নতুন নতুন আবিষ্কার আর সৃষ্টির করার দিক থেকে মানুষ যেমন পিছিয়ে নেই তেমনি পিছিয়ে নেই ধ্বংসের দিক থেকেও। এদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছেনা ভূমি, আকাশ এমনকি সমুদ্রে থাকা প্রানীরাও।
প্রায় ১০ লাখ প্রজাতির প্রানীর বিলুপ্তির হুমকি রয়েছে মানুষের হাতেই এমনই রোমহর্ষক তথ্য উঠে এসেছে এক প্রতিবেদনে।
প্রকৃতিতে প্রজাতির এই বিলুপ্তির হার অতীতের তুলনায় বর্তমানে অধিক হারে বেড়েছে। এক্ষত্রে প্রধান ভূমিকা রাখছে অধিক খাবার ও জ্বালানি সংগ্রহের দিকে মানুষের প্রচেষ্টা।
এক প্রতিবেদনে দাবী করা হয় প্রজাতির এ বিলুপ্তি থামানো সম্ভব, কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আন্তঃসম্পর্কের ‘রূপান্তরমূলক পরিবর্তন’ আনা আবশ্যক।
তিন বছর যাবত তৈরি করা এ প্রতিবেদনে ব্যবহার হয়েছে ১৫ হাজার রেফারেন্স। এ প্রতিবেদনটি সংকলিত হয় ইন্টারগভর্নমেন্টাল সায়েন্স-পলিসি প্লাটফর্ম অন বায়োডাইভারসিটি অ্যান্ড ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস (আইপিবিইএস) থেকে। এর মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ১ হাজার আটশ’।
সোমবার (৬ই মে) প্যারিসের একটি বৈঠকে ৪০ পৃষ্ঠার একটি পলিসি সামারি প্রকাশিত হয়। এতে পৃথিবীতে অন্যান্য প্রানীদের প্রতি মানুষের প্রতিক্রিয়া কেমন সেটিই তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গোটা ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে প্রকৃতি ভুক্তভোগী হয়েছে মানুষের কারনেই। বিগত ৫০ বছর যাবত প্রকৃতিতে সৃষ্ট গভীর সব ক্ষত মানুষেরই করা। বিশ্বের জনসংখ্যা যখন ১৯৭০ এর পর দ্বিগুণ হয় বৈশ্বিক অর্থনীতির সম্প্রসারণ ঘটেছে ৪ গুন।
বিপুলসংখ্যক এ জনগোষ্ঠীর খাদ্য, বস্ত্র ও জ্বালানি চাহিদা পূরণে যে হারে বন ধ্বংস করা হয়েছে তা সত্যিই আশ্চর্যজনক। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চল এর মধ্যে বেশী। ১০ কোটি হেক্টর গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চল ধ্বংস হয়েছে কেবলমাত্র ১৯৮০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে।
বিশাল এ বনভূমি ধ্বংস করার একমাত্র কারন দক্ষিণ আমেরিকায় গবাদি পশুর খামার তৈরি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাম ওয়েল চাষ।
জলাভূমির পরিস্থিতি বনভূমির চাইতে অধিক ভয়ানক। ১৭০০ সালে থাকা জলাভূমির মাত্র ১৩ শতাংশ ২০০০ সালে বিরাজমান। বিশ্বব্যাপী নগরায়ন দ্রুত হওয়ার পাশাপাশি নগরাঞ্চল দ্বিগুণ হারে সম্প্রসারিত হয়েছে ১৯৯২ সালের পর।
ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিকসংখ্যক প্রজাতি ধ্বংস হয়েছে শুধুমাত্র মানবসৃষ্ট কারনে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ২৫ শতাংশ প্রাণী ও বৃক্ষ বর্তমানে বিলুপ্তির হুমকিতে রয়েছে। বিশ্বে পোকামাকড় বিলুপ্ত হওয়ার যথাযোগ্য তথ্য না থাকলেও বিলুপ্তির শক্তিশালী তথ্য কিছু অঞ্চল থেকে পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনের দাবী, প্রায় ১০ লাখ প্রজাতি আগামী কয়েক দশকের মধ্যে বিলুপ্তির হুমকিতে রয়েছে। যা গত এক কোটি বছরের যেকোনো সময়ের বিলুপ্তির হারের চেয়ে ১০ থেকে ১০০ গুন বেশী।
এছাড়াও আরো জানা যায়, মাটি দূষণের ভয়াবহতা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। বর্জ্যের পাহাড় তৈরি হয়েছে আমাদের ভোগলিপ্সার কারনে পাশাপাশি পৃথিবীর মোট ভূপৃষ্ঠের প্রায় ২৩ শতাংশ ভূমির উৎপাদনশীলতা নষ্ট হয়ে পড়েছে।
১৯৮০ সালের পর থেকে বিশ্বে প্লাস্টিক দূষণের হার বেড়েছে ১০ গুণ। বিশ্বজুড়ে ধাতব পদার্থ, বিষাক্ত পদার্থ সহ প্রায় ৩০-৪০ কোটি টন অন্যান্য বর্জ্য আমরা পানিতে নিক্ষেপ করি। মহাসাগরগুলো মাত্র ৩ শতাংশ মানুষের চাপ থেকে মুক্ত বলে বর্ণনা করা হয়েছিল ২০১৪ সালে।
বিশ্বের জীবন্ত প্রবালের অর্ধেকই ধ্বংস হয়ে গেছে বিগত ১৫০ বছরে। মানুষের প্রাণী শিকার, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ ও আক্রমণাত্মক প্রজাতি ইত্যাদিই প্রাণিসম্পদ বিলুপ্তির পেছনে কাজ করছে বলে জানা যায়।
পরিস্থিতি আরো ভয়ানক করে তোলার পেছনে একসঙ্গে অনেকগুলো কারন মিলিত হয়ে কাজ করছে বলেও জানায় ওই প্রতিবেদন।

