রানা, ভালো আছিস তো?


paperslife
CHITTAGONG, BANGLADESH: Bangladeshi cricketer Manjural Rana dives to the ground as he attempts to stop a ball during the first One Day International (ODI) match between Bangladesh and England at the M. A. Aziz Stadium in Chittagong, 07 November 2003. The tourists beat Bangladesh by seven wickets as Bangladesh were dismissed for 143 in 44.4 overs. AFP PHOTO/ Farjana K. GODHULY (Photo credit should read FARJANA K. GODHULY/AFP/Getty Images)


সাকিব আহমেদ

আলোটা চোখে এসে লাগছে। মাশরাফি বোধহয় আবার আলোটা জ্বালিয়েছে। ছেলেটা ঠিক হবে না আর। এভাবে কি ঘুমানো যায়? বালিশ চোখের উপর চেপে ধরে ওপাশ ফিরল ছেলেটা। হঠাৎ করেই ঘুম নেই চোখে, যেন হাওয়া হয়ে গিয়েছে। লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসল ছেলেটা। এখানে মাশরাফি আসবে কোথা থেকে? প্রিয় বন্ধুকে সবসময় কাছে চাইলেও, এক্ষেত্রে কখনোই কাছে চায় না সে।

১২ বছর হয়ে গেল। আজও নিজের কাছের বন্ধুটিকে ভুলতে পারল না। মাঝরাতে মনে হয় মাশরাফির ডাক শুনতে পায়। শেষ বেলায় বন্ধুর অভিমানগুলো কানে বাজে। কিন্তু আলো জ্বালালো কে? আলো থাকলে যে ঘুম হয় না তার!

‘রানা, শুভ জন্মদিন।’ হিউজের কন্ঠ কানে আসছে। হাতে বড়সড় এক কেক।
অবাক চোখে চেয়ে আছে রানা। ‘আজ তো আমার জন্মদিন না!’ বলল সে।
‘তোমার যে নতুন জন্ম হয়েছে এই দিনে। ভুলে গেছ ১২ বছরের আগের কথা?’ মনে করিয়ে দিল হিউজ।

কি করে ভুলবে সে দিনের কথা? খুলনায় খেলা ছিল। খেলা শেষ করে চুই ঝাল খাওয়ার লোভ সামলাতে পারেনি রানা। সাথে কিছুটা মন খারাপও ছিল। পরের দিন বিশ্বকাপ মিশন শুরু করবে বাংলাদেশ। অথচ সুযোগ না পেয়ে সে দেশে একটি পাড়ায় ক্রিকেট খেলছে কেবল। এতসব ভাবতে ভাবতে বাইক ছুটিয়ে নিয়ে যাওয়া। এরপর…

এরপর আর কিছু মনে নেই। যখন ঘুম ভাঙে তখন কোথায় আছে বুঝে উঠতে পারে না। মাথার পাশে জুয়েলকে দেখে অবাক হয়! সেই শহীদ জুয়েল, মুক্তিযুদ্ধের সময় যাকে সবকিছু ছেড়ে যেতে হয়েছিল একটি নতুন দেশ গড়ে তোলার জন্য। রানা যখন বুঝতে পেরেছিল, সে এমন জায়গায় চলে এসেছে যেখান থেকে আর ফিরে যাওয়ার উপায় নাই। তখন সে কি কান্না! প্রিয়জনদের কাছে যেতে পারবে না, মাশরাফির সাথে কোনো খুনসুটি হবে না, হবে না আর বিশ্বকাপে খেলা! এসব কি ভোলা যায় কোনোদিন?

হিউজের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে জুয়েল। ‘তাড়াতাড়ি কেকটা কেটে নে, রানা।’ জুয়েল বলল। রানা উঠে দাঁড়ালো। কেকের উপর বারোটা মোমবাতি। ফুঁ দিয়ে সবগুলো নিভিয়ে কেক কাটলো। জুয়েল, হিউজের কণ্ঠে তখন ‘ হ্যাপি বার্থডে টু ইউ, হ্যাপি বার্থডে টু ইউ, হ্যাপি বার্থডে ডিয়ার রানা, হ্যাপি বার্থডে টু ইউ।’

কেক কাটা শেষ হলো। সবাই রানাকে এক টুকরো কেক মুখে পুরে দিল। রানার মুখে হাসি নেই। খুব মিস করছে সে পৃথিবীকে। পৃথিবীর মানুষগুলোকে। এই স্বর্গলোকে খুব কদর তার। স্বর্গীয় ক্রিকেট দলের বর্তমান ক্যাপ্টেন, যার ব্যাটে উঠে রানের ফোয়ারা। আর বল হাতে নিলেই অবধারিত ভাবে উইকেটের পতন। তারপরও তার একটাই আক্ষেপ বাংলাদেশের হয়ে বিশ্বকাপে খেলতে না পারা।

স্বর্গের বেলকনিতে এসে দাঁড়াল রানা। এখান থেকে পৃথিবী দেখা যায়। হিউজ ততক্ষণে ইন্টারনেট চালু করে রানাকে আপডেট দিচ্ছে। কে কখন, কিভাবে রানাকে মিস করছে, মনে রাখছে। এসব শুনে রানার চোখটা ছল ছল করে উঠল। এতগুলো বছরেও তাকে কেউ ভোলেনি?

আচ্ছা, মাশরাফি কি ভুলে গেছে? এই বন্ধুকে মনে পড়ে মাশরাফির? নাকি সব ভুলে বসে আছে? মাশরাফির সাথে দিনগুলোকে খুব বেশি মিস করে রানা। মাশরাফির কথা ভাবতে ভাবতে ফিরে এলো নিজের বিছানায়।

রানা জানতেও পারে না। প্রতি বছর এই দিনে বাংলাদেশ দেশের জন্য না, রানার জন্য ক্রিকেট খেলে। আর তাইতো কোনো এক অদৃশ্য শক্তির জোড়ে এই দিনে কোনো খেলা হারে না বাংলাদেশ। মাশরাফি এই দিনে পুরো দলটিকে নতুন শক্তি যোগায়, যেই শক্তি রানার জন্য লড়াই করে। আর একটু অবসরে মাশরাফির দু চোখ বেয়ে ঝড়ে অশ্রু। বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ লাগে। অচিরে বলে ওঠে, ‘রানা, ভালো আছিস তো? ভাই আমার…’