সাকিব আহমেদের গল্প “বাঙালীয়ানা”


bdnews24 bangla newspaper, bangladesh news 24, bangla newspaper prothom alo, bd news live, indian bangla newspaper, bd news live today, bbc bangla news, bangla breaking news 24, prosenjit bangla movie, jeeter bangla movie, songsar bangla movie, bengali full movie, bengali movies 2019, messi vs ronaldo, lionel messi stats, messi goals, messi net worth, messi height

‘সাকিব।’ মনে হলো কেউ যেন ডাকছে। রাস্তাটা অন্ধকার। কালো আঁধারে ছেয়ে আছে চারদিক। কোথাও আলোর ছিটেফোঁটাও নেই। অবাক লাগল দেখে। কোনোদিন তো এত অন্ধকার থাকে না! আজ তাহলে কেন? একটু ভয় ভয় করছে। এদিক ওদিক তাকালাম। কাউকে দেখা যাচ্ছে না। হাতের শপিং ব্যাগটা শক্ত করে ধরলাম।

কাল পহেলা বৈশাখ। বন্ধুরা মিলে ঘুরতে যাবো প্ল্যান করেছি। তাই, একটি সুন্দর পাঞ্জাবী কিনলাম। বছরের প্রথম দিন, নতুন জামা না পড়লে কি হয়?

আশেপাশে কাউকে না দেখে ভয়টা জাকিয়ে বসল। কে ডাকল তাহলে? কেউ তো নেই? বোধহয় মনের ভুল।

‘সাকিব।’ আবার ডাকটা শুনলাম। না, ভুল তো নয়। কেউ সত্যিই ডাকছে। কিন্তু কাউকে তো দেখতে পাচ্ছি না। ওই যে, দূরে কাউকে দেখা যাচ্ছে মনে হলো। আলো ভেদ করে কেউ এগিয়ে আসছে আমার দিকে। তার শরীর থেকে আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে। যেন এক দ্যুতিতে সবকিছু আলোকিত হয়ে গেছে। রাস্তা এখন আর আগের মত অন্ধকার নয়। এক পা, দু পা করে এগিয়ে আসছে আগন্তুক। এসে আমার সামনে দাঁড়ালো। ভয়ে শরীর ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।

‘কে আপনি?’ – আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘আমি বাঙালী’ – আগন্তুক জবাব দিল।

বাঙালী! বুঝতে পারলাম না। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম তার দিকে। চোখ জোড়া যেন ঠিকরে বেরিয়ে যেতে চাইছে।

আমাকে কিছু বোঝার সুযোগ না দিয়েই সে জিজ্ঞেস করল, ‘বাসায় যাচ্ছ?’

উপর-নিচ মাথা নাড়িয়ে হ্যা জবাব দিলাম। ঠিক যেন সম্মোহনের মত।

‘কোথা থেকে এসেছ?’ – আগন্তুক জিজ্ঞেস করল।

‘একটু শপিংয়ে গিয়েছিলাম।’ আমি জবাব দিলাম।

‘পাঞ্জাবি কিনতে?’

‘জ্বি,’ অবাক লাগল, উনি জানলেন কিভাবে? প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করলেও চুপ রইলাম।মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোচ্ছে না।

‘তা, বেশ বেশ। কালকের জন্য তো খুব ভালো পরিকল্পনা করেছ!’

‘জ্বি,’ আমি উত্তর দিলাম। তার স্বাভাবিক কথাবার্তায় ভয়টা ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে। ‘কাল পহেলা বৈশাখ তো, বন্ধুরা মিলে ঘুরতে যাব।’

‘ভাল ভাল। একদিনের জন্য বেশ তো বাঙালি হওয়া যায়! কি বলো?’

‘মানে? ঠিক বুঝলাম না।’

‘কাল তো সারারাত জেগেছিলে। সিনেমা দেখেছিলে, তাই না?’

‘আপনি জানলেন কি করে?’

‘আমি জানি, আমাকে জানতে হয়।’

‘কিভাবে জানেন?’

আমার কথার জবাব না দিয়ে বলল, ‘খুব জম্পেশ করে ইংরেজি সিনেমা দেখে মজা নিয়েছ। আচ্ছা, শেষ কবে বাংলা সিনেমা দেখেছ মনে আছে?’

স্মৃতির পাতায় হাতড়ে খুঁজেতে লাগলাম। সত্যি তো! শেষ কোন বাংলা সিনেমা দেখেছিলাম মনে পড়ছে না।

‘তোমার মোবাইলটা বের করো।’ বলল সে। তার কথা মত আমার দামি ফোনটা বের করলাম। ‘কয়টা বাংলা গান আছে?’ জিজ্ঞেস করলেন তিনি।

আমি খুঁজছি। আমার ফোনে গান আছে অনেক। কিন্তু বাংলা? অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালাম।

‘ইংরেজি ও হিন্দির ভীড়ে খুঁজে পাচ্ছ না তো?’ হাসি মুখে সে বলল। ‘কাল পান্তা ভাত খাবে, ইলিশ মাছ দিয়ে। এর আগে শেষ কবে পান্তা খেয়েছ?’

আমি মাথা নিচু করে রইলাম। ‘বিভিন্ন ইংরেজি রেস্তোরাঁয় গিয়ে ভাল-মন্দ অনেক কিছুই আহার করো।’

আগন্তুক বলে চলল। ‘বাঙালি রেস্তোরাঁগুলোতে শেষ কবে পা পড়েছে?’

জবাব দিতে পারলাম না। মাথা নিচু করে চুপ করে আছি। ‘বাবা, আমি জানি তোমরা এই দেশকে ভালবাস। এই ভালবাসা যেন একদিনের না হয়। আমরা বাঙালি, আমরা সারাজীবন বাঙালি। কিন্তু বিদেশি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে, বিদেশি চালচলনে তোমাদের বছর পার হয়। একদিনের জন্য বাঙালি সেজে কি লাভ বলো? বাঙালি হতে হয় হৃদয় দিয়ে, আচার আচরণ দিয়ে।’

তার কথাগুলো মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলাম। সত্যি তো! আমরা বাঙালি হিসেবে কি করতে পারছি? যেখানে বিদেশী সংস্কৃতিই আপন হয়ে ওঠে, আমাদের বাঙালীয়ানা সেখানে ব্যর্থ। তার কথার জবাব দিতে মুখ তুলে চাইলাম। কিন্তু কোথায় তিনি? একেবারে উবে গেছেন। তার চিহ্নটুকু চোখে পড়ছে না।

হঠাৎ-ই ধরমড়িয়ে উঠে বসলাম। সমস্ত শরীর ঘামে ভিজে আছে। পাশের রেডিয়াম দেওয়া ঘড়ি বলছে রাত তিনটে বাজে। এতক্ষণ যা ছিল, পুরোটাই স্বপ্ন। বিছানা থেকে নামলাম। কাল যেই পাঞ্জাবিটা কিনেছিলাম, প্যাকেটসহ পড়ে আছে আমার টেবিলে। একবার ছুঁয়ে দেখলাম প্যাকেটটি। নিজের ফোনটা হাতে নিলাম। ম্যাসেজ অপশনে গিয়ে টাইপ করলাম

‘আমি কালকে যেতে পারব না। আমার একটা কাজ আছে। তোরাই ঘুরে আছিস। দিনটা ইনজয় কর।’

মেসেজটা সব বন্ধুদের পাঠিয়ে দিলাম। ফোনটা বিছানায় আমার বালিশের পাশে রাখলাম। শুয়ে শুয়ে চিন্তা করছি – যেদিন পুরোপুরি বাঙালীয়ানা ধারণ করতে পারব, সেদিনই নাহয় বৈশাখ পালন করব!

লেখক : সাকিব আহমেদ