচ্ছে, এ ভাই ছাড়া ওর কেউ নেই। ও যেন অসহায়, বড্ড অসহায়!

বিজয়োল্লাস | সাকিব আহমেদ  

‘তুই তাহলে আমার কাছে চলে আসার কথাই ভাবছিস?’ জিজ্ঞেস করল রাঙা। কোনও এক সবুজের উদ্যানে নয়নের পাশে বসে আছে সে। রাঙার কথার জবাব দিলো না নয়ন। চুপ করে বসে আছে কিছু না বলেই। ‘কিন্তু তোর যে এখন আসা যাবে না আমার কাছে।’ আবার বলল রাঙা। ‘তোর অনেক কাজ আছে, সেগুলো পূরণ করতে হবে যে!’

‘আমার মনে হচ্ছে, এবার তোর কাছে চলেই আসব।’ অবশেষে বলল নয়ন। ‘পৃথিবী আমাকে চায় না আর।’

‘কে বলেছে চায় না?’ বলল রাঙা। ‘তোকে সবাই চায়। তুই যদি না থাকিস, আমার মেয়েকে কে দেখবে বল? দিয়ার তো তুই ছাড়া কেউ নাই। আঁখিকে মানুষ করবি না? আঁখি আর দিয়াকে তুই তোর মতো করে গড়ে তুলবি। অনন্যাকে এভাবে একা ফেলে তুই চলে আসতে পারিস না। ওর তোকে প্রয়োজন। আর তিথি? যেই বোন তোর মাথার সামনে বসে কাঁদছে, তার কথা ভাববি না?’

কিছু বলছে না নয়ন। সব চুপচাপ শুনছে। ‘তুই যা।’ বলল রাঙা।  আমি আবার আসবো তোর কাছে। তোকে ছেড়ে যে দূরে থাকতে পারি না। সময় হলে ঠিকই তোকে আমার কাছে নিয়ে আসবো। এখন সে সময় হয়নি।’

বাঙালীয়ানা | সাকিব আহমেদ  

নয়নের হাত ধরে বসে ছিল তিথি। সে হাত কেঁপে উঠল মনে হলো! আসলেই কি তাই? ভালো মতো ভাইয়ের হাত ধরল। হ্যাঁ, নড়ছে। নয়নের চোখ পিটপিট করছে। একটু একটু করে চোখ খুলছে নয়ন। স্পষ্ট হচ্ছে তিথির চেহারা। আর হালকা হতে হতে হারিয়ে যাচ্ছে রাঙার অবয়ব। রাঙা বলেছে, সে ফিরবে। আবার ফিরবে! বন্ধুত্বের দাবি নিয়ে ফিরবে নয়নের কাছে।

স্বপ্নে বাংলাদেশ, স্বপ্নের বাংলাদেশ | সাকিব আহমেদ  

পেপার’স লাইফ/গল্প/সাকিব আহমেদ