সাকিব আহমেদের গল্প “দস্যিপনা”


bdnews24 bangla newspaper, bangladesh news 24, bangla newspaper prothom alo, bd news live, indian bangla newspaper, bd news live today, bbc bangla news, bangla breaking news 24, prosenjit bangla movie, jeeter bangla movie, songsar bangla movie, bengali full movie, bengali movies 2019, messi vs ronaldo, lionel messi stats, messi goals, messi net worth, messi height

‘জয়, একদম দুষ্টুমি করবে না। বিছানায় শুয়ে ঘুমাও। বাইরে যেতে যেন না দেখি।’ মায়ের কথাগুলো কানে এসেছে জয়ের। তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত না সে। মা ঘুমিয়ে পড়লে সে বের হবে। এমন সময় কেউ ঘুমায় নাকি?

মায়ের পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। নিশ্চয়ই এই ঘরের দিকেই আসছে। চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকল জয়। মা এসে একবার দেখে গেল ছেলে ঘুমোচ্ছে। দুপুরে খাবার পর ভাত ঘুম দিতে সেও বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। প্রতিদিনের নিয়ম, তাই খাওয়া শেষে বাধ্য হয়ে বিছানায় যেতে হয় জয়কে। তবে সে ঘুমোতে চায় না। সে চায় ছুটে বেড়াতে। গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে বন্ধুদের সাথে ছুটে বেড়াতেই তার বেশ ভালো লাগে।

কিন্তু মায়ের সাথে পেরে উঠে না জয়। তাই ঘুম আসুক আর না আসুক রুটিন মাফিক জয়ও লক্ষী ছেলের মতো বিছানায় যায়, কিন্তু প্রতিদিন সে ঘুমোয় না। অপেক্ষা করে মায়ের ঘুমানোর। এরপর চুপিচুপি বের হয়ে যায়।

সাকিব আহমেদের গল্প “কাব্যকথা”

টিনের চালে হঠাৎ শব্দ। কেউ ঢিল মেরেছে মনে হয়। নিশ্চয়ই তিথি। জয়ের দেরি দেখে ডাকতে এসেছে। কিন্তু কি করবে সে? মা তো এখনো ঘুমায়নি। এখন বের হলে মা যদি একবার টের পায়, নির্ঘাত বকা খেতে হবে। পিঠের মধ্যে এক দুইটা বেতের বাড়িও পড়তে পারে।

জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল, তিথি বাইরে দাড়িয়ে আছে। অনেকটা দূরে, কিন্তু লাল ফ্রক চিনতে অসুবিধা হলো না। চট করে উঠল জয়। বিছানা ছেড়ে নামলো। মায়ের ঘরের দরজার সামনে যেয়ে কান পাতলো। না, কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না। মা এতক্ষণে ঘুমিয়ে গেছে বোধহয়।

নিজের ঘরে এসে চপ্পল হাতে নিলো জয়। চুপিচুপি গুটিগুটি পায়ে বের হলো, যেন কোনো শব্দ না হয়। বাইরে বের হয়ে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। দূরে দাড়িয়ে তিথি হাত নেড়ে ডাকছে। সেদিকে দৌড় দিলো জয়।

তিথি আর জয় দুজন বন্ধু। ছোটবেলা থেকে একসাথে বেড়ে উঠেছে। একসাথে খেলে, পাশাপাশি বাড়িতে থাকে, একই স্কুলে, একই ক্লাসে পড়ে দুইজন। ক্লাস ফোরে তাদের সাথে আছে জামাল, পিন্টু, তৃষা, সীমান্ত। এই ছয়জনের গ্রুপের কারণে মোটামুটি অতিষ্ঠ গ্রামবাসী। এমন কোনো দুষ্টুমি নেই, যেটা তারা করে না! কারো গাছের আম চুরি করা, মুরগির খোপ থেকে মুরগি ছেড়ে দেওয়া, পুকুরে ঝাপাঝাপি, দাপাদাপি তো আছেই। আর এসব দস্যিপনায় নেতৃত্ব দেয় তিথি আর জয়।

সাকিব আহমেদের গল্প “নয়নরাঙা”

‘বাকিরা কোথায়?’ হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল জয়।

‘ওরা পুকুর পাড়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।’ উত্তর দিলো তিথি।

পুকুরের পানিতে পা ডুবিয়ে বসে আছে তৃষা। গুণগুণ করে গান গাইছে। তার গানের গলা খুবই মিষ্টি। এই ছোট বয়সে তার কণ্ঠের জাদুতে মাতে গোটা এলাকা। অনেকেই বলে, বড় হলে তৃষা নামকরা কণ্ঠশিল্পী হবে।

‘ওরা কোথায়?’ তৃষাকে জিজ্ঞেস করল তিথি। জবাব না দিয়ে আগের মতোই গুনগুণিয়ে গান গেয়ে চলেছে তৃষা। শুধু আঙুল তুলে সামনের দিকে ইশারা করল। জয় ও তিথি সামনের দিকে চেয়ে যা দেখল, তাতে নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না….

এ এক অদ্ভুত দৃশ্য। পুকুরের অপর প্রান্তে একটি গাছে বসে আছে পিন্টু। কোথা থেকে লম্বা চুলের পরচুলা নিয়ে এসেছে। তা পড়ে কিম্ভুতকিমাকার দেখাচ্ছে তাকে। একদম চেনা যায় না। তারপরও তিথি আর জয়ের চিনতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হলো না। পিন্টুর বিখ্যাত গেঞ্জির কারণেই চিনেছে ওরা। অপর আরেকটি গাছে বসে আছে সীমান্ত। ডালপালায় ঘেরা গাছটিতে পাতার আড়ালে আছে বলে ভালমতো লক্ষ্য না করলে দেখা যায় না। কিছু একটা বলছে সে। এখান থেকে কি বলছে ভালো মতো শোনা না গেলেও এ পাড় থেকে গলার স্বর ঠিকই শুনতে পাচ্ছে ওরা।

গাছের গোঁড়ায় রহিম চাচাকে দেখা যাচ্ছে। কেমন যেন অদ্ভুত ভাবে কাঁপছে। কি হচ্ছে সেখানে বুঝতে না পারলেও ঠিকই আন্দাজ করতে পারছে তারা। রহিম চাচার ভুতের ভয় বেশ প্রবল। তিনি মনে করেন গ্রামের প্রতিটি গাছেই ভুত আছে। এবং তিনি সেইসব ভূতগুলো দেখতে পান। এ নিয়ে রং ছড়িয়ে গল্প বানান। তা কতটা সত্যি, কতটা মিথ্যে তা কেউ জানেনা। তবে রহিম চাচা ছাড়া আর কেউ কখনো ভূত দেখেনি।

পিন্টু পরচুলা পরে ভয় দেখাচ্ছে রহিম চাচাকে। আর সীমান্ত অদ্ভুত সব কণ্ঠ করে আরও বেশি ভীত পরিবেশ তৈরি করছে। বিভিন্ন গলার স্বর নকল করার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে সীমান্তর। জামালকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু ওরা জানে, আশেপাশেই কোথাও আছে জামাল। রহিম চাচার হাতে একটি মাটির হাড়ি দেখা যাচ্ছে। সেই হাড়ির লোভেই হয়ত এমন কাণ্ড করছে ওরা।
ভয়ের সীমা শেষ মাত্রায় পৌঁছেছে। আর থাকা যায় না। হাতের হাড়ি ফেলে দৌড় দিলেন রহিম চাচা। আড়াল থেকে বের হয়ে এলো জামাল। তুলে নিলো হাড়িটা। দুই গাছ থেকে লাফ দিয়ে নামলো পিন্টু ও সীমান্ত। পরচুলা খুলে ফেললো পিন্টু। বিজয়ীর বেশে হাড়িটা নিয়ে আসলো ওরা।

‘কি আছে হাড়িতে?’ জিজ্ঞেস করল তিথি। কিছু না বলে হাসিমুখে হাড়ি থেকে একটা মিষ্টি বের করে দেখালো সীমান্ত।

‘বাহ!’ খুশিতে বলল জয়। ‘সেই, সেই।’ মিষ্টি খুব পছন্দ তার। একটি বড়সড় মিষ্টি মুখে পুড়ে বলল, ‘এই জন্য তোদের একটা উপহার প্রাপ্য।’

‘কি উপহার?’ জিজ্ঞেস করল তৃষা।

‘আমার কাছে তো কিছু নাই,’ সহজভাবে বলল জয়। ‘থাকলে ঠিকই উপহার দিতাম।’ জয়ের কথায় হেসে দিলো সবাই। ঠিকই তো! জয় আর কি উপহার দিবে?

কিছু মুহূর্তের মধ্যে মিষ্টির হাড়ি খালি করে ফেলল ওরা। ‘আহ!’ তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলল জয়। ‘তাহলে দিনের প্রথম মিশন কমপ্লিট।’

‘সে না হয় হলো,’ বলল তিথি। তারপর পিন্টুকে জিজ্ঞেস করল, ‘কিন্তু তুই এই পরচুলা পেলি কোথা থেকে?’

একটা হাসির রেখা দেখা গেলো পিন্টুর মুখে। বলল, ‘আমার ছোট মামা আছ না, যিনি যাত্রায় অভিনয় করে। তোদের তো বলেছিলাম তার কথা? বলিনি?’ সম্মতির জন্য সবার মুখের দিকে একবার তাকালো সে। সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। পিন্টু বলে চলল, ‘সে বাড়িতে এসেছে বেড়াতে। সাথে কত কি! তার যাত্রার জিনিসপত্র নিয়ে এসেছে।’

‘তাই!’ চকচক করে উঠল সবার চোখ। ‘নিশ্চয়ই খেলার অনেক কিছু পাওয়া যাবে?’ জিজ্ঞেস করল তৃষা।

‘তা তো আছেই।’ বলল পিন্টু। ‘তোদের আজকে নিয়ে যাবো বাসায়। মামার সাথে পরিচয় করিয়ে দিবো।’

‘তার আগে তোর পরচুলা লুকিয়ে ফেল,’ মনে করিয়ে দিলো জামাল। ‘রহিম চাচা দেখলে কিন্তু খবর আছে।’

তাইতো! একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে করে পরচুলা নিয়ে এসেছিল পিন্টু। তৃষার কাছে রাখতে দিয়েছিল সেই ব্যাগ।

‘ব্যাগটা কই?’ তৃষাকে জিজ্ঞেস করল পিন্টু। পুকুরের পাড়ে একটা বড়সড় ইটের নিচে লুকিয়ে রেখেছিল ব্যাগটা। সেখান থেকে বের করে পিন্টুর হাতে দিলো তৃষা। খুব যত্নে পরচুলা ব্যাগের ভেতর লুকিয়ে সবাইকে নিয়ে পিন্টুর বাড়ির দিকে হাঁটা ধরল সবাই।

পথে এক দুইটা বাঁদরামি ছাড়া বেশি দুষ্টুমি করল না কেউই। যাত্রাপালার অভিনেতাকে দেখার উত্তেজনায় ফেটে পড়ছে সবাই।

বাঙালীয়ানা 

‘মামা, ভিতরে আছ?’ বাড়ির সামনে এসে ডাক দিলো পিন্টু।

‘কিরে, এত চিৎকার করছিস কেন?’ পিন্টুকে ধমক দিলো তার মা। বাইরে বেরিয়ে এলো সে। ‘ওমা, পুরো বাহিনী আছে দেখছি! ব্যাপার কি?’ সবাইকে দেখে চোখ উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল পিন্টুর মা।

‘কিছু না, মা।’ জবাব দিলো পিন্টু। ‘মামার সাথে দেখা করানোর জন্য নিয়ে এসেছি সবাইকে।’

‘কেমন আছ, চাচী।’ জিজ্ঞেস করল তিথি। তিথি খুব আন্তরিক। সবার সাথে হাসিখুশি মুখে কথা বলে। তাই সবাই তিথিকে আদর করে। পিন্টুর মা একটু বেশিই করে।

‘ভালো আছি মা।’ জবাব দিলো সে। তারপর পিন্টুর দিকে ফিরে বলল, ‘তোর মামার সাথে দেখা করতে তার দলের একজন সহকর্মী অভিনেতা বাড়িতে এসেছে। এখন একদম বিরক্ত করবি না।’

‘আরেকজন যাত্রার লোক!’ লাফ দিয়ে উঠল জয়।

‘জয়!’ ধমকের সুরে বলল পিন্টুর মা। ‘কোনো দুষ্টুমি না।’ বাধ্য ছেলের মতো জয় মাথা নাড়ল, কোনো দুষ্টুমি করবে না।

ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। এখনো পিন্টুর মামার দেখা নেই। ক্রমেই অধৈর্য হয়ে উঠছে ওরা। পিন্টুর মা বলে গেছে উঠানে খেলতে। কিন্তু তাদের খেলার মন কোথায়?

এমন সময় পিন্টুর মামা বেরিয়ে এলো। সাথে একজন লোক। লোক বলার চেয়ে মেয়েলোক বলেই মনে হলো ওদের। লম্বা লম্বা চুল। মেয়েদের মতন অঙ্গভঙ্গি। হাসি টাও মেয়েদের মতো।

চোখের ইশারায় কথা হয়ে গেলো ওদের। সবার মনে একই প্রশ্ন। কে জানে! যাত্রার মানুষগুলো হয়ত এমনই হয়।

লোকটা বিদায় নেওয়ার পর পিন্টুর মামার সাথে পরিচয় হলো সবার। সবার জন্য চকলেট নিয়ে এসেছেন উনি। পিন্টুর কাছে আগেই শুনেছে তার বন্ধুদের কথা। তাই আগেই চকলেট এনে রেখেছিলেন। অল্প কিছুক্ষণের পরিচয়ে মানুষটিকে ভালো লেগে গেলো ওদের। পিন্টুর মামা হয়ে উঠল নিজের মামার মতো। সেই সাথে যাত্রার অনেক কিছু নিয়ে আলোচনা হলো। তার যাত্রার অনেক কিছুর দেখা মিলল সবার। খুশিতে আর আনন্দে দিনটা ভালো কাটল সবার। মামাকে বিদায় জানিয়ে যে যার বাড়ি ফিরল। সন্ধ্যার মধ্যে না ফিরলে পিঠে উত্তম মধ্যম পড়তে পারে সে ভয়ে, যদিও কারোরই ফিরতে মন চাইছিলোনা।

বিশ্বকাপের বিশেষ গল্প ব্রাজেন্টিনা

চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে গেল তিথির। লাফ দিয়ে উঠল জয়। কিসের চিৎকার? চোখ ডলতে ডলতে বেরিয়ে এলো জামাল। বেরিয়ে এলো জয় আর তিথিও। জামালের পাশে যেয়ে দাঁড়ালো। তিনজনের বাড়ি পাশাপাশি হওয়ায় একসাথেই দেখা গেল ওদেরকে। বোধহয় গ্রামের সবাই বেরিয়ে এসেছে। কি হয়েছে বুঝা যাচ্ছে না। পিন্টু, তৃষাকে দেখা যাচ্ছে না।

কি হচ্ছে বোঝার চেষ্টা করছে সবাই। লোক মুখে শোনা গেলো, আমিন সাহেবের বাসায় নাকি চোর এসেছিল। সেই জন্যই এত হল্লা। আমিন সাহেব এই গ্রামের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। গ্রামের মেম্বারের খাস বন্ধু। তার বাড়িতে চুরি! কার ঘাড়ে কয়টা মাথা আছে?
এমন উত্তেজনার মাঝে কেটে গেছে রাত। বাচ্চারা ঘুমিয়ে গেছে। গ্রামের মানুষ জেগে আছে মুখরোচক গল্প বানানোর জন্য। অনেক রাত করে ঘুমোতে গেলো সবাই। রেখে গেলো একগাদা গল্পের সমাহার। রাতের অন্ধকারের নিস্তব্ধতার মতো করে পুনরায় নীরব হয়ে উঠলো রাতের গ্রামীণ জীবন।

গল্পটা বিজয়ের (পর্ব-১) 

সকাল হতেই দস্যিপনা শুরু তিথি, জয় আর তাদের বন্ধু দের। ছুটোছুটি, হুড়োহুড়িতে অতিষ্ঠ করে তুলল গ্রামের মানুষদের। তবে তাদের আলোচনার মুল কেন্দ্রবিন্দুতে রাতের চুরি। গ্রামের মানুষের কাছে ওরা শুনেছে, নতুন যাত্রাদল এসেছে বলেই চুরি শুরু হয়েছে। এই কাজ যাত্রাদলেরই। না হলে এমন শান্ত গ্রাম, যেখানে কোনদিন চুরি হয় নি সেখানে এমন ঘটনা ঘটে? এসব গল্পই এখন পুরো গ্রাম জুড়ে। সবচেয়ে মুখরোচক গল্প শোনা গেলো রহিম চাচার কাছ থেকে। কাল তার মিষ্টির হাড়ি চুরি হয়েছে, রাতে আমিন সাহেবের বাসায়!

‘আমি জানি,’ বলল রহিম চাচা। ‘কাজটা ওই শাঁকচুন্নির। যে আমার মিষ্টির হাড়ি নিয়েছে।’

শাঁকচুন্নি! কথাটা শুনে কান গরম হয়ে গেলো পিন্টুর। বাকিদের মুখে মুচকি হাসি দেখে বুঝতে পারল, এ নিয়ে ক্ষেপাতে ছাড়বে না বন্ধুরা।

‘কি মনে হয় তোদের?’ জিজ্ঞেস করল তৃষা। ‘চুরিটা যাত্রা দলের কাজ?’

‘আমার মামা চুরি করতে পারে না।’ জবাব দিলো পিন্টু।

‘তা আমরা জানি।’ এবার বলল জয়। ‘মামার মতো ভালো মানুষ চুরির মতো কাজ? অসম্ভব!’

‘আমার তো ওই লোকটার উপর সন্দেহ।’ বলল তিথি।

‘কোন লোকটা?’ এক সঙ্গে জিজ্ঞেস করল সবাই।

‘তোর মামার সাথে দেখা করতে এসেছিল যে।’ পিন্টুকে বলল তিথি। ‘কেমন মেয়ে মেয়ে দেখতে।’ ব্যঙ্গ করে, অভিনয় করে তিথি এমনভাবে কথাটা বলল, সবাই হো হো করে হাঁসতে লাগল।

‘এক কাজ করলে কেমন হয়?’ প্রস্তাব দিলো সীমান্ত। ‘আমরা আজকে যাত্রা দেখতে যাই। কিছু থাকলে ঠিকই বের করে ফেলব।’ সীমান্তর প্রস্তাবে রাজী হলো সবাই। যাত্রাও দেখা যাবে। কিছু থাকলে বের করাও যাবে। ওরা সব পারে। ওদের কাছে কঠিন বলে কোনো কাজ নেই।

যেই কথা সেই কাজ। সন্ধ্যা হতে না হতেই যাত্রা দেখার জন্য রেডি হলো সবাই। গ্রামের স্কুলের বিশাল মাঠটাতে বসেছে এবারের যাত্রার আসর। সবাই মিলে রওনা দিলো পিন্টুর বাসায়। কেননা, পিন্টুর মামা যাত্রা দেখতে সবাইকে নিয়ে যাবে। এমনই কথা হয়েছে। আর সে কারণে বাকিদের বাসা থেকে অমত করে নি। শুধু বলেছে, দুষ্টুমি না করতে। ওরাও বাধ্য সন্তানের মতো বলেছে শান্তভাবেই থাকবে।

 গল্পটা বিজয়ের (শেষ পর্ব)

স্কুলের মাঠে এসে ওরা দেখল, এ এক বিরাট অবস্থা। মাঠের এক প্রান্তে বড় মঞ্চ বানানো হয়েছে। প্যান্ডেল টানানো হয়েছে পুরো মাঠ জুড়ে। দর্শকদের বসার জন্য মাটিতে শতরঞ্জি পাতা। কোণায় কোণায় অবশ্য গ্রামের মুরুব্বিদের বসার জন্য বেশ কিছু চেয়ার দেখা যাচ্ছে। একটি ভালো জায়গা দেখে বসল তিথি, জয়, পিন্টু তৃষা, সীমান্ত আর জামাল। এখান থেকে ভালো মতো যাত্রা দেখা যাবে। তাদের কে বসিয়ে ব্যাক স্টেজে চলে গেল পিন্টুর মামা।

যাত্রা এখন শুরু হবে। সব আলো নিভে গেলো। শুরু হওয়ার পূর্ব প্রস্তুতি। এমন সময় স্টেজের পিছন থেকে বেশ শব্দ আসতে লাগলো। হঠাৎ করে কে যেন চিৎকার করে উঠল। গ্রামের সব মানুষ, যারা যাত্রা দেখার জন্য বসে ছিলো সবাই উঠে দাঁড়ালো। একে অপরের মুখের দিকে তাকালো তিথি, জয় আর বাকি বন্ধুরা।

ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেলো সামনে। ছোট হওয়ার এই এক সুবিধা। ফাঁকফোকর গলে এদিক সেদিক সামনে পেছনে চাইলেই চলে যাওয়া যায়। সামনে এসে ওরা দেখলো একজন ব্যাক-স্টেজ থেকে দৌড়ে বের হচ্ছে, যেন পালিয়ে যাচ্ছে। তার পিছনে ছুটছে পিন্টুর মামা। তার পিছনে কালকে পিন্টুর মামার সাথে দেখা করতে আসা সেই লোকটা। নাহ আজ তাকে মেয়ের মতো লাগছে না, পুরো মেয়েই লাগছে।

এমন সময় পিন্টুর মামা তাদের দিকে তাকিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছে। কিছু বুঝতে পারছে না ওরা, কি বলছে সে। শুধু একটা শব্দই বুঝতে পারল। চোর! এরপর কি করতে হবে তাদের বলা লাগলো না। ভিড়ের মধ্যে ফাঁক গলে বের হলো তারা। তিথির হাতে একটি ছোট থলে। ফ্রকের ভিতর থেকে বের করে হাতে নিলো। কি আছে এতে? জয় ভাবলো একবার জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু এই অবস্থায় জিজ্ঞেস করার উপায়ও নেই।

ছোট হলেও অসম্ভব জোরে দৌড়াতে পারে ওরা। মেয়ে হয়েও স্কুলে একই ক্লাসের ছেলেদের সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিল তিথি। জয়ও তার সাথে পারে না। তাছাড়া গ্রামের আনাচে কানাচে সমস্ত কিছু তাদের চেনা। এপার ওপার করে সেই চোরের আগেই গ্রামের মেইন রাস্তায় চলে এলো তিথি। চোরকে দূর থেকে আসতে দেখা যাচ্ছে। ঘুর পথে এসেছে বলে তিথিদের আগে আসতে পারে নি। একে একে জয়, সীমান্ত, জামাল, পিন্টু এসে দাঁড়ালো তিথির পাশে। তৃষার আসতে বেশ সময় লাগলো। এসেই হাঁপাতে লাগলো সে। অন্যদের মতো দৌড়াদৌড়িতে সে একটু অনভিজ্ঞ।

চোরকে আসতে দেখে ব্যাগের ভেতর হাতড়ে কি একটা বের করল তিথি এবং তা ছিটিয়ে দিলো রাস্তায়। কয়েক মুহূর্ত পর ঘটল এক বিচিত্র ঘটনা। সেই পথে ছুটতে গিয়ে হুড়মুড় করে পড়ল সেই চোরটা। তার পড়ে যাওয়ার দৃশ্যটা ছিল দেখার মতো! চোরটা জানতো না তিথি যে পথে মার্বেল ছড়িয়ে রেখেছিলো। সেই লোকটার পরতে দেরি, কিন্তু দস্যু ছেলেপিলেদের অপারেশন করতে দেরি হয় না।

তার পড়ে যাওয়ার সাথে সাথে তার উপর ছুটে গেলো সবাই। দুই পা শক্ত করে ধরল জামাল আর সীমান্ত। দুই হাত ধরল জয় ও পিন্টু। আর তিথি ও তৃষা? লাফ দিয়ে পিঠে উঠে বসে পড়েছে। লোকটা চেষ্টা করছে ছয়জন বাচ্চার কাছ থেকে ছুটতে, কিন্তু উপুড় হয়ে পড়ার কারণে সুবিধা করতে পারছে না।

পিন্টুর মামার আসতে বেশি সময় লাগলো না। তার পাশে এসে দাঁড়ালো মামার সাথে দেখা করা সেই লোক কিংবা বড় চুলের সেই মহিলা। এখন তাকে পুরোপুরি মহিলার মতোই লাগছে। দুইজন মিলে তুলে দাঁড় করালো চোরটাকে। তাদের পুরো গ্রামের লোকজন এসে দাঁড়ালো সেখানে। যাত্রার লোকজনও এসে দাঁড়িয়েছে। কেউ বুঝতে পারছে না আসলে কি ঘটছে।

পিন্টুর মামা জানালো, সে কোনো যাত্রার অভিনেতা নয়। সে দেশের পুলিশ বিভাগের স্পেশাল ব্রাঞ্চে কাজ করে। ছয় মাস আগে এক চুরির কেসে একজনকে খুজছিলো সে। সেই চোরকে চিহ্নিত করা গেলেও প্রমাণের অভাবে ধরা যাচ্ছিল না। ধরা পড়ে যেতে পারে বুঝতে পেরে দুই মাস আগে এই যাত্রা দলের সাথে যুক্ত হয় লোকটা। সাথে সাথে যাত্রার দলে যোগ দেয় পিন্টুর মামাও। ভার্সিটি জীবনে থিয়েটারে অভিনয় করার কারণে কোনো অসুবিধা হয়নি তার। কিছু দিন আগে পিন্টুর মামাকে সাহায্য করার জন্য যুক্ত হয় আইরিন। সে আসলে ছেলে নয়। ছদ্মবেশে পারদর্শী মেয়েটা ছেলে সেজে যাত্রার দলের সাথে মিশে যায়।

‘কাল চুরির ঘটনার পর আমরা অনেক খুঁজে চোরাইমাল খুঁজে পাই ওর টেন্টে।’ বলল আইরিন।

‘না জেনে আমরা এত দিন একজন চোরকে জায়গা দিয়েছিলাম?’ বলল যাত্রার মালিক।

‘এখানে আপনার কোনো দোষ নেই,’ বলল পিন্টুর মামা। ‘আমি তো এতদিন ছিলাম আপনাদের সাথে।’ তারপর বাচ্চাদের দিকে ফিরে বলল, ‘পুরো ক্রেডিট ওদের। ওরা না থাকলে এত সহজে ধরতে পারতাম না।’

‘ওরা সারাক্ষণ গ্রামের মানুষকে অতিষ্ঠ করে রাখলেও মাঝে মাঝে ভালো কাজ করে।’ ভিড়ের মধ্য থেকে বলে উঠল কিছু মানুষ।

নিজেদের এখন কেউকেটা মনে হচ্ছে ওদের। গ্রামে ওদের ভাবই আলাদা। চোর ধরে দস্যু ছেলের দল থেকে রাতারাতি হিরো বনে গিয়েছে।

জয়ের কানে কানে তিথি বলল, ‘আমার মার্বেলগুলো নিয়ে তোদের অনেক আপত্তি ছিল। দেখলি তো! সবসময় সাথে রাখার সুফল।’ বলেই অট্টহাসি হাসতে শুরু করল তিথি। তার হাসির শব্দে চমকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো জয়। তাতে তিথির হাসির শব্দ বেড়ে গেলো দ্বিগুন…….

পেপার’স লাইফ/গল্প/সাকিব আহমেদ