শিক্ষাখাতে সংস্কারে কড়া বার্তা নতুন শিক্ষামন্ত্রীর


শিক্ষাখাতে সংস্কারে কড়া বার্তা নতুন শিক্ষামন্ত্রীর

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন ও গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবার হার্ডলাইনে যাওয়ার ইঙ্গিত দিলেন নতুন শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, গতানুগতিক পরিবর্তন নয়, বরং শিক্ষাখাতকে স্থিতিশীল করতে এখন নিতে হবে ‘বড় বড় জাম্প’ বা দীর্ঘমেয়াদী উল্লম্ফন।

সংস্কারের সংকল্প: অতীত থেকে শিক্ষা

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নিজের মেয়াদের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন এহছানুল হক মিলন। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাধারণ কোনো সংস্কার যথেষ্ট নয়। মন্ত্রীর মতে, বিশ্বায়নের এই যুগে তাল মিলিয়ে চলতে হলে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ শিক্ষার মান বজায় রাখতে হলে উদ্ভাবনী ও সাহসী পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই।

তিনি ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলের উদাহরণ টেনে আনেন। সে সময় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নকল প্রতিরোধে তার কঠোর ভূমিকা দেশজুড়ে আলোচিত হয়েছিল। সেই স্মৃতিরোমন্থন করে মিলন বলেন, “২০০১ সালে আমরা যখন ক্ষমতায় এসেছিলাম, তখন পরীক্ষার হলগুলোতে গণনকলের যে সংস্কৃতি ছিল, তা শক্ত হাতে রোধ করা হয়েছিল। প্রশ্নপত্র ফাঁসও প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।”

প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নকলমুক্ত পরীক্ষার প্রতিশ্রুতি

বর্তমান সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ক্ষত হলো প্রশ্নপত্র ফাঁস। এ নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে। নতুন শিক্ষামন্ত্রী এই ব্যাধি নির্মূলে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, আগের সেই অন্ধকার দিনগুলো আর ফিরে আসবে না। তার ভাষ্যমতে, “সেগুলো তো চলেই গেছে। সেগুলোর আর পুনরাবৃত্তি হবে বলে আমি বিশ্বাস করি না।”

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যকার সমন্বয়হীনতা দূর করে একটি সমন্বিত শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলাই এখন তার প্রধান চ্যালেঞ্জ। তিনি মনে করেন, প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলেই মেধার সঠিক মূল্যায়ন সম্ভব হবে।

আগামীর চ্যালেঞ্জ ও বিশ্লেষণ

বিশ্লেষকরা বলছেন, এহছানুল হক মিলনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকানো। ২০০১ সালের প্রেক্ষাপট আর ২০২৬ সালের বাস্তবতা এক নয়। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও ইন্টারনেটের যুগে পরীক্ষার হলে নকল ধরা বা প্রশ্নফাঁস ঠেকানো অনেক বেশি জটিল। তবে মন্ত্রীর ‘বড় জাম্প’ দেওয়ার মানসিকতা যদি সঠিক নীতিমালার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, তবে দেশের শিক্ষাখাতে নতুন গতির সঞ্চার হতে পারে।

বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং প্রাথমিক শিক্ষার বুনিয়াদ শক্ত করার ওপর জোর দেওয়ার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময়ও তিনি কর্মকর্তাদের নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

শিক্ষাখাতকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রেখে একটি মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনে নতুন মন্ত্রীর এই প্রত্যয় কতটা সফল হবে, তা সময় বলবে। তবে তার বক্তব্যে এটা স্পষ্ট যে, তিনি কেবল প্রশাসনিক রুটিন কাজ করতে আসেননি; বরং তিনি চান একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন। যদি সত্যিই ‘বড় জাম্প’ দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার জট খোলা সম্ভব হয়, তবে তা হবে বর্তমান প্রজন্মের জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ। দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থী এখন তাকিয়ে আছে নতুন এই নেতৃত্বের গৃহীত পদক্ষেপের দিকে।

মন্ত্রীর বক্তব্যের মূল বিষয়গুলো:

  • বড় পরিবর্তন: শিক্ষাখাতে ছোটখাটো সংস্কারের বদলে বড় ধরণের কাঠামোগত পরিবর্তনের (জাম্প) পরিকল্পনা।

  • অতীত অভিজ্ঞতা: ২০০১ সালের সফল নকল বিরোধী অভিযানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ইচ্ছা।

  • প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ: ডিজিটাল নিরাপত্তা ও কঠোর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে প্রশ্নফাঁসের চিরস্থায়ী অবসান।

  • স্থিতিশীলতা: রাজনৈতিক অস্থিরতামুক্ত একটি শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা।