শুভ জন্মদিন শহীদ জুয়েল



“হাতের তিনটা আঙ্গুল রাইখেন স্যার। ন্যাশনাল টিমের হয়ে ওপেন করতে নামমু” – রমনা থানার বদ্ধ সেলে যখন জুয়েলের আঙ্গুল প্লেয়ার্স দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তুলে নিচ্ছিলো পাকিস্তানের বর্বর হানাদাররা, ঠিক তখন এভাবেই স্বাধীন বাংলাদেশের হয়ে ব্যাট হাতে বাইশ গজের ওই পিচ শাসন করতে চেয়েছিল ছেলেটা।

তার কাছে ক্রিকেটই ছিল ধ্যান জ্ঞান। নিজের জীবনের মতোই ভালবাসতেন ক্রিকেট নামের আভিজাত্য এই খেলাটিকে। পরিচিত ছিলেন আগ্রাসী কিপার ব্যাটসম্যান হিসেবে। মানুষটির নাম শহীদ জুয়েল। বাইশ গজের ওই পিচে বল তার কাছে শুধুই একটি পিটানোরই বস্তু ছিলো, করাচীর লীগের এক ম্যাচে একদিন ওর তুমুল মার দেখতে দেখতে এক পাঞ্জাবী কোচ সবিস্ময়ে বলে উঠলো, এই ছেলে এইখানে কেন? ওর তো ন্যাশনাল টিমের হয়ে ওপেনিং করার কথা, মানুষটি ছিলেন জেনুইন স্লগার।

পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যে এ মেধার দাম কোথায়? যে সূর্য উদিত হতে চেয়েছিল ক্রিকেটের সবুজ গালিচায়, সে সূর্য নিভে গেছে অচিরেই।

২৫ শে মার্চ জীবন বদলে যায় গোটা বাঙ্গালী জাতির, গোটা বাংলাদেশের। এর ঠিক দুই দিন পর ২৭ শে মার্চ, নিজের বড়ভাই সমতুল্য মুশতাক ভাইকে পরে থাকতে দেখলেন জেলা ক্রীড়া ভবনের সামনে। সদা হাস্যোজ্জ্বল ব্যাট হাতে স্বাধীন বাংলার হয়ে মাঠে নামার স্বপ্নে বিভোর তার প্রিয় মুসতাক ভাই পরে ছিলেন, নিথর, মুখ থুবরে। সেদিন এক বীরের জন্ম নিয়েছিল বাংলার মাটিতে। বোলারদের শাসন করা সেই হাত ব্যাট ছেড়ে তুলে নিয়েছিল স্টেনগান।

ঘর ছাড়তে পারছিলেন না মায়ের তীব্র ভালোবাসার অবহে। সেই স্নেহের বাধন ছিড়লেন ৩১ মে। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে যাওয়ার ক’দিন আগে মাকে নিজের বাধাই করা একটা ছবি দিয়ে বলেছিলেন. ‘আমি যখন থাকবো না, এই ছবিতেই আমাকে পাবে’।

মেলাঘরে খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন দুই নম্বর সেক্টরে ট্রেনিং নেন জুয়েল। ট্রেনিং শেষে ঢাকা কাঁপিয়ে ফেলা গেরিলা দল ‘ক্র্যাক প্লাটুন’-এর একজন হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। ফার্মগেট, এলিফ্যান্ট রোডের পাওয়ার স্টেশন, যাত্রাবাড়ী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে গেরিলা অপারেশনে যথেষ্ট সাহসিকতার পরিচয় দেন শহীদ জুয়েল । সহযোদ্ধা হাবিবুল আলম বীরপ্রতীকের স্মৃতিচারণে জুয়েল চিত্রিত হয়েছেন প্রচণ্ড বুদ্ধিদীপ্ত, সাহসী এবং ঠান্ডা মাথার একজন যোদ্ধা হিসেবে যিনি ক্রিকেট ব্যাটের মতোই সাবলীলভাবেই অস্ত্র চালাতে পারতেন। ঢাকায় বেশ ক’টি অপারেশনে অংশ নিয়েছেন জুয়েল।

১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার বড় মগবাজার এলাকায় একটি বাড়িতে হানা দিয়ে পাকিস্তানি সেনারা তাকে আটক করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী সেখানে হানা দিয়ে জুয়েল, আজাদ, কাজী কামাল ও আজাদের দুই ছোটভাইকে ঘুম ভাঙিয়ে ডেকে তুলে যায় এরপর তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। ৩১ আগস্টের পর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। সেরাতে পাকিস্তানীদের হাতে আরও ধরা পড়েছিলেন রুমি, বদি, আলতাফ মাহমুদসহ অনেকে। তারপর থেকে ফিরে পাওয়া যায় নি এই বীর কে।

তাঁর ইচ্ছে পূরণ হয়নি। লাল সবুজের জার্সি গায়ে চাপিয়ে উইকেটের পিছনে আর দাঁড়ানো হয়নি কখনো। ব্যাট হাতে শাসন করা হয়নি বাইশ গজের যুদ্ধ ক্ষেত্রে। তিনি হেরেছেন তাঁর স্বপ্নের কাছে, তবে তিনি জিতেছেন। এই স্বাধীন বাংলার প্রতিটি মাটিতে মিশে আছেন তিনি। তিনি যে হারতে পারেন না, হারিয়ে যেতে পারেন না।

শুভ জন্মদিন শহীদ জুয়েল… ওপারে ভালো থাকবেন, আর দেখবেন এপারে আপনার স্বপ্ন পূরণে একজন মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদুল্লাহরা প্রতিনিয়ত লড়াই করে।