এক কোণে ছোট্ট দেয়ালটার উপর বসে আছে পারভেজ। পারভেজকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে ডজনখানেক মানুষ। কারো হাতে ব্যাট, কারো হাতে স্ট্যাম্প। না, সেখানে কোনও গুরুত্বপূর্ণ মিটিং হচ্ছে না। বা কারো হাত-পা ভাঙতে হবে, এমন কোনও প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে না। পারভেজ দেয়ালের উপর বসে টেনিস বল-এ টেপ প্যাঁচাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর খেলা শুরু হবে।
এই তল্লাটে পারভেজের চেয়ে ভালো কেউ বল-এ টেপ প্যাঁচাতে পারে না। তাই পারভেজ যখন টেপ প্যাঁচাতে থাকে, অনেকেই দেখে শিখতে চায়। কারো আর শেখা হয়ে উঠে না। চাইলেও পারভেজের মতো টেপ প্যাঁচানো সম্ভব না!
পারভেজকে অবশ্য সবসময় পাওয়া যায় না। খুব ব্যস্ততায় দিন পর হয় তার। দিনের বেলায় ভার্সিটিতে সময় কাটে, সন্ধ্যা থেকে টিউশনি। এর মাঝে খেলার জন্য সময় বের করা কঠিন। ছুটির দিনগুলোই কেবল ভরসা। সেদিনই এলাকার ভাই-ব্রাদারদের সাথে দেখা হয়, আড্ডা হয়, খেলা হয়।
আজ অবশ্য ছুটির দিন না! তারপরও এসেছে পারভেজ। ভার্সিটি থেকে ফিরে খাওয়া দাওয়া করেই খেলতে চলে এসেছে। আগে ভার্সিটি থেকে বাসায় এসে ঘুমিয়ে পড়ত। না হলে যে সন্ধ্যায় টিউশনিতে ক্লান্ত লাগত। বেশকিছু দিন ধরার পারভেজ ঘুমোয় না। ছুটির দিন ছাড়াও মাঝে মাঝে খেলতে চলে আসে। তার অবশ্য কারণ আছে।
সেদিন শুক্রবার খেলতে এসেছিল সে। যেখানে দাঁড়িয়ে ফিল্ডিং করছিল, তার উল্টো দিকে এক বিল্ডিং আছে। তিন তলার বেলকনিতে একজনকে দেখে চোখ আটকে যায়। মেয়েটিকে প্রথম দেখায় ভালো লেগে যায় পারভেজের। যাকে বলে, লাভ এতো ফার্স্ট সাইট।
পারভেজরা যেখানে খেলে তাকে মাঠ বলা যায় না কিছুতেই। আশেপাশে বেশকিছু বিল্ডিং। এর মাঝে ছোট্ট এক জায়গা! বিকেল হলে সেখানেই খেলতে নেমে যায় জনা পনেরো ক্রিকেটার। পাড়ার ক্রিকেটে আর কিইবা করার আছে। খেলার মাঠের বড্ড অভাব। তাই এমন খালি জায়গা পেলেই খেলতে শুরু করা বাংলাদেশের জন্য খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।
তো যাই হোক! মেয়েটিকে দেখে এতোই ভালো লেগে গিয়েছে পারভেজের, তার টানেই বারবার খেলতে আসা। পারভেজ যতবার খেলতে এসেছে, ততবারই মেয়েটিকে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে খেলা দেখতে দেখেছে। খুব আগ্রহ নিয়ে খেলা দেখে মেয়েটা। খেলার প্রতি মেয়েটার আগ্রহ পারভেজকে বেশি আকৃষ্ট করে।
পারভেজ নিতান্তই খারাপ খেলে না। শেষ দিকে বেশিরভাগ সময় খেলা ঘুরিয়ে দেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে তার! ব্যাট হাতে কিংবা বল দিয়ে, যেকোনো সময়ই হারা ম্যাচ জিতিয়ে দিতে পারে পারভেজ। আর সে কারণেই এলাকার খেলায় পারভেজের কদর বেশি।
দুই দিন আগের ঘটন… শেষ মুহূর্তে যখন পারভেজের দল হারছিল, হঠাৎই ব্যাট হাতে দৃশ্যপটে পারভেজ। টানা চারটা চার মেরে ম্যাচ জিতিয়ে দিয়ে দিলো। তার এমন খেলার পর উপরের বেলকনি থেকে হাত তালির শব্দ। উপরে তাকিয়ে দেখে মেয়েটা খুশি মনে হাত তালি দিচ্ছে। পারভেজের দুর্দান্ত খেলায় অভিবাদন জানাচ্ছে।
সাকিব আহমেদের গল্প “আবার নয়নরাঙা”
এর পর থেকেই পারভেজের মাঝে আরও ভালো খেলার স্পৃহা জেগে উঠে। পাড়ার খেলায় হিরো সবাই হতে চায়। আর কোনও মেয়ের সামনে হিরো হওয়ার সুযোগ থাকলে তো কথাই নেই।
আজ অবশ্য হিরো হতে পারেনি পারভেজ। শেষ চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সফল হয়নি। এক লিটার কোকের বাজি হেরেছে শেষ বলে। তিন ম্যাচের সিরিজের প্রথম ম্যাচ জিতেছে খুব সহজেই। কিন্তু হেরে বসে দ্বিতীয় ম্যাচ। তাই তৃতীয় ম্যাচ সিরিজ জয়ের ম্যাচ হয়ে দাঁড়ায়। লড়াইটা সমানে সমানে করে দুই দল। শেষ বলে জিততে তিন রান দরকার ছিল পারভেজের। চার মারলেই হয়ে যেতো। কিন্তু পারেনি সে। দুর্দান্ত ফিল্ডিংয়ে ঠেকিয়ে দেয় প্রলয়। এলাকার সেরা ফিল্ডার হিসেবে সে সুপরিচিত।
ম্যাচ হেরে লজ্জায় উপরে তাকাতে পারছিল না। তবে আশেপাশের বাড়ি থেকে সাবাসি মিলল পারভেজের। শেষ চেষ্টা যে সে করেছিল! খেলা চলাকালীন অনেকেই তাদের নিজ নিজ বাড়ির বারান্দা, কিংবা ছাদে দাঁড়িয়ে খেলা উপভোগ করে। তাই এসব এলাকার ছেলেদের জন্য ডাল ভাত। তারাও সেসব বারান্দা, বেলকনি বা ছাদকে গ্যালারী মনে করেই খেলতে থাকে।
প্রতিপক্ষ যখন জয়ের সেলিব্রেশন করছিলো, তখন সেখান থেকে প্রলয়কে আলাদা করে ডেকে আনলো পারভেজ।
‘হ্যাঁ ভাইয়া, বলো।’ বলল প্রলয়। প্রলয় সেই বাসাতেই থাকে যেখানে ওই মেয়েটা থাকে। প্রলয়রা দ্বিতীয় তলায় আর মেয়েটি তৃতীয়। প্রলয় হয়ত মেয়েটির বিষয় বলতে পারবে। তাই তাকে আলাদা করে ডেকে আনা!
‘আচ্ছা প্রলয়,’ বলল পারভেজ। ‘একটা কথা বলতে পারবি?’
‘তোদের বাসার তিন তলায় যেই মেয়েটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলা দেখে,’ বলল পারভেজ। ‘সে কে? অনেকদিন ধরেই দেখছি সে এভাবে খেলা দেখে। খেলায় বোধহয় খুব ইন্টারেস্ট?’
‘ও, রিয়া আপু?’ বলল প্রলয়। ‘হ্যাঁ, আপু ক্রিকেট খেলা খুব পছন্দ করে। বাংলাদেশের খেলার সময় আমি আপুর সাথে মিলে খেলা দেখি।’
‘তাই, ভালো ভালো!’ বলল পারভেজ। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘কি করে তোমার রিয়া আপু?’
‘এই তো,’ জবাব দিলো প্রলয়। ‘মাত্র কলেজে উঠল, সাইন্সে। কিন্তু তুমি এতো কিছু জিজ্ঞেস করছ কেন?’
‘না, এমনিতেই। কৌতূহল জাস্ট। একটা মেয়েকে এভাবে আগ্রহ নিয়ে খেলা দেখতে দেখি তো, তাই!’
‘ঠিকই। আপুর খেলার খুব আগ্রহ। খুব মনোযোগ দিয়ে দেখে ক্রিকেট। সেদিন তোমার প্রশংসা করল খুব।’
‘আমার প্রশংসা?’ অবাক হলো পারভেজ। মনে মনে খুশিও লাগছে। জিজ্ঞেস করল, ‘কি প্রশংসা করল আমার?’
‘তুমি অনেক ভালো খেলো।’ জবাব দিলো প্রলয়। ‘সেদিন যেভাবে ম্যাচ জেতালে, সেই খেলার খুব প্রশংসা করেছে।’
পারভেজের প্রশংসা করেছে, শুনেই মনটা খুশিতে ভরে উঠল। আজকের হারের দুঃখটাও যেন আর নেই। প্রলয়কে বিদায় দিয়ে বাসার দিকে ফিরছে পারভেজ। ফেরার আগে প্রলয়কে বলল, ‘আমি তো টিউশনি করি জানিস। তোর রিয়া আপুর প্রাইভেট টিউটর লাগলে বলিস। সাইন্সের সব সাবজেক্ট পড়াতে পারব।’
বাসায় ফেরার পথে একটি হাসিই চোখে ভাসছে। মনের কোণে একটিই নাম – রিয়া!
সাকিব আহমেদের গল্প “স্ক্রিনের আলোয় পড়াশোনা”
দুই দিন খেলার মাঠে যেতে পারেনি পারভেজ। ভার্সিটিতে খুব চাপ ছিল। এসাইনমেন্ট, ক্লাস টেস্ট, প্রেজেন্টেশন, ভাইবা মিলিয়ে যাচ্ছে তাই অবস্থা। সব সামাল দিয়ে সময় হয়ে উঠেনি খেলতে আসার!
দুই দিন পর খেলার মাঠে এসে পারভেজ দেখল, আজকের খেলা শুরু হয়ে গিয়েছে। এক ম্যাচ বসে থাকতে হবে। এই খেলা শেষ হলে পরের খেলার জন্য ডাক পড়বে।
কি আর করার! যেহেতু বসেই থাকতে হবে। মাঠের কোণের ছোট্ট ভাঙা দেয়ালটাতে বসে পড়ল। এখান থেকে তিন তলায় রিয়াদের বারান্দা দেখা যায়। যথারীতি সেখানে রিয়াকে দাড়িয়ে থাকতে দেখল। আড়চোখে বারবার উপরে তাকিয়ে দেখছে। আজ রিয়াকে সুন্দর লাগছে। দূর থেকে বোঝা না গেলেও, রিয়ার মুখে হাসি লক্ষ্য করল পারভেজ।
আগেও কি এভাবে হাসত সে? কোনোদিন অবশ্য এভাবে লক্ষ্য করা হয়নি। উপরে তাকিয়ে ছিল পারভেজ। লক্ষ্য করল, রিয়াও তাকিয়ে আছে। চোখ নামিয়ে ফেলল পারভেজ?
রিয়া কি বুঝে ফেলল পারভেজ উপরে তার দিকে তাকিয়ে ছিল? কি ভাববে মেয়েটা? লজ্জায় চোখ উপরে তুলতে পারছে না পারভেজ। তবে একটা বিষয় অনুভব করতে পারছে, রিয়া অর দিকে তাকিয়ে আছে। সত্যিই কি তাই? তা দেখার অবশ্য কোনও সাহস নেই পারভেজের।
খেলা দেখায় মন দিলো পারভেজ। প্রলয় মাত্র আউট হয়ে ফিরছে। আউট হয়ে পারভেজের পাশে এসে বসল।
‘দুইদিন আসোনি কেন, ভাইয়া?’ কিছুক্ষণ পর জিজ্ঞেস করল প্রলয়।
‘আর বলিস না,’ বলল পারভেজ। ‘ভার্সিটিতে খুব চাপ ছিল, সময় পাইনি একদম।’
‘রিয়া আপু তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিলো।’ বলল প্রলয়।
আমার কথা! বেশ অবাক হলো পারভেজ। হঠাৎ অর কথা জিজ্ঞেস করেছিলো কেন? কি কথা জিজ্ঞেস করেছিলো? জিজ্ঞেস করল প্রলয়কে।
‘তেমন কিছু না,’ বলল প্রলয়। ‘তুমি দুইদিন আসো না, তাই খোঁজ নিচ্ছিলো। আসলে আমাদের এখানে খেলে, এমন কেউ বেশ কিছুদিন না এলেই আপু জিজ্ঞেস করে।’
‘ওহ আচ্ছা।’ বলে চুপ হয়ে গেলো পারভেজ। ভেবেছিলো বিশেষ কিছু হয়ত! এসব ভাবনা মাথায় আনার কারণে নিজেকে মনে মনে বকা দিলো পারভেজ। যেই মেয়ে তাকে চেনে না, জানে না – সে তাকে নিয়ে কি ভাববে আর!
‘ভাইয়া, তুমি শুক্রবার ফ্রি আছো?’ জিজ্ঞেস করল প্রলয়।
‘শুক্রবার তো কোনও কাজ নেই। ফ্রি-ই থাকি।’ বলল পারভেজ। ‘কেন, বলতো?’
‘নাহ, ওইদিন পাশের এলাকার রনি ভাইয়ের সাথে দেখা হয়েছিল।’ জানালো প্রলয়। ‘উনি আমাদের সাথে বাজি খেলতে চায়। তুমি যদি সময় দাও তাহলে তাকে বাজির কথা বলতে পারি।’ এই বলে থামল প্রলয়। কি যেন ভাবছে পারভেজ। তারপর রাজী হয়ে গেলো! শুক্রবার এমনিতেই তার কোনও কাজ নেই। খেলতেই আসতে হবে যেহেতু, বাজি খেলতে ক্ষতি নেই।
সাকিব আহমেদের গল্প “অনলাইন এক্সাম”
দেখতে দেখতে শুক্রবার চলে এলো। জুম্মার নামাজ শেষ করে খেলার প্রস্তুতি নিতে থাকলো পারভেজ। এ যে শুধু খেলা নয়, পাড়ার সম্মানের প্রশ্ন।
পাশের পাড়ার সাথে পারভেজদের রেষারেষি বেশ পুরনো। বিশেষ করে ক্রিকেট কিংবা ফুটবল, কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। এমন পরিস্থিতিতে হারলে মান সম্মান চলে যাবে। পারভেজের যতটা না এ নিয়ে চিন্তা, তার চেয়ে বেশি চিন্তিত রনি।
দুই পাড়ার দুই সেরা খেলোয়াড়ের একজন রনি, আরেকজন পারভেজ। সেরা খেলোয়াড় হওয়ার পরও আশেপাশের সব পাড়ায় পারভেজের মূল্য বেশি। তার একটাই কারণ, পারভেজের খেলা শেষ করে আসার দক্ষতা। যেকোনো জায়গায়, যেকোনো পরিস্থিতিতে ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারে পারভেজ। হারা ম্যাচ জিতিয়ে দিতে পারে। তাই ভালো খেলার পরও রনির চেয়ে পারভেজকে নিয়ে চর্চা বেশি হয়।
এসব সহ্য করতে পারেনা রনি। হিংসার জায়গাটা এখানেই। তাই আজ যে করেই হোক জিততেই হবে, ভাবল রনি। পারভেজ অবশ্য এসব ভাবনার ধার ধারে না। মাঠে যে ভালো খেলবে সেই জিতবে। শুধু মাঠেই ভালো খেলতে চায় পারভেজ।
বর্তমান সময়ে মাঠের খুব সংকট। তাই পারভেজদের খেলার জায়গাতেই এ লড়াই হবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সময়ের অনেক আগেই চলে এসেছে পারভেজের দল। নিজেদের ঝালিয়ে নিতে হবে। অনেকদিন সবাই একসাথে খেলে না। এ থাকলে ও থাকেনা, সে থাকলে তিনি থাকেন না। তাই সবাই মিলে এক হয়ে খেলার জন্য আগে চলে এসেছে।
যথাসময়ে রনির দলও চলে এসেছে। কি করে যেন, এলাকার প্রায় সবাই জেনে গেছে আজ এখানে ক্রিকেট নামের যুদ্ধ হবে। তাই আশেপাশের সবগুলো বাড়ির বারান্দায় লোকজনের সমাগম। ছাদগুলো খালি নেই। এমনকি বাইরে থেকেও অনেকে এসেছে খেলা দেখতে। মাঠের চারিপাশে ভিড় জমিয়েছে। তিন তলার বারান্দায় যথারীতি রিয়াকে দাড়িয়ে থাকতে দেখল পারভেজ।
প্রথম ম্যাচে খুব বাজেভাবে হেরেছে পারভেজের দল। রনির সামনে দাঁড়াতেই পারেনি কেউ। একা হাতে ম্যাচ জিতিয়েছে সে। বিশেষ করে রনির দলের ফিল্ডিং ছিল অসাধারণ। এই জায়গাতেই পিছিয়ে গেছে পারভেজরা। তাদের ফিল্ডিং তেমন খারাপ কোনোকালেই ছিল না। নার্ভাসনেসের জন্যই কিনা এই অবস্থা! কে জানে?
সে যাই হোক। পেছন ফিরে তাকানো পছন্দ করে না পারভেজ। যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। আরও দুইটি ম্যাচ আছে। যা করার সেগুলোতে করতে হবে। না হলে বাইরে থেকে এসে তাদের এলাকায় তাদের হারিয়ে যাবে, মুখ দেখানোর অবস্থা থাকবে না। বিশেষ করে রিয়ার কাছে মান সম্মান সব চলে যাবে।
দ্বিতীয় ম্যাচের শুরু থেকেই অন্যরকম এক খেলা খেলল পারভেজের দল। যেন দাঁড়াতেই পারেনি রনি ও তাদের দলের খেলোয়াড়রা। ১০ ওভারের খেলায় ৩০ রানেই অল আউট। আর পারভেজদের জন্য ৩১ রানের লক্ষ্যপূরণ করতে লেগেছে ২৬ বল।
প্রথম ম্যাচে এত বাজেভাবে হারেনি পারভেজ এন্ড কো. তাই খুব খারাপ ভাবে ম্যাচটা হেরে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে অতিথিরা। তারা চেয়েছিলো এই ম্যাচেই সিরিজ জিতে পারভেজদের নাকানি চুবানি খাওয়াতে। কিন্তু তা আর হলো কই? উল্টো স্বাগতিকদের অসাধারণ কামব্যাকের গল্পে কিছুটা ব্যাকফুটে চলে গেছে রনিরা।
শেষ ম্যাচ তাই সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচ। দুই দলের যেই জিতবে সেই হাসি মুখে ফিরবে। টসে জিতে প্রথমে ফিল্ডিং বেছে নিলো পারভেজ। বল হাতে আগের ম্যাচের মতো দুর্দান্ত শুরু করতে না পারলেও মোটামুটি লড়াই করল। দশ ওভারে প্রতিপক্ষকে বেঁধে রাখল ৬৮ রানে। যেহেতু পাড়ার ক্রিকেট, এখানে ছয় মারলেই আউট। রনিদের তিনজন ছয় মেরে আউট হয়েছে।
সিরিজ জিততে পারভেজদের প্রয়োজন ৬৯ রান। সবাইকে অবাক করে ইনিংসের গোড়াপত্তন করতে নামলো পারভেজ। সচরাচর সে ওপেনিংয়ে নামে না। খুব ব্যতিক্রম শুরুতে ধীরেসুস্থে এক প্রান্ত আগলে রাখল সে। কিন্তু ওপর প্রান্তে একের পর এক উইকেট পড়ছে। মাঝে প্রলয় পারভেজের সাথে প্রতিরোধ গড়লেও ভুল শটে আউট সে। কিছুটা দুর্ভাগ্যও বটে। মাটি ঘেঁষে করা শট মাটিতে লাগেনি। সরাসরি বাউন্ডারি সীমানা পেরোনোতে ছয়, এবং আউট।
সাকিব আহমেদের গল্প “স্বপ্নে বাংলাদেশ, স্বপ্নের বাংলাদেশ”
এবার যা করার পারভেজকেই করতে হবে। শেষ ওভারে দরকার ৮ রান। ছয় বলে দুই চার মারলেই খেলা শেষ।
শেষ ওভারের ব্যাটিংয়ে আসার সময়, হঠাৎই উপরে চোখ গেলো পারভেজের। খুব মনোযোগে খেলা উপভোগ করছে রিয়া। একটু টেনশনে আছে মনে হলো। তা থাকাটাই অবশ্য স্বাভাবিক। খেলার এমন অবস্থায়, উত্তেজনায় টেনশন হওয়া অমূলক কিছু নয়। রিয়ার চোখে চোখ পড়ল পারভেজের। চোখের ভাষায় যেন অভয় দেওয়ার চেষ্টা করছে। বলতে চাইছে যেন, ভয় করতে নেই। এ লড়াইয়ে জয় হবেই।
রিয়া কি বলতে চেয়েছিলো, আদৌ কিছু বলতে চেয়েছিলো কিনা জানা নেই। তবুও রিয়ার চোখের তারায় সে আত্মবিশ্বাস খুঁজে নিয়েই শেষ লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হলো।
বল হাতে প্রস্তুত রনির করা প্রথম বলেই চার। শেষ পাঁচ বলে দরকার চার রান। একটি চারেই শেষ হতে পারে খেলা। এরপরের দুই বলে চেষ্টা করলেও বাউন্ডারি সীমানা পার হয়নি বল। রানের চেষ্টাও করেনি পারভেজ। জিততে হলে তাকেই স্ট্রাইকে থাকতে হবে। চতুর্থ বলে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ক্রিজ থেকে বেরিয়ে এসে সজোরে স্ট্রেইট ড্রাইভ পারভেজের। বুলেটের গতিতে ছুটে যাওয়া বল থামানোর সাধ্য ছিল না কারো।
বল সীমানা পেরিয়ে চার। সেই সাথে ম্যাচ জিতে নিয়েছে পারভেজরা। জিতেছে সিরিজ। আর বাজিতে হেরে মুখ কালো করে এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে রনির দল। অন্য পাশে পারভেজ-প্রলয়দের বিজয় উল্লাস!
সাকিব আহমেদের গল্প “বাঙালীয়ানা”
‘প্রলয়, এই প্রলয়।’ উপর থেকে কে যেন ডাকছে। প্রলয়ের সাথে পারভেজও তাকালো উপরে। রিয়া ডাকছে। এই প্রথম রিয়ার কণ্ঠ শুনতে পেলো পারভেজ। কি মিষ্টি কণ্ঠ! ‘উপরে আয় তো একটু।’ প্রলয়কে বলল রিয়া।
‘আপু, পড়ে আসি?’ বলল প্রলয়। ‘এখন তো সেলিব্রেশন করছি।’
‘না,’ বলল রিয়া। ‘এখনই আয়। কথা আছে।’ কি আর করার। এখনই আসছি, বলে চলে গেলো প্রলয়। নেমে এলো পাঁচ মিনিট পর।
‘তোমাকে রিয়া আপু দেখা করতে বলেছে।’ উপর থেকে নেমেই পারভেজকে বলল প্রলয়। ‘এখনই।’
‘আমাকে?’ অবাক হলো পারভেজ। ‘কেন?’
‘চলো, বলছি।’ বলে পারভেজকে হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। প্রলয় জানালো, রিয়াকে পড়াতে হবে পারভেজের। রিয়া ক্যামিস্ট্রিতে খুব দুর্বল। টিচার খুঁজছে। পারভেজ যদি পড়াতে পারে তাহলে আর টিচার খুঁজবে না।
‘আপু বলেছে, সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তুমি আজকের সিরিজ জেতাতে পারলে তোমার কাছে পড়বে।’ বলল প্রলয়। ‘এটা নাকি তোমার জন্য গিফট!’
গিফটই বটে। রনিদের হারানো আনন্দের। এই জয়ে একটি ছোট ট্রফি ঘরে যাবে, তবে সবচেয়ে বড় ট্রফিই যেন সে পেতে চলেছে। পারভেজের সচরাচর সবাইকে ভালো লাগে না। রিয়াকে প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে গিয়েছিলো। আর এই ভালো লাগা একটু একটু করে ভালোবাসায় রূপ নিয়েছে। আর সেই ভালোবাসার সাথে প্রথম দেখা, প্রথম কথা! রিয়াদের বাসার কলিং বেল চেপে পারভেজকে নিয়ে অপেক্ষা করছে প্রলয়।
সাকিব আহমেদের গল্প “বিজয়োল্লাস”
পেপার’স লাইফ/গল্প/সাকিব আহমেদ
সাকিব আহমেদের গল্প “কোভিড সাবস্টিটিউশন”

