ভাষার মাসে প্রাণের বইমেলা! শিশুপ্রহর ও ছুটির দিনের আমেজ


ভাষার মাসে প্রাণের বইমেলা! শিশুপ্রহর ও ছুটির দিনের আমেজ

দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর অনিশ্চয়তার দোলাচল কাটিয়ে অবশেষে পর্দা উঠল বাঙালির প্রাণের উৎসব ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’-এর। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে মেলার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত ফেব্রুয়ারির শেষ লগ্নে শুরু হওয়া এই মেলা ঘিরে লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের মধ্যে বইছে উৎসবের আমেজ।


উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও প্রাণের স্পন্দন

ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই মেলা আয়োজন নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা ছিল। তবে সব বাধা পেরিয়ে বসন্তের এই সময়ে মেলা শুরু হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বইমেলা কেবল কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি আমাদের জাতীয় চেতনার দর্পণ। নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানতে এবং মননশীল সমাজ গঠনে বই পড়ার বিকল্প নেই।” অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার প্রদানসহ বিশিষ্ট সাহিত্যিকদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।

রমজান ও সময়সূচির নতুন বিন্যাস

এ বছর বইমেলার আয়োজনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে সময়সূচিতে। পবিত্র রমজান মাসের পবিত্রতা ও রোজাদারদের সুবিধার্থে আয়োজক কমিটি সূচিতে কিছুটা সমন্বয় এনেছে। সাধারণ দিনে মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। তবে পাঠকদের জন্য বিশেষ সতর্কবার্তা হলো, রাত সাড়ে ৮টার পর মেলায় প্রবেশের মূল ফটক বন্ধ করে দেওয়া হবে। মেলা প্রাঙ্গণে ইফতার ও নামাজের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে গ্রন্থানুরাগীরা কোনো ভোগান্তি ছাড়াই দীর্ঘ সময় মেলায় অবস্থান করতে পারেন।

শিশুপ্রহর ও ছুটির দিনের মেজাজ

আজ শুক্রবার মেলার দ্বিতীয় দিন এবং প্রথম ‘শিশুপ্রহর’। সোনামণিদের জন্য মেলার দুয়ার উন্মুক্ত হবে বেলা ১১টায়। দুপুর ১টা পর্যন্ত মেলা প্রাঙ্গণ থাকবে মূলত শিশুদের দখলে। তাদের আনন্দ দিতে সিসিমপুরের ইকরি, হালুম ও টুকটুকিরা হাজির থাকবে নিয়মিত মঞ্চে। দুপুর ১টার পর থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। শুক্রবার ও শনিবারসহ অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনেও এই একই সময়সূচি অনুসরণ করা হবে।


এক নজরে বইমেলা ২০২৬-এর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

বইমেলা চলাকালীন পাঠকদের সুবিধার্থে নিচের তথ্যগুলো সহায়ক হতে পারে:

  • উদ্বোধন: বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।

  • সাধারণ সময়সূচি: প্রতিদিন দুপুর ২:০০ থেকে রাত ৯:০০ পর্যন্ত (প্রবেশ বন্ধ রাত ৮:৩০ মিনিটে)।

  • ছুটির দিনের সূচি: সকাল ১১:০০ থেকে রাত ৯:০০ পর্যন্ত।

  • শিশুপ্রহর: ছুটির দিনগুলোতে সকাল ১১:০০ থেকে দুপুর ১:০০ পর্যন্ত।

  • স্থান: বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিস্তীর্ণ এলাকা।

  • নিরাপত্তা: পুরো মেলা এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতাভুক্ত এবং কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয় নিশ্চিত করা হয়েছে।


প্রকাশকদের প্রত্যাশা ও আগামীর ভাবনা

অনিশ্চয়তা কাটিয়ে মেলা শুরু হওয়ায় প্রকাশকদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে। অনেক প্রকাশক আশঙ্কা করেছিলেন মেলা দেরিতে শুরু হওয়ায় বিক্রি কম হতে পারে, কিন্তু উদ্বোধনী দিনের উপচে পড়া ভিড় সেই শঙ্কা দূর করে দিয়েছে। তবে রমজানের কারণে মেলা চলাকালীন খাবারের দোকান ও স্টলগুলোর বিন্যাসে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। পাঠকদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে বিশেষ বাস সার্ভিসের ব্যবস্থাও করা হয়েছে নির্দিষ্ট কিছু রুট থেকে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ধুলোবালি নিয়ন্ত্রণ এবং ঘাসফুল ঘেরা পরিবেশে বইয়ের ঘ্রাণ নিতে আসা এক পাঠক বলেন, “মেলা দেরিতে হলেও শুরু হয়েছে এটাই বড় কথা। তবে রমজানের দুপুরে মেলায় ঘোরা কিছুটা কষ্টকর হতে পারে, তাই বিকেলের দিকেই ভিড় বাড়বে বলে মনে হচ্ছে।”

অমর একুশে বইমেলা কেবল কাগজের পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি বাঙালির অস্তিত্বের লড়াই ও বিজয়ের প্রতীক। রমজানের সংযম আর বইয়ের সুবাস মিলেমিশে এবারের মেলা এক অনন্য রূপ ধারণ করেছে। আশা করা যাচ্ছে, সময়ের এই পরিবর্তন পাঠকদের উদ্দীপনায় কোনো ভাটা ফেলবে না, বরং নতুন বইয়ের ঘ্রাণে মুখরিত হবে বাংলা একাডেমির চত্বর।