যার কারণে ব্রিটেনে শিক্ষার্থীদের পিটুনি দেন না শিক্ষক



১৯৭০ সালের কথা। ইউরোপের স্কুলগুলিতে অবৈধ থাকলেও ইংল্যান্ড, ওয়েলস ও স্কটল্যান্ডের স্কুলগুলিতে শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তিদান করা বৈধ ছিল।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের মতোই ব্রিটিশ অভিভাবক এবং শিক্ষকই মনে করতেন যে ছেলেমেয়েকে ‘মানুষ’ করতে হলে শারীরিক শাস্তির প্রয়োজন রয়েছে। আর স্কুলের নিয়মকানুন ঠিক রাখতেও এর প্রয়োজন আছে।

যদিও অনেকেই স্কুল পড়ুয়া কোমলমতি শিশুদের মারধরের ঘোর বিরোধী ছিলেন।

হাজার হাজার শিক্ষার্থী যারা স্কুল থেকে পাশ করে বেরিয়েছেন, তাদের প্রায় সবার গায়েই ছিল বেত্রাঘাতের চিহ্ন।

ঘটনাটি স্কটল্যান্ডের। স্কটল্যান্ডে শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তিদানের কাজটি করা হতো ‘টওজ’ নামের চামড়ার বেল্ট দিয়ে।

এই বেল্টের প্রান্তটি দুই বা তিন ভাগে বিভক্ত থাকতো। ফলে এই বেল্ট যখন শিক্ষার্থীদের দেহে আঘাত করতো তখন সেটা চামড়ায় বসে যেত, কিন্তু চামড়া কেটে যেত না।

১৯৮০’র দশকের এক জরিপে জানা যায়, প্রতি তিন জন ছাত্রের মধ্যে একজন এবং প্রতি ১২ জন ছাত্রীর মধ্যে একজন স্কুলে পিটুনির শিকার হয়েছে এবং জনপ্রতি গড়ে ১৪ দিন ধরে তারা শিক্ষকের মার সহ্য করেছে।

স্কটল্যান্ডের দুই ছাত্রের মা আদালতে এই বিষয়ে মামলা দায়ের করেছিলেন। এই দুই ছাত্রের একজন হলেন অ্যান্ড্রু ক্যাম্বেল।

অ্যান্ড্রু ক্যাম্বেল বলছেন, ‘টওজ’ ছিল ভয়াবহ এক শাস্তিদানের অস্ত্র। তার বর্ণনায়, ‘এই বেল্ট যখন হাতের ওপর আছড়ে পড়তো তখন সেটা বিকট আওয়াজ করতো। হাতের ওপর এটা এমন জ্বালা ধরিয়ে দিতো, যা সহ্য করা কঠিন।’

স্মৃতিচারণ করে তিনি বলছিলেন, ‘একবার আমরা ক্লাসে বসে আছি। হঠাৎ করেই ক্লাসের সবাই একেবারে নীরব হয়ে গেল। শুনতে পেলাম পাশের ক্লাসের শিক্ষক কোন এক ছাত্রকে খুব বকাঝকা করছিলেন। একটু পরে শোনা গেল সপাৎ সপাৎ আওয়াজ। ভয়ে আমরা পাথর হয়ে গেলাম।’

পরে বাড়িতে ফিরে তিনি ঘটনাটি তার মা-বাবাকে জানিয়েছিলেন। অ্যান্ড্রু ক্যাম্বেলের বাবা ছিলেন একজন ডাক্তার এবং মা সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করতেন। দু’জনেই স্কুলে শারীরিক শাস্তির ঘোর বিরোধী।

তাদের মতে, যে মুহূর্তে একজন শিক্ষক তার ছাত্র বা ছাত্রীকে পিটুনি দেয়ার জন্য হাতে বেত তুলে নেন, সেই মুহূর্তে তিনি নিজে শিক্ষক হিসেবে পরাজিত হন।

অ্যান্ড্রুর বড় ভাই গর্ডনকে যখন ভিন্ন স্কুলে ভর্তি করার চিন্তাভাবনা শুরু হলো, তখন তার বাবা-মা স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করলেন এবং তাদের ছেলেকে কোনভাবেই মারধর করা হবে না, এই মর্মে লিখিত নিশ্চয়তা দাবি করলেন।

এ বিষয়ে অ্যান্ড্রু ক্যাম্বেল জানান, আইনগত বিধানের কথা বাদ দিলেও শিক্ষা কর্তৃপক্ষ নীতিগতভাবেই এধরনের কোন লিখিত মুচলেকা দিতে রাজি হয়নি।

গ্রেস ক্যাম্বেল

তিনি বলেন, ‘আমার মা-বাবা এরপর এ নিয়ে তদবির শুরু করলেন। তারা স্থানীয় কাউন্সিল, স্থানীয় এমপি সবার কাছে দেন-দরবার শুরু করেন।’

ব্রিটেনের আইন ব্যবস্থায় এর কোন সুরাহা হবে না বুঝতে পেরে উকিলের পরামর্শ তারা ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

এরপর ১৯৭৬ সালে গ্রেস ক্যাম্বেল, অ্যান্ড্রু ক্যাম্বেলের মা, এবং আরেকজন স্কটিশ ছাত্রের মা জেন কোস্যান্স ঐ আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন।

অ্যান্ড্রু ক্যাম্বেল জানান, এই মামলা চলার সময় তার মা-বাবাকে কখনও কখনও বেশ উদ্বিগ্ন ছিলেন। এই মামলা চলার সময় নানা ধরনের হেনস্তার শিকার হতে হয় পরিবারের সবাইকে।

আমাদের বাড়িতে দেয়ালে লেখা হয় ‘এই বাড়িতে বেল্ট বিরোধীরা থাকে’। একবার ঢিল মেরে বাড়ির জানালার কাঁচ ভেঙে দেয়া হয়।

‘আমরা বাইরে বেরুলে প্রায়ই মানুষের গালাগালি শুনতে হতো। আমাকে এবং আমার ভাইয়ের ওপর থুথু ছোঁড়া হতো।’

তিনি বলছেন, তার মা-বাবা সবসময় বলতেন তারা যেন কখনও দুষ্টুমি না করেন। কারণ তাহলে তাদের দেখিয়ে লোকে বলবে, ‘এদের দেখুন, বাচ্চাদের শাস্তি না দিলে তার ফল কী হয়’।

ইউরোপের মানবাধিকার আদালত ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঐতিহাসিক রায় দেয়। এই রায়ে ব্রিটেনের সব সরকারি স্কুলে শিক্ষার্থীদের মারধোর নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

রায়ে বলা হয়, পিতামাতার সায় ছাড়া কোন শিশুকে প্রহার করা মানবাধিকার সনদের লঙ্ঘন।
যদিও রায়ের পর স্কটল্যান্ডের সব স্কুল থেকে শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ করতে আরও আট বছর লেগে যায়।

সেই দিনের স্মৃতিচারণ করে অ্যান্ড্রু ক্যাম্বেল বলেন,‘আমি ড্রইংরুমে বসে টিভি দেখছিলাম। হঠাৎ নিউজে দেখলাম আমার মা কথা বলছেন। মামলায় জয়ের জন্য খুবই গর্বিত দেখাচ্ছিল আমার মাকে।’