বাংলাদেশের পাঁচটি অগ্রাধিকার খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার টোকিওতে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরাম সংলাপে তিনি মোটরযান উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণা, রেল ও সরবরাহব্যবস্থা এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরেন।
জাপানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে আরও কার্যকর অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়াই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। সরকারের প্রত্যাশা, নতুন বিনিয়োগ এলে দেশে উৎপাদনশিল্পের বিস্তার, প্রযুক্তির ব্যবহার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের সুযোগ বাড়বে।
টোকিওতে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংলাপে প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩৫০টি জাপানি কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে দেশে জাপানের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের পরিমাণ এখনো ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের নিচে। সর্বশেষ অর্থবছরে বাংলাদেশ জাপানে ১৩৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে; বিপরীতে জাপান থেকে আমদানি করেছে ২১৬ কোটি ডলারের পণ্য। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
মোটরযান উৎপাদন খাতে টয়োটার সম্ভাব্য কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে গাড়ি উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে তোলার বিষয়ে টয়োটা চলতি মাসের শুরুতে সরকারকে জানিয়েছে। পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য ২০২৯ সাল। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে গাড়ি সংযোজন, যন্ত্রাংশ উৎপাদন, দক্ষ জনবল তৈরি এবং সংশ্লিষ্ট সরবরাহব্যবস্থায় নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জ্বালানি খাতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) অবকাঠামো, দক্ষ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রযুক্তি খাতে প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-জাপান প্রযুক্তি পার্কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মহাকাশবিজ্ঞান ও স্যাটেলাইট প্রকৌশলেও জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে চায় বাংলাদেশ।
রেল ও সরবরাহব্যবস্থার ক্ষেত্রে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালকে যুক্ত করে উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। তবে এ উদ্যোগের আগে জাতীয় মহাপরিকল্পনা, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা বিশ্লেষণ এবং সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে।
কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণও বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ফল, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং শিল্পজাত পণ্য তৈরিতে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুযোগ খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলেও বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে; অঞ্চলটি জাপানের সুমিতোমো করপোরেশন জাপানি মানদণ্ডে উন্নয়ন করছে।
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) দুই দেশের বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ পাবে। জাপানের ইস্পাত, গাড়ির যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক উপাদানও বাংলাদেশে অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা পাবে।
বাংলাদেশের জন্য এ সুযোগ কাজে লাগাতে শুধু বিদেশি বিনিয়োগের আহ্বান যথেষ্ট নয়। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, উন্নত অবকাঠামো, দ্রুত ও পূর্বানুমানযোগ্য শুল্ক প্রক্রিয়া এবং স্থিতিশীল করব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্বেগ হিসেবে এসব বিষয় আলোচনায় এসেছে।

