অনেক সময় আমরা দেখি যে মানুষে মানুষে, জাতিতে জাতিতে, দেশে দেশে অনেক ধরণের যুদ্ধ বেঁধে যায়। যেগুলোর কারণ একেক সময় একেক বার্তা বহন করে।
আবার অনেক সময় সেই যুদ্ধ গুলো থামানো খুব কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু আল্লাহর এই দুনিয়ায় হয়তোবা তিনি নিজেই প্রকৃতির দ্বারা সেই সকল ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে মানুষকে দূরে ঠেলে দেন। যা থেকে আজ পর্যন্ত অনেক যুদ্ধ আপনা আপনিই থেমে গিয়েছে।
১
১২৭৪ সালের কথা। প্রায় ৫০০-৯০০টি জাহাজে চড়ে ৩০,০০০-৪০,০০০ মঙ্গোলীয় সেনা চীন থেকে রওয়ানা দিলো, উদ্দেশ্য জাপানকে তাদের সাম্রাজ্যভুক্ত করা। জাপানের হাকাতা উপসাগরে গিয়ে নোঙর ফেললো মঙ্গোলদের বিশাল এই নৌবহর। তারা প্রস্তুতি নিচ্ছিলো বড়সড় এক আক্রমণের। কিন্তু প্রকৃতির খেয়াল ছিলো বোধহয় অন্যরকম। তাই জাপানে আঘাত হানার আগে উল্টো তারাই শিকার হয় ভয়াবহ এক ঘূর্ণিঝড়ের।
প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মঙ্গোলীয় যুদ্ধজাহাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, সলিল সমাধি ঘটে প্রায় ১৩,০০০ সেনার। এত বড় ক্ষতির শিকার হয়ে মঙ্গোলরা এরপর চীনে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
১২৮১ সালে আবারো তারা আনুমানিক ৪,৪০০ যুদ্ধজাহাজ এবং ১,৪০,০০ সেনার সুবিশাল এক বাহিনী নিয়ে আবারও আগমন ঘটে মঙ্গোলদের। ওদিকে জাপানের ছিলো কেবলমাত্র ৪০,০০০ সামুরাই ও সৈন্য। আগস্ট মাসের ১৫ তারিখে জাপানের উপর মরণ ছোবল হানতে যাচ্ছিলো মঙ্গোলীয় সেনারা। কিন্তু সেবারও জাপানের সহায় হলো প্রকৃতি।
২
আমাদের বাংলাদেশ এবং নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের দিকেই নজর দেয়া যাক। আনুমানিক সাড়ে ৩ কিলোমিটার লম্বা এবং ৩ কিলোমিটার চওড়া নিউমুর দ্বীপের মালিকানা নিয়ে বিবাদ ছিল প্রতিবেশী এই দুই দেশের মাঝে।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই দ্বীপটির সন্ধান সর্বপ্রথম পাওয়া যায় ১৯৭৪ সালে, স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবি বিশ্লেষণ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্বীপটির বয়স ততদিনে পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গিয়েছিলো।
দ্বীপে নিজেদের দখল নিশ্চিত করতে ১৯৮১ সালে ভারতের নৌবাহিনীর জাহাজ পাঠানো হয়। ভারতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে তারা সেখানে নিজেদের অধিকার চালানর চেষ্টা করে।
১৯৮৭ সালে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তোলা ছবিতে দেখা যায়, দ্বীপটি ধীরে ধীরে সমুদ্রগর্ভে বিলীন হতে শুরু করেছে। ২০১০ সালে এর আর কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি।
৩
১৭৯৬ সালের কথা। ব্রিটিশ ও ফরাসি সাম্রাজ্যের মাঝে সম্পর্ক তখন বেশ উত্তপ্ত। ফ্রান্সের বেশ কিছু অভিজাত ব্যক্তিবর্গ ও বিদ্রোহীকে আর্থিকভাবে সহায়তা দিচ্ছিলো ব্রিটেন। সেই সাথে বেশ কিছু মিত্র দেশকেও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়াতে সহায়তা করছিলো তারা।
১৭৯৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর; বেশ কিছু জাহাজে করে প্রায় ১৫,০০০ ফরাসি সেনার বহর ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে মাতৃভূমি ত্যাগ করে। মাঝপথে তারা ভয়াবহ এক ঝড়ের কবলে পড়ে। বেশ কিছু সেনা কোনোমতে বান্ত্রি উপসাগরে পৌঁছাতে সক্ষম হয়, যেখানে তাদের আঘাত হানবার আগে মিলিত হবার কথা ছিলো। তারপরও আঘাত হানা হলো না, কারণ জেনারেল হককে বহনকারী ফ্র্যাটারনাইট জাহাজটিরই কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিলো না। শেষপর্যন্ত ফরাসি সেনারা ইংল্যান্ডে আর আঘাত হানেনি। জেনারেল হক অবশ্য ফিরে এসেছিলেন।
মজার ব্যাপার হলো, এর পরের বছর বাটাভিয়ান রিপাবলিক ব্রিটেনে আক্রমণের পরিকল্পনা করেছিলো। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার জন্য তাদের নৌবহর বন্দর ছেড়েই বের হতে পারেনি।
৪
১৭০৮ সালে প্রায় ৪০,০০০ সুইডিশ সেনা আক্রমণ চালায় রাশিয়াতে। সুইডিশ সেনারা সংখ্যায় কম হলেও বড় বড় প্রতিপক্ষকে হারিয়ে তারা বেশ সুনাম অর্জন করে।
১৭০৯ সালের শীতটি পরিচিত ‘দ্য গ্রেট ফ্রস্ট’ নামে। সেই বছরের শীত ইউরোপে বিগত ৫০০ বছরের রেকর্ড ভঙ্গ করেছিল। একদিকে তীব্র শীত, অন্যদিকে রসদের অভাব- সব মিলিয়ে সুইডিশ সেনাদের অবস্থা ছিলো বেশ করুণ। এক রাতেই তারা হারায় প্রায় ২,০০০ এর মতো সহযোদ্ধাকে। শীত শেষ হতে হতে প্রায় অর্ধেক সুইডিশ সেনাই মারা যায়। গ্রীষ্ম শুরু হলে অবশিষ্ট সুইডিশ সেনারা আবারও রাশিয়ায় আক্রমণ শুরু করে। কিন্তু ততদিনে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায় প্রায় ৮০,০০০ রাশিয়ান সেনা। শেষপর্যন্ত মাত্র ৫৪৩ জন সুইডিশ সেনা জীবন নিয়ে স্বদেশে ফিরতে পারে।
৫
সেই সময় রানী এলিজাবেথকে আর সহ্য করতে পারছিলেন না স্পেনের রাজা ২য় ফিলিপ। তাই ১৫৮৮ সালের দিকে তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললেন, এলিজাবেথকে সরিয়ে সেখানে কোনো রোমান ক্যাথলিককে বসাতে হবে। এই উদ্দেশ্যে তিনি এক বিশাল বহরে ৩০,০০০ এর মতো সেনা নিয়ে তারা ব্রিটেনের অভিমুখে আক্রমণের পরিকল্পনা করেন।
ব্রিটিশরা এই অভিযানের ব্যাপারে আগেভাগেই টের পেয়ে যায়। ফলে তারাও প্রস্তুত হয়ে যায়। প্লাইমাউথের উপকূলবর্তী অঞ্চলে দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। বেশ কয়েকবার যুদ্ধে জড়ালেও কোনো পক্ষই জয়ের দেখা পাচ্ছিলো না। শেষপর্যন্ত পরাজয় ঘটে স্পেনেরই, তবে সেটা ব্রিটিশ নৌবাহিনীর হাতে না, বরং প্রকৃতির কাছে। মারাত্মক এক ঝড়ের কবলে পড়েই দফারফা হয়ে যায় স্প্যানিশদের।

