(নবম পর্বের পর) …
সানজিদার ভার্সিটির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আমিনুল হক। কি করবেন ভাবছেন? ভিতরে যাবেন? যেয়ে কি করবেন, কি বলবেন? সেই চিন্তায় সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। পুলিশের কাছে যেয়ে এক তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। ভার্সিটির কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এমন কোনো অভিজ্ঞতা হলে সহ্য করবেন কি করে? তিনি সব সহ্য করতে পারেন, কিন্তু তার ছেলে-মেয়েকে নিয়ে কেউ কিছু বললে সহ্য করতে পারেন না! অথচ কি অদ্ভুত! নিজের ছেলেমেয়েরাই তার উপর ভরসা রাখতে পারেনি। তার কথার অবাধ্য হয়ে কাউকে কিছু না জানিয়ে ঘুরতে চলে গেলো!
সব সংকোচ ঝেড়ে দিয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন, ভার্সিটি যেয়ে খোঁজ নিবেন। সানজিদার বন্ধুদের খবর জানবেন। যে করেই হোক, মেয়েকে খুঁজে বের করবেন।
‘আরে আঙ্কেল! আপনি এখানে?’ পিছন থেকে এক অপরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে ফিরে তাকালেন আমিনুল হক। তার মেয়ের বয়সী এক ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।
‘ভালো আছেন আঙ্কেল?’ ছেলেটি আবার বলল। ‘আমাকে চিনতে পেরেছেন?’ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছেন সানজিদার বাবা। দেখেই বুঝা যাচ্ছে, ছেলেটাকে চিনতে পারেননি তিনি।
‘তোমাকে তো চিনতে পারলাম না।’ কোনোমতে বললেন তিনি। ‘তুমি কি এই ভার্সিটিতে পড়ো?’ জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
‘আমি শুধু এই ভার্সিটিতেই না,’ বলল ছেলেটি। ‘সানজিদার সাথে একই ব্যাচে পড়ি। অনেকদিন আগে আপনাদের বাসায় গিয়েছিলাম, মনে নেই আপনার?’
আমিনুল হকের মনে পড়ছে না কিছুই। ছেলেটিকে আগে দেখেছে কিনা তাও মনে করতে পারছে না। শুধু এতটুকু বুঝতে পারছে, এই ছেলেটি হয়ত তার কাছে আশীর্বাদ হিসেবে ধরা দিয়েছে। হয়ত তার মাধ্যমেই মেয়েকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে।
‘না বাবা।’ বললেন আমিনুল হক। ‘তোমাকে তো ঠিক চিনতে পারছি না। হয়ত দেখেছি, কিন্তু মনে পড়ছে না।’ একটু থেমে আবার বললেন, ‘আমার একটা সাহায্য করতে পারবে?’
‘জ্বি আঙ্কেল!’ বলল ছেলেটা। ‘কি সাহায্য লাগবে বলুন। আমি চেষ্টা করব সবরকম সাহায্য করার।’
‘ধন্যবাদ বাবা। তোমার নামটা কি যেন?’ জিজ্ঞেস করলেন সানজিদার বাবা।
‘বিপুল।’ জবাব দিলো ছেলেটা।
‘আমরা কোথাও যেয়ে বসে কথা বলি?’ বললেন আমিনুল হক।
‘জ্বি আঙ্কেল,’ বলল বিপুল। একটু থেমে বলল, ‘আঙ্কেল, আমার ভার্সিটিতে একটু কাজ আছে। আপনি ক্যাফেটেরিয়ায় দশ মিনিট বসেন। আমি কাজ সেরে আসছি।’
সানজিদার বাবাকে নিয়ে ক্যাফেটেরিয়ায় গেলো বিপুল। তাকে বসিয়ে রেখে নিজের কাজ সারতে গেলো। যাওয়ার আগে বলল, ‘আপনি একটু অপেক্ষা করেন। আমি এই যাবো আর আসবো।’
নীরবে চুপচাপ অপেক্ষা করতে লাগলো সানজিদার বাবা। মনে মনে গুছিয়ে নিলো কিভাবে কি বলবে বিপুলকে।
সাকিব আহমেদের গল্প “অনলাইন এক্সাম”
সকাল হয়ে গিয়েছে। পুব দিগন্তে সূর্য যেন মুচকি হাসি দিয়ে উঁকি দিচ্ছে। সকালের রোদের তেজ চোখে লাগতেই ঘুম ভেঙে গেলো নিলয়ের। চোখ পিটপিট করে তাকালো। আড়মোড়া ভেঙে বিছানায় উঠে বসল। পাশের বিছানায় বেঘোরে ঘুমোচ্ছে রিফাত। নাক ডাকার শব্দ কানে আসছে। রিফাত যেমন ভোজন রসিক, ঠিক তেমনই ঘুম কাতুরে। এই ঘুমের জন্য ভার্সিটির কত শত ক্লাস মিস হয়েছে রিফাতের তার হিসাব নাই।
রিফাতের দিকে তাকিয়ে হাসল নিলয়। ঘুমোক ছেলেটা। রিফাতের দিক থেকে ফিরে সাদের বিছানার দিকে তাকালো। সেখানে সাদকে পাওয়া গেলো না। আগেই উঠে পড়েছে সাদ। রিফাত যেমন ঘুম কাতুরে, সাদ পুরোপুরি তার বিপরীত। সবসময় সকাল সকাল উঠে। কোনোদিনও এর ব্যতিক্রম হয় না। এই ছুটির দিন একটু আরাম আয়েশে ঘুমোবে, তা না! এখানেও সকাল সকাল উঠে পড়া।
কিন্তু কোথায় গেলো সাদ? ওয়াশরুমে নয়তো? বিছানা থেকে উঠে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল নিলয়। নাহ! ওয়াশরুমে নেই। দরজা বাইরে দিয়ে লাগানো। তাহলে গেলো কোথায়? নিশ্চয়ই বাগানে। সাদ তো আমার প্রকৃতপ্রেমী। এমন প্রকৃতির মাঝে সেই বোধহয় সবচেয়ে খুশি। আপন মনে হাসল নিলয়। থাকুক সে, তার মতোই। ফ্রেশ হয়ে সাদকে খুঁজতে যাওয়া যাবে।
ওয়াশরুম থেকে বের হয়েই দেখল সাদ ঘরে ধুকছে। মাথায় ক্যাপ, গায়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জার্সি, ট্রাউজার ও কেডস পরা দেখে নিলয় বুঝতে পারলো বাইরে গিয়েছিলো সাদ। কেডসের তলায় মাটি লেগে আছে, লক্ষ্য করল নিলয়।
‘কোথায় গিয়েছিলি?’ সাদকে জিজ্ঞেস করল নিলয়।
‘কোথাও না,’ জবাব দিলো সাদ। ‘একটু বাইরে হাঁটতে বের হয়েছিলাম। অনেক বছর পর গ্রামে আসলাম। গ্রামের সকালটা দেখতে কেমন হয়, ঠিক আগের মতো আছে কিনা তাই জানতে বের হয়েছিলাম।’
সাদের উত্তরটা মনে ধরল না নিলয়ের। কেমন যেন সন্দেহের চোখে চেয়ে আছে। তা বুঝতে পেরে সাদ বলল, ‘এভাবে কি দেখছিস? বিশ্বাস কর আমি হাঁটতেই বের হয়েছিলাম। সত্যি বলছি।’
‘তুই সেই বাড়ি দেখতে গিয়েছিলি,’ বলল রিফাত। ‘তাই না।’ চোখ বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে আছে রিফাত। এখনও যে সে ঘুমিয়ে নেই, তা তার কণ্ঠ শুনেই বোঝা যাচ্ছে।
‘তুই উঠলি কখন?’ জিজ্ঞেস করল সাদ।
সাদের জিজ্ঞাসা শুনে উঠে বসল রিফাত। বড় একটা হাই তুলে আড়মোড়া ভাঙল। বলল, ‘তোদের কথা শুনে ঘুম ভেঙে গেছে।’ তারপর সাদকে বলল, ‘আমার প্রশ্নের উত্তর দিলি না তুই। সেই বাড়িতে গিয়েছিলি, কাল যেখানে শব্দ হয়েছিল?’
আমতা আমতা করে সাদ জবাব দিলো, ‘হ্যাঁ, গিয়েছিলাম। তবে দেখতে। কিছু করতে না। আমি সত্যিই হাঁটতে বের হয়েছিলাম। ভাবলাম দেখে আসি।’
‘কি দেখলি সেখানে গিয়ে?’ জিজ্ঞেস করল রিফাত।
‘কিছুই না। বড় বড় দেয়ালে ঘেরা। ভিতরের কিছু দেখা যায় না। দেখে পরিত্যক্ত বাড়িই মনে হয়। কিন্তু সেখানে কি কাজ হচ্ছে তা একটা রহস্য। আমার তো মনে হয়, কিছু অনৈতিক কাজ হচ্ছে। এমন বাড়ি ক্রাইম করার আখড়া।’ জবাব দিলো সাদ। তারপর রিফাতকে জিজ্ঞেস করল, ‘কিন্তু তুই কি করে বুঝলি আমি সেখানে গিয়েছিলাম?’
‘তোর ট্রাউজারে মাটি লেগে আছে।’ জবাব দিলো রিফাত। ‘মতিন চাচা ওই বাড়িতে যাওয়ার জন্য যেই রাস্তা দেখিয়েছিলো, সেখানে এমন লাল মাটি দেখেছি। এছাড়া গ্রামের আর কোথাও এমন মাটি দেখিনি।’
সাকিব আহমেদের গল্প “বিজয়োল্লাস”
সাদ নিজের সাদা ট্রাউজারে চেয়ে দেখল, সত্যিই তো! কেমন লাল লাল মাটি লেগে আছে। এমন মাটি গ্রামের অন্য জায়গায় দেখেনি। এমনকি ওই রহস্যজনক বাড়িতে যাওয়ার সময়ও এমন লাল মাটি চোখে পড়েনি। নজর এড়িয়ে গেছে।
তবে রিফাতের অবজারভেশন পাওয়ার দেখে মুগ্ধ সাদ। রিফাতকে বলল, ‘বাহ! গোয়েন্দাদের মতো নজর হয়ে গেছে তোর! আয়্যাম ইম্প্রেসড।’
‘এর সব কৃতিত্ব যে তোর।’ হেসে বলল রিফাত। ‘তোর দেওয়া তিন গোয়েন্দা, মাসুদ রানা, ফেলুদা, কাকাবাবু পড়ে এখন নিজেকে গোয়েন্দা গোয়েন্দা লাগে।’
কিছু বলতে যাচ্ছিল সাদ। তাকে থামিয়ে দিলো নিলয়, ‘হয়েছে। এসব গোয়েন্দা-রহস্যের কথা বাদ দিয়ে এখন ফ্রেশ হয়ে আয়। অমি, সানজিদা মনে হয় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।’
ঠিকই বলেছে নিলয়। এখন সকাল নয়টা বেজে গেছে। নিশ্চয় নাস্তা না করে ওরা বসে আছে। ওদের অপেক্ষা করানো যায় না। এক এক করে সাদ আর রিফাত ওয়াশরুমে গেলো ফ্রেশ হয়ে নিতে। নিলয় নিচে নেমে এলো অমি আর সানজিদাকে খুঁজতে।
চলবে…
পেপারস লাইফ/গল্প/সাকিব আহমেদ
পড়ুন:

