বাংলাদেশের জন্য ক্রিকেট কি? এই প্রশ্নের জবাব খুব সহজে দেওয়া সম্ভব না। ক্রিকেট বাংলাদেশের জন্য আবেগ, ভালোবাসা। বেঁচে থাকার সম্বল। যেখানে এক হয়ে প্রতিটি মানুষই একসাথে ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ বলে চিৎকার করে।
এই চিৎকার, এই আবেগ-ভালোবাসার মূল্য অনেকে। আমাদের কাছে, বিশ্ববাসীর কাছে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সমর্থনের প্রশংসা বিশ্বজুড়ে। সেই প্রশংসায় কখনো কখনো লজ্জা লাগে, হতাশ লাগে।
এমন এক ফ্যানবেজ যে নিজের দেশকে ছোট করতেও দ্বিধা করে না। অতীতের সব সুখ স্মৃতি ভুলে গিয়ে নতুন উদ্দমে অপমান করতে লেগে পড়ে।
সাকিব, তামিম, মাশরাফি, মুশফিক, মাহমুদুল্লাহ – কেউ ছাড় পায় না। যাদের জন্য আজ বাংলাদেশ এত উপরে, তাদের অবজ্ঞা করে যেন পৈচাশিক আনন্দ পায় এদেশের নব্য ক্রিকেট ফ্যানগুলো।
দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের ‘মাশরাফি’ বইটিতে মাশরাফির একটি বিশাল সাক্ষাৎকার আছে। সেখানে মাশরাফি বলেছিলেন,
আমাদের এখানে জয়ের আনন্দ বা জয় দেখতে চেয়ে প্রতিদিন নতুন নতুন সমর্থক যোগ হচ্ছেন। আমি সমালোচনা করছি না। তবে এই ক্রিকেটের আগে-পরের চরিত্র, ক্রিকেটে কি ঘটে, কি ঘটে না; এসব একেবারেই না জেনে ক্রিকেটের অনুসরণকারী হয়ে যাওয়ার একটা বিপদ আছে। মনে হয়, ব্যর্থতাটা বুঝি খেলার অংশ না। এর ফলে ব্যর্থতা মানেই সেটাকে ব্যক্তিগত অন্যায় ভেবে বসা হয়। এটার খুব বিপদ আছে।
মাশরাফির কথাগুলো অনেক অংশে নয়, পুরোপুরি সঠিক। বাংলাদেশ এখন জিততে পারে। প্রতিটি ম্যাচে যে কাউকে হারানোর ক্ষমতা রাখে। আর তাতেই নিত্যনতুন সমর্থক যুক্ত হচ্ছে। এবং তারা অনেকেই মনে করে বাংলাদেশ হারতে পারে না। হারাটা অন্যায়ের সমতুল্য।
আর তাইতো কখনো কখনো মাশরাফি-তামিমের নিবেদন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আবার মুশফিকের আবেগ, সাকিবের কঠোরতা নিয়ে সমালোচনা হয়। বিপদে হাত তুলে দাঁড়ানো মাহমুদুল্লাহরও মুক্তি নেই সেখানে।
পায়ে সাতটি অপারেশন নিয়ে যখন একজন নেতা দৌড়ায়, তার কাঁধে বড় করে বাকি দশজন। সেই নেতাকে রাজনৈতিক কারণে অসম্মান বোধহয় আমরাই করতে পারি। অথচ একদিন সে ছিল সকলের নয়নের মনি।
যেই মানুষটা হাত ভাঙা নিয়ে এক হাতে ব্যাট করতে নেমে পড়েছিলেন, তার ইনজুরি থেকে রিদমে ফিরে আসার সময় না দিয়ে দুই-ঋণ ম্যাচ দেখেই তাকে বসিয়ে রাখার আন্দোলন করতে পারি। অথচ এই তামিম ইকবাল শেষ চার বছরে কতগুলো জয়ের সাক্ষী, কতগুলো জয়ে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন তার হিসাব রাখতে পারি না।
কিংবা মাহমুদুল্লাহ? তার অবদানের কথা এত দ্রুত ভুলে গেলে চলবে? মুশফিক হাতে ধরে কতগুলো ম্যাচ জিতিয়েছেন হিসেব করে একটু দেখুন।
সাকিবকে অসম্মান করতে তার সহধর্মিনীকে টেনে আনা, পারিবারিক ছবিতে কটূক্তি মন্তব্য করা কিংবা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে গালিগালাজ বোধহয় এই একটিমাত্র ফ্যানবেজই করে।
আপনি সাকিবকে পছন্দ করেন না, তামিমকে ভালো লাগে না, মাশরাফিকে ঘৃণা করেন। করতেই পারেন। সেসব আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে তাই বলে তাদের খারাপ খেলা চাইতে পারেন কি?
তারা যখন লাল সবুজের জার্সি গায়ে মাঠে নামে তখন তারা আমাদের হয়ে যায়। সাকিবকে অপছন্দ করি বলে সে রান করুক চাই না, কিংবা মাশরাফিকে সহ্য হয়না বলে সে উইকেট না পাক – তাতে খুব খুশি মনে হামলে পড়া যায়।এমন চাওয়াটা আপনার অসুস্থতার বহিঃপ্রকাশ।
এই বাংলাদেশ এক দিনও হয় নাই। তিলে তিলে গড়ে উঠেছে আজকের বাংলাদেশ। অনেক অবজ্ঞা সহ্য করতে হয়েছে, অপমান মাথা পেতে নিতে হয়েছে। সবকিছুর জবাব ওই মাঠে দিয়েই এগিয়ে যেতে হয়েছে।
এই দল গড়তে নিজেদের রক্ত পানি করেছে ওরা পাঁচজন। আমাদের পঞ্চপান্ডব। আজ বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখি, আজ সেরা মঞ্চে সেরা হওয়ার বিশ্বাস রাখি। কাদের জন্য? যাদের জন্য এই স্বপ্ন, এই বিশ্বাস; তাদের আপনি প্রাপ্য সম্মানটুকু দিবেন না? এতটা অকৃতজ্ঞ কেন আমরা?
ওরা আছে বলেই তরুণরা বিশ্বাস করে, আমরাও পারি। ড্রেসিংরুমে গেয়ে উঠে ‘আমরা করব জয়’। এই জয় একদিন হবে। হতেই হবে।
যেই দল একটু একটু করে নিজেদের গড়ে তুলেছে, এক পা দুই পা করে এগিয়ে গিয়েছে সেই দলটা এভাবেই এগিয়ে যাবে। শীর্ষ মঞ্চে মাথা তুলে দাঁড়াবে। হার মানাবে না।
বিশ্বাস রাখুন, ভরসা রাখুন… এর প্রতিদান একদিন আপনি ঠিকই পাবেন!

