বাইশ গজের পিকাসো লিটন কুমার দাস


Liton Das #paperslife

`আমার গড় যা বলে, এতটাও খারাপ ব্যাটসম্যান আমি নই।’

লিটনের কন্ঠে আক্ষেপ ছিল, ছিল অভিমান। বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে এভাবেই নিজের অবস্থান ব্যক্ত করেছিলেন লিটন কুমার দাস। বলেছিলেন, দলের প্রয়োজনে যে কোনো পজিশনে ব্যাট করতে প্রস্তুত তিনি।

লিটনকে বলা হয়, বাংলাদেশের সবচেয়ে টেকনিক্যালি সলিড একজন ব্যাটসম্যান। তার প্রমাণ সে যে খুব একটা রাখতে পেরেছিলেন, তা অবশ্য নয়।

অন্যরা যেখানে গ্ল্যামার বা এসেই বিধ্বংসী কিছু করে দলে জায়গা করে নেয়, লিটন তেমন ছিলেন না মোটেও। ঘরোয়া ক্রিকেটে রানের ফুলঝুরি ছোটানো লিটন লাল-সবুজের জার্সিতে ছিলেন সাদামাটা।

মাঝে মাঝে রানের দেখা পেলেও, অধিকাংশ সময়েই নিজেকে হারিয়ে খুঁজছিলেন। এমন জায়গা থেকে পরিত্রাণের প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজন ছিল নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করার।

আর সব কিছুর জবাব দেওয়ার জন্য তিনি বেছে নিয়েছেন বিশ্বকাপের মঞ্চকেই।

প্রথম তিন ম্যাচে সুযোগ পাননি। চতুর্থ ম্যাচে খেলার কথা থাকলেও বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ায় আর মাঠে নামা হয়নি। অবশেষে পঞ্চম ম্যাচে পেয়েছেন সুযোগ। আর সুযোগ পেয়েই হয়েছেন নায়ক, দেখিয়েছেন ব্যাট হাতে কি করতে পারেন!

মোহাম্মদ মিথুনের পরিবর্তে এদিন মাঠে নেমেছেন লিটন কুমার দাস। স্কোরবোর্ডে ৩২১ এই বিশাল রান। এত বড় রান তাড়া করার চাপ, সাথে কিছুতেই পড়তে দেওয়া যাবে না প্রয়োজনীয় রান রেট। এগুলো মাথায় নিয়ে লিটন যেভাবে খেললেন, নিজেকে নিয়ে লিটন গর্বই করতে পারেন।

মুশফিকুর রহিম আউট হয়েছেন ১ রানে। এর আগে ৪৮ রান করা তামিম ইকবাল আউট। ১৩৩ রানে যখন ৩ উইকেট নেই, লিটন সাকিবের সাথে জুটি বাঁধতে মাঠে নামেন।

এই সাকিব বড্ড অচেনা। এই অচেনা সাকিবের প্রতিটি পদক্ষেপে মুগ্ধতা। ব্যাট হাতে নবাবের মতোই যেন খোলা তরবারির ন্যায় কচুকাটা করেন প্রতিপক্ষকে। সেই সাকিবের সাথেই এগিয়ে যেতে হবে অনেকখানি দূরে।

নিজের সহজাত পজিশন ওপেনিং হলেও তামিম-সৌম্যকে বাদ দিয়ে লিটনকে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। তাই টপ অর্ডারে জায়গা হয় না। মিথুনের অফ ফর্ম সুযোগ করে দিয়েছে পাঁচ নম্বরে ব্যাট করার।

আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে খেলেছেন ৬৯ বলে ৯৪ রানের একটি ঝকঝকে ইনিংস। যেখানে প্রতিটি শটে মুগ্ধতা, বিস্ময়। ইয়ান বিশপ তো বলেই ফেলেছেন, টন্টনের বাইশ গজে মোনালিসা আঁকছেন লিটন।

কি সুন্দর! কি দুর্দান্ত! হার না মানা, নিজের প্রতি আক্ষেপ, নিজেকে প্রমাণ করার তাড়ন – সব মিলিয়ে লিটন ছিলেন আত্মবিশ্বাসী। আজ যে পারতেই হবে!

লিটন পেরেছেন, জিতেছেন বিজয়ীর বেশে। শ্যানন গ্যাব্রিয়েল কিংবা জেসন হোল্ডার, ওশান থমাস অথবা কটরেল, কেউই পাত্তা পায়নি লিটনের কাছে।

৩৮ তম ওভারে যেন অন্য লিটন। গ্যাব্রিয়ালের বলে প্রথম তিন বলে তিনটি শট, বল আছড়ে পড়েছে সীমানার ওপারে। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম ছক্কার হ্যাটট্রিক।

এখানেই শেষ নয়। একের পর এক অসাধারণ ক্রিকেটীয় শট খেলে ম্যাচ শেষ করে এসেছেন।

মুশফিকের আউটের পর যখন শঙ্কা, ভয় কাজ করছিলো ঠিক তখনই ক্রিজে এসেছেন লিটন। সাকিবকে সঙ্গ দিতে হবে। প্রথম ২৮ বল থেকে ২৩ রান নিয়ে ধীরস্থির শুরু, সাময়িক অস্বস্তি কাটিয়ে নেওয়ার দায়িত্বটি সুচারুভাবে পালন করেছিলেন।

Liton Das and Shakib #paperslife

একটু একটু করে বেরিয়ে এসেছে খোলস ছেড়ে। ক্যারিয়ারের তৃতীয় ফিফটি করেছেন ৪৩ বলে।

এরপর আর পেছন ফিরে তাকাননি লিটন। ফিফটি করার পর রান তোলার গতি বাড়িয়েছেন, বাউন্ডারি-ওভার বাউন্ডারিতে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বাংলাদেশের রানের গতি।

শেষতক ৬৯ বলে ৯৪ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে একদিনের ক্রিকেটে বাংলাদেশের তাড়া করার রেকর্ডের সাক্ষী হয়েই মাঠ ছেড়েছেন।

চতুর্থ উইকেটে সাকিবের সাথে ১৮৯ রানের বিশাল জুটি গড়েছেন। উড়ন্ত ফর্মে থাকা সাকিবের মতো ব্যাটসম্যানের সাথে পাল্লা দিয়ে রান তুলেছেন, বরং সাকিবের চেয়েও দ্রুত গতিতে।

ম্যাচ শেষে ছয় রানের আক্ষেপ থাকতে পারে। তবে লিটন কি আক্ষেপ করছেন? এমন জয়ের পর হয়ত তিনি আক্ষেপ করবেন না। মনে মনে বলছেন, এই ছয় রান তোলা থাক। আরেকদিন হবেই হবে।