(দশম পর্বের পর)
দশ মিনিট পার হতে না হতেই বিপুল তার কাজ শেষ করে ফিরে এসেছে। একটা চেয়ার টেনে আমিনুল হকের সামনে বসে জিজ্ঞেস করল, ‘জ্বি আঙ্কেল বলেন। কি কথা ছিল?’
একটু ইতস্তত করে আমিনুল হক সাহেব সব খুলে বললেন বিপুলকে। তার মেয়ে ঘুরতে যেতে চাওয়া, তার বাঁধা দেওয়া, দুই দিন পর মেয়েকে খুঁজে না পাওয়া, একটা চিঠি, সেখানে কাউকে না জানিয়ে ঘুরতে যাওয়ার কথা বলা! সবই বললেন। কোনও কিছু বাদ দিলেন না।
সানজিদা কাউকে কিছু না বলে বাসা ছেড়ে চলে গেছে, বন্ধুদের সাথে ঘুরতে গেছে এ কথা শুনে বেশ অবাক হলো বিপুল। সানজিদার মতন শান্তশিষ্ট মেয়ে এভাবে কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে যেতে পারে? বাবার বিরুদ্ধে গিয়ে বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যেতে পারে? বিশ্বাস হতে চায় না। তবুও যে বিশ্বাস করতে হয়। কারণ, সানজিদার লেখা চিঠিটা বের করে বাড়িয়ে ধরেছেন সানজিদার বাবা। চিঠির পুরোটা পড়ল বিপুল। সানজিদার হাতের লেখা চিনতে অসুবিধা হলো না। কিন্তু এমন দুঃসাহসিক কাণ্ড ঘটানোর সাহস পেলো কি করে? তাই ভাবছে বিপুল।
নিশ্চয়ই অমির প্ল্যান। অমি ছাড়া এসব চিন্তা কেউ করতে পারবে না। কিন্তু সাদ? ও কি করে এতে সম্মত দিলো? কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না বিপুল।
‘কি ভাবছ বাবা?’ আমিনুল হকের কণ্ঠে ভাবনার জগত থেকে ফিরে এলো বিপুল।
‘কিছু না আঙ্কেল।’ জবাব দিলো সে। জিজ্ঞেস করল, ‘আমি আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি?’
‘তুমি তো সানজিদার ব্যাচের ছাত্র।’ বললেন আমিনুল হক। ‘তুমি হয়ত জানো ও কাদের সাথে গিয়েছে। না জানলেও হয়ত আন্দাজ করতে পারছ। যদি আমাকে সাহায্য করো, ওদের কারো সাথে যোগাযোগ করার ব্যবস্থা করে দিতে পারো খুব উপকার হবে।
এক দোটানায় পড়ে গেছে বিপুল। কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। সানজিদা তার বন্ধু। বন্ধু বাসায় কিছু না বলে বাইরে গিয়েছে, এখন তাদের খবর জানিয়ে দিলে যে বন্ধুদের সাথে বেইমানি করা হয়! অন্যদিকে আঙ্কেলকেও মিথ্যে বলতে পারবে না। চাইলেই সাদ বা অমির বাসার ঠিকানা বলে দিতে পারে। বেশ কয়েকবার তাদের বাসায় গিয়েছে সে। নিলয়ের বাসায় চেনে। কিন্তু বন্ধুদের না জানিয়ে এভাবে বলে দিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করবে?
নিজেকে সামলে নিয়ে বিপুল বলল, ‘দেখেন আঙ্কেল। সানজিদা ভালো আছে। ও যাদের সাথে গিয়েছে, তারা খারাপ নয়। আপনার মেয়েকে দেখে রাখবে বলেই আমার বিশ্বাস। সবচেয়ে বড় কথা সাদ আছে সেখানে। আর সাদ থাকলে সানজিদার কোনও ক্ষতি হতে কখনো দিবে না। ও আপনার মেয়েকে নিজের বোনের মতো আগলে রাখে।
‘সবই বুঝছি বাবা,’ জবাব দিলেন আমিনুল হক। ‘কিন্তু কি করব বলো! মেয়ে তো! দুই রাত ধরে মেয়েটার কোনও খবর নেই। কোথায় আছে, কি করছে? কিছুই জানি না। বাবা হিসেবে চিন্তা হয়। শুধু মেয়েটার একটা খবর পেলে শান্তি লাগত।’ কিছুক্ষণ থেমে আবার বলতে লাগলেন, ‘তুমি তো জানো সানজিদা কাদের সাথে গিয়েছে। তুমি শুধু একবার আমার মেয়ের খবর এনে দাও। আমি আর কিছু চাই না। প্লিজ বাবা। আমি তোমার বাবার মতো। এই বৃদ্ধ মানুষটার এই একটা উপকার করো।’
সানজিদার বাবার হাহাকার, এমন কথাবার্তায় খুব মায়া লাগলো বিপুলের। কি করবে সে?সিদ্ধান্ত নিলো, এই বৃদ্ধ মানুষটাকে না করবে না। বন্ধুত্বও রক্ষা করবে, আঙ্কেলকেও সাহায্য করবে।
‘আঙ্কেল আপনি একটু বসেন।’ বলল বিপুল। ‘আমি দেখছি কি করা যায়।’ বলে উঠে গেলো বিপুল। জিন্সের পকেট থেকে ফোন বের করে সাদের নাম্বারে ডায়াল করল।
সাকিব আহমেদের গল্প “আবার নয়নরাঙা”
ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এলো সাদ। সাদের বের হওয়ার পরপরই ওয়াশরুমে ঢুকল রিফাত। নিচে নেমে কাউকে দেখতে পেলো না সে। নিশ্চয়ই সবাই বাগানে আছে। বাগানে যেয়ে দেখলে, ঠিক তাই। অমি, সানজিদা আর নিলয় আড্ডা দিচ্ছে। হাসাহাসি করছে, মজা করছে।
সাদকে দেখে কোনোরকম ভণিতা না করে অমি জিজ্ঞেস করল, ‘কিরে, তুই নাকি সকাল সকাল
জবাব দিলো না সাদ। সানজিদার পাশের ফাঁকা চেয়ারে বসল। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘নিলয় তাই বলেছে?’
‘জ্বি স্যার,’ অমির উত্তর। ‘তুই নাকি কালকের রহস্যজনক শব্দের মর্ম উদ্ধারে বের হয়েছিলি?’
‘জ্বি না ম্যাডাম,’ বলল সাদ। ‘মোটেও তা নয়। সকালের গ্রাম দেখতে হাঁটতে বের হয়েছিলাম। ভাবলাম ওই দিক থেকে ঘুরে আসি। মতিন চাচার কথা কৌতূহল বেড়েছিল। তা কমানোর জন্যই গিয়েছিলাম। কোনও গোয়েন্দাগিরির জন্য নয়।’
‘তা কৌতূহল কেমন কমলো?’ জিজ্ঞেস করল সানজিদা।
‘একদমই কমে নাই,’ বলল সাদ। ‘বরং বেড়েছে। ওই ধরণের রাজপ্রাসাদ টাইপের বিশাল পরিত্যক্ত বাড়ি দেখলে মনে হয় এর ভেতর হাজার হাজার রহস্য রয়েছে।’
‘আমরাও সে রহস্য দেখতে চাই।’ বলল সানজিদা।
‘ঠিক,’ সানজিদার কথার পক্ষ নিয়ে বলল অমি। ‘শুধু তুইই রহস্য খুঁজবি, আর আমরা বসে বসে মশা মারব? তা হবে না, তা হবে না।’
‘আরেহ!’ বলল সাদ। ‘আমি কোনও রহস্য খুঁজতে যাইনি। আমি সত্যিই হাঁটতে গিয়েছিলাম। শুধু সেখান থেকে ঘুরে এসেছি কেবল। দেখার জন্যই গিয়েছিলাম। আর কিছু নয়।’
‘তা আমরা জানি না।’ বলল অমি। ‘সেখানে আমরা যাবোই। ব্যস!’
‘তাহলে দেরি কেন? এখনই চল।’ বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো সানজিদা। যেন এখনই যেতে প্রস্তুত।
‘দাঁড়া দাঁড়া!’ বাঁধা দিলো নিলয়। ‘এখনই যাবি মানে কি? মাত্র সকাল হলো, নাস্তা করাও হয়নি। একটু রয়ে সয়ে তো যাওয়া যায়।’
‘নিলয় ঠিকই বলেছে,’ একমত হলো সাদ। ‘বাড়িটা তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না। আমরা যখন তখন সে জায়গায় যেতে পারি। ঘুরতেই তো এসেছি। ঘুরে ফিরে দেখবো। সাদ আর নিলয়ের সম্মতি না পেয়ে অমির দিকে তাকালো সানজিদা। অমি বললে কেউ মানা করতে পারবে না। কিন্তু অমিও যেন সাদ আর নিলয়ের সাথে একমত। কাউকে নিজের পক্ষে না পেয়ে দমে গেলো সানজিদা। ধপ করে নিজের চেয়ারে বসে পড়ল।
‘আর তাছাড়া,’ বলল সাদ। ‘রিফাত যদি জানতে পারে আমরা সবাই খাওয়া দাওয়া না করে রহস্য খুঁজতে গেছি, তাহলে হয়ত আমাদেরই চিবিয়ে খাবে।’ সাদের কথা শুনে হো হো করে হাঁসতে লাগল সবাই। মন খারাপ করে থাকা সানজিদাও সব ভুলে হাঁসিতে পেতে উঠল।
সাকিব আহমেদের গল্প “অনলাইন এক্সাম”
‘কি ব্যাপার? আমাকে ছাড়া এতো হাসি কিসের?’ বলল রিফাত। ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এসেছে।
‘কিছু না।’ সামলে নিয়ে বলল অমি। ‘তোর কথাই বলছিলাম।’
‘আমার কথা?’ ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল রিফাত। ‘তো আমার কথা বলতে এতো হাসি কেন?’
কিছু বলতে যাচ্ছিল অমি। তাকে বাঁধা দিয়ে সাদ বলল, ‘ও কিছু না। সবাই তোর জন্য অপেক্ষা করছে। কেউ নাস্তা করে নাই। আমি বলছিলাম, তোকে ছাড়া নাস্তা করলে তুই মাইন্ড করবি।’
‘তা তো করবোই।’ বলল রিফাত। ‘আমাকে ছাড়া খাওয়া দাওয়া করলে খবর আছে না?’
‘সেটাই তো বলছিলাম ওদের।’ বলে অমির দিকে ফিরল। ‘এভাবে ইনভাইট করে নিয়ে এসে না খাওয়াইয়ে রাখবি আমাদের?’
‘জ্বি, অবশ্যই।’ জবাব দিলো অমি। ‘এত খেয়ে খেয়ে তো স্বাস্থ্য বানাচ্ছিস। এবার একটু ডায়েট কর।’
‘না ম্যাডাম,’ সাদের পক্ষ থেকে জবাব দিলো রিফাত। ‘জীবনে খাওয়াই আসল। খাওয়া ছাড়া কি আছে জীবনে? এই পেটপুজো না করলে জীবনে কিছুই ঠিক থাকে না।’ পেটে হাত বুলাতে বুলাতে এমনভাবে কথাগুলো বলল রিফাত, সবাই হেসে ফেলল।
‘আচ্ছা ঠিক আছে,’ হাসতে হাসতে বলল অমি। ‘তোরা ভিতরে আয়। আমি মতিন চাচাকে বলি নাস্তার ব্যবস্থা করতে।’ বলেই বাড়ির অন্দরমহলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো অমি। ওকে অনুসরণ করল সবাই। হাসছে, গল্প করছে – এভাবেই বেখেয়ালে হাঁটছে ওরা।
এমন সময় সাদের ফোন বেজে উঠল। জিন্সের পকেট থেকে ফোন বের করে দেখল, স্ক্রিনে বিপুলের নাম ভেসে উঠেছে। সবাইকে সামনে এগিয়ে যেতে বলে ফোন রিসিভ করল সাদ।
চলবে…
পেপারস লাইফ/গল্প/সাকিব আহমেদ
পড়ুন:

