(অষ্টম পর্বের পর)
মতিন চাচাকে দৌড়ে আসতে দেখা যাচ্ছে। ‘তোমরা ঠিক আছো তো বাবারা?’ জিজ্ঞেস করল মতিন চাচা। ‘ভয় পাও নি তো?’
কি বলবে ওরা? ভয় পাওয়ার কথা তো আর বলা যায় না! তবে পড়া যতটুকু ভয় পেয়েছে, তার চেয়ে বেশি চমকে উঠেছে। না-সূচক মাথা নাড়িয়ে ওরা জানালো যে ভয় পায়নি।
‘চাচা,’ জিজ্ঞেস করল রিফাত। ‘কিসের আওয়াজ ছিল এটা?’
‘ও কিছু না বাবা,’ জবাব দিলো মতিন চাচা। ‘এখানে কখন কি হয় বলা যায় না।’
‘মানে?’ সবাই একসাথে জিজ্ঞেস করল।
মতিন চাচা জানালো, শহর থেকে একদল ব্যবসায়ী এসেছে এখানে ব্যবসা করতে। একটা ফ্যাক্টরি গড়ে তুলেছে। গ্রামের শেষপ্রান্তে একটা পরিত্যক্ত বাড়ি আছে, সেখানে তৈরি করেছে সে ফ্যাক্টরি। বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকা সেই বাড়িটি নতুন করে সাজিয়েছে। সেখানে কি কাজ হয়, কেউ জানে না। ঐখান থেকেই মাঝে মাঝে এমন বিকট আওয়াজ হয়।
‘প্রথম প্রথম এই আওয়াজে বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠত।’ বলল মতিন চাচা। ‘এখন অবশ্য অভ্যাস হয়ে গিয়েছে।’
‘তাই বলে এত জোরে শব্দ!’ বলল সানজিদা।
‘কি কাজ করে যে এমন শব্দ হয়?’ নিলয়ের প্রশ্ন।
‘তোমরা কিছু বলো নি?’ জিজ্ঞেস করল অমি।
‘বলে নি আবার!’ বলল মতিন চাচা। ‘গ্রামের কয়েকজন মুরুব্বি মিলে এর বিরুদ্ধে নালিশ জানিয়েছিল। কাজের কাজ কিছু হয়নি।’
‘কেন?’ রিফাত জিজ্ঞেস করল।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল মতিন চাচা। বলল, ‘বাবা, যাদের টাকা আছে তাদের বিরুদ্ধে আমাদের ছোট্ট গ্রামের গরিব মানুষেরা কি করতে পারে? ওদের প্রচুর টাকা। সেই টাকা দিয়ে সব কিনে নিয়েছে। তাই পুলিশও কিছু বলে না।’
‘কিন্তু, এভাবে পুরো গ্রামবাসীর অসুবিধা করে তো কোনো কাজ চলতে পারে না!’ অবাক হলো অমি।
‘কিছু করার নেই মা।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল মতিন চাচা। ‘সন্ধ্যা হয়ে গেছে, বাসায় চলো তোমরা। তোমাদের চাচী অপেক্ষা করছে তোমাদের সাথে দেখা করার জন্য।’
‘চাচা,’ এতক্ষণ পর মুখ খুলল সাদ। ‘ফ্যাক্টরিটা কোনদিক?’ জিজ্ঞেস করল সে।
আঙুল তুলে উত্তর দিকের পথ দেখালো মতিন চাচা। চাচার পাশে হাঁটতে হাঁটতে সাদ জিজ্ঞেস করল, ‘ঐদিকে যাওয়া যায় কীভাবে?’
‘তুই জেনে কি করবি?’ মতিন চাচা কিছু বলার আগেই বলে উঠল অমি।
‘কিছু না।’ বলল সাদ। ‘এমনি জানতে চাইলাম।’ সাদ যে এমনি জানতে চায়নি বন্ধুরা বেশ ভালো করেই জানে। নিশ্চয়ই মাথায় কিছু ঘুরছে। মতিন চাচার দিকে সাদ আবার জিজ্ঞেস করল, ‘কিভাবে যাওয়া যাবে ফ্যাক্টরিটার কাছে? দূরে, না কাছে?’
‘একটু তো দূরে আছেই।’ মেরিন চাচা বলল। ‘মেইনরোড দিয়ে গেলে আধা ঘন্টার মতো লাগে। তবে পুকুরের পাশ ঘেঁষে পায়ে হাঁটা একটা শর্টকাট রাস্তা আছে। সেখানে দিয়ে গেলে দশ মিনিট লাগবে।’
কথা বলতে বলতে বাড়ির সামনে এসে পড়ল ওরা। গেটের সামনে শাড়ি পরা এক মহিলাকে দেখা যাচ্ছে। ইনিই নিশ্চয়ই চাচী। জানা গেল, তার নাম জুলেখা। অমি জুলেখা চাচী বলে ডাকে। চাচীর গায়ের রঙ শ্যামলা হলেও মুখের হাসি চেহারার মধ্যে এক অন্যরকম মায়া সৃষ্টি করে। সেই হাসিমাখা মুখে ছেলেমেয়েদের আমন্ত্রণ জানালো জুলেখা চাচী। চাচীর মুখে সারাক্ষণ হাসি লেগেই আছে। এই হাসিখুশি প্রাণবন্ত মানুষটাকে ভালো লাগতে বেশি সময় লাগল না। খুব অল্পতেই তাকে পছন্দ করে ফেলল ছেলেমেয়েরা।
সন্ধ্যা থেকে পুরোটা সময় ছেলেমেয়েদের সাথে ছিল সে। আপ্যায়নে কোনো ত্রুটি রাখলনা। সন্ধ্যার দিকে কফি সাথে ডালপুরি, যেন এক অমৃত। রাতের বেলা ভুনা খাসির মাংস খাওয়ার পর স্বাদ যেন মুখে লেগে থাকে। মন থেকে জুলেখা চাচীর রান্নার প্রশংসা করল সবাই। এত এত প্রশংসা শুনে লজ্জায় লাল হয়ে গেল চাচী।
‘হয়েছে, এত প্রশংসা করতে হবে না।’ বলল চাচী। ‘এ আর এমন কি!’
খাওয়া দাওয়া শেষে ড্রয়িংরুমে আড্ডায় বসল সবাই। সাদ আর নিলয় বসল দাবা খেলতে। দুইজনই অসাধারণ দাবা খেলে। কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। ওরা খেলছে আর বাকিরা বাইরে থেকে পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করছে। প্রথম ম্যাচ সাদ জিতলেও, দ্বিতীয়টা নিলয় জিতে গেল।
তৃতীয়বার খেলার জন্য প্রস্তুত নেওয়ার সাথে সাথে অমি ঘোষণা করল আজকের মতো খেলা শেষ। কারণ ততক্ষণে রাত একটা বেজে গেছে। এখন আবার খেলা শুরু করলে শেষ হতে অনেকক্ষণ লাগবে। আরেকটা ম্যাচ খেলতে চাইলেও নাছোড়বান্দা অমিকে মানানো যায় নি। এক প্রকার জোর করেই সবাইকে ঘুমাতে পাঠাল অমি।
সাদ, রিফাত আর নিলয় নিজের রুমে এসে ঢুকল। বন্ধুদের গুড নাইট বলে বিদায় নিলো সানজিদা ও অমি।
বিছানায় এসে বসল সাদ। জানালার পাশের বিছানা দখল করে নিয়েছে আগেই। আশাপাশে খোলামেলা তাই এখান থেকে দুরের পথ দেখা যায়। মতিন চাচার দেখানো ফ্যাক্টরির পথ এখান দিয়েই। দূর দিগন্তে ফ্যাক্টরির পথ খুঁজতে খুঁজতে ঘুমিয়ে পড়ল সাদ।
চলবে…
পেপারস লাইফ/গল্প/সাকিব আহমেদ
পড়ুন:

