বৈশাখের রৌদ্রতপ্ত দিনে রৌদ্রস্নানে আজ আমাদের প্রিয় পৃথিবী শুচি হোক, শুদ্ধ হোক ও রোগ মুক্ত হয়ে বেঁচে উঠুক। বছরের প্রথম দিনে সকলে মিলে শপথ নিতে পারি করোনা প্রতিরোধে আরোপিত বিধিনিষেধ কঠোরভাবে পালন করে নিজে ভালো থাকব এবং অন্যদের ভালো থাকতে সাহায্য করব।
উৎসব আসে আনন্দের বার্তা নিয়ে। অথচ আজ মানুষের মনে আনন্দের জায়গা নিয়েছে আতঙ্ক। উৎসবের প্রকাশ ঘটে মানুষে মানুষে মিলন ও প্রীতিবিনিময়ের মধ্য দিয়ে। সেই জায়গায় কঠিন বাস্তবতা নিয়ে এসেছে করোনা। উৎসব উদযাপনের বাস্তব কোনো সুযোগ নেই।
আমাদের জীবনে এই স্বাধীন বাংলাদেশে নববর্ষ নিয়ে আসে বহুতর ব্যঞ্জনা ও ভিন্নতর তাৎপর্য। এই সাংস্কৃতিক জাতীয়তার অভিযানে সবার আবেগ ও সব অনুষঙ্গ যেন ক্রমেই একত্রিত হয়েছিল এই একটা উৎসবের মধ্যে। বাংলা নববর্ষ ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রাণের উৎসব।
আজ এক অদেখা ক্ষুদ্র অণুজীবে অসহায় হয়ে ওঠা দীর্ঘকায় মানবজাতির এত দিনের ঐতিহ্য থমকে দাঁড়িয়েছে।
পঞ্চাশের দশকে নবজাগ্রত বাঙালি চেতনা থেকে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে ছোটবড় নানা পরিসরে নববর্ষ পালিত হয়েছে। তবে ১৯৬৩ সনে সংগীত সংগঠন ছায়ানটের উদ্যোগে প্রথম কোনো মুক্ত জনপরিসরে রমনা পার্কের বটগাছ তলায় বড় আয়োজনে নববর্ষের প্রভাতী অনুষ্ঠান শুরু হয়।
সেকালে পাকিস্তান সরকার বহুভাবে চেষ্টা করেছে এই উৎসব বন্ধ করার। কিন্তু ততদিনে এ তো হয়ে উঠেছিল সবার প্রাণের উৎসব; বরং দিনে দিনে রাজনৈতিক অঙ্গনে বাঙালি স্বাধিকার ও স্বাধীনতার দাবি জোরদার হলে নববর্ষ উদযাপনের প্রয়াস যেমন বেড়েছে তেমনি রমনা বটমূলের নববর্ষে প্রভাতী অনুষ্ঠানে আম জনগণের যুক্ত হওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে।
জেলায় জেলায় এই আয়োজন ছড়িয়ে পড়েছে, প্রভাতী অনুষ্ঠান কোথাও গড়িয়েছে দিনব্যাপী, কোথাও বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের যুগ্ম অনুষ্ঠান চালু হলো, কেউবা নববর্ষের ঐতিহ্যবাহী মেলা নগরেও প্রচলন করলেন। আকর্ষণের কেন্দ্র চলে এলো বাদ্যে, সজ্জায়, বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রায়।
রাজধানীর এই শোভাযাত্রা দিনে দিনে কলেবরে ও আকর্ষণে বড় হয়েছে। দেশের আনাচে কানাচেও এই ধারা অনুসৃত হলো। আজ মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশের নববর্ষ যেন উচ্চতর মর্যাদায় বৈশ্বিক স্বীকৃতি পেল।
কিন্তু এবারে এলো ছন্দপতনের বছর। বাজার বন্ধ, কেনাকাটা হবে না, নতুন পোশাক পরা হবে না, উৎসবের খাবারে কারোরই আগ্রহ দেখা যাবে না, হালখাতা খোলা হবে না, মিষ্টির দোকান তালাবদ্ধ, আজ বিশ্ববাসীর সঙ্গে আমরাও করোনার থাবার নিচে, উৎসব তো সেখানে বিলাসিতা মাত্র।
আজ তাই নববর্ষের প্রথম দিনে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা হোক, এই পৃথিবী হয়ে উঠুক সুস্থ। মৃত্যুর মিছিলে আর যোগ না হোক কোনো নাম। সবাই সুস্থ থাকুক, নিরাপদে থাকুক!

