সাকিব আহমেদ
‘ভাইয়া ওঠো, আর কত ঘুমাবে?’ – শিরিন ধাক্কা দিয়ে উঠানোর চেষ্টা করছে তার ভাইকে।
শিরিন তমালের চাচাতো বোন। ছোট চাচার মেয়ে। কিন্তু সম্পর্কে দুইজন আপন ভাইবোনের মতই। তমালের কোন বোন নেই। শিরিনকে তাই আপন বোনের মতই ভালবাসে তমাল। তমালের ছোট চাচার একমাত্র মেয়ে শিরিনও নিজের আপন ভাইয়ের মত সম্মান করে, ভালবাসে তমালকে। তমাল যেমন বংশের বড় ছেলে শিরিন তেমন বংশের ছোট মেয়ে। বয়সের বিস্তর ফারাক থাকলেও তাদের ভাইবোনের সম্পর্ক অনেকটা বন্ধুর মত।
শিরিনের ডাক শুনেও ওঠার কোনো নামই নাই তমালের।
‘ধুরো।’ – বিরক্তি প্রকাশ পেল শিরিনের কথায়। ‘এই ছেলেটাকে উঠানোর সাধ্য আমার নেই।’
একটু চুপ করে থেকে শিরিন বলল, ‘আর এক মিনিটের মধ্যে না উঠলে কিন্তু গায়ে ঠান্ডা পানি ঢেলে দিবো।’ শিরিনের এই এক কথাতেই ধড়মড়িয়ে উঠে বসল তমাল। ছোট বোনটি এই কাজ যে খুব ভাল করেই পারে জানা আছে বড় ভাইয়ের।
‘এইতো! গুড বয়।’ – খুশি হয়ে বলল শিরিন। ‘উঠে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে নাও। নামাজে যেতে হবে না?’
‘হুম’ – ছোট করে তমালের জবাব। ঘুমের রেশ এখনো কাটেনি।
আজ ঈদের দিন। কুরবানীর ঈদ। ঈদ মানেই খুশি। তবে তমালের কাছে ঈদের আনন্দটা একটু বেশিই। সেটা অবশ্য শিরিনের জন্যই। ঈদ হলেই দুই ভাইবোন একসাথে মিলিত হয়। তমাল থাকে ঢাকায়, আর শিরিন বাবা মায়ের সাথে চট্রগ্রামে থাকে। তাই বছরের দুই ঈদই ভরসা দুই ভাইবোনকে এক করার জন্য। ঈদের ঠিক ৩-৪ দিন আগেই ঢাকায় পাড়ি জমায় শিরিনরা। শুধু এই দুইজন নয়। ঈদ এলে তমাল ও শিরিনের চাচাতো ভাইবোন সব একসাথে হয়। এই আনন্দ আর কোনো কিছুতে হয় না। যেন যৌথ পরিবারের এক আমেজ। ছোটবেলা থেকেই যৌথ পরিবারের ভাব ছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি তারা। সময় গিয়েছে, সময়ের পরিক্রমায় বড় হয়েছে সবাই। অথচ আজো সেই ছোটবেলাকার মতই আনন্দ, উল্লাসে মেতে উঠে ভাইবোনরা একসাথে হলে।
এত কিছু ভাবতে ভাবতে মোবাইল ফোনে সময় দেখল তমাল। ভোর সাড়ে পাঁচটা বাজে। পাশে ছোট ভাই তপু ঘুমিয়ে আছে। তপু আর শিরিন পিঠাপিঠি। অবশ্য তপু একবছরের বড়। ছোট ভাইকে ডাক দিয়ে বিছানা ছেড়ে নামল।
গোসল করে ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে হালকা নাস্তা করে বাবা ও তপুর সাথে ঈদের জামাতে গেল তমাল। নামাজ পড়ে ফিরে এসে দেখলো বাসায় ওর জন্য অপেক্ষা করছে শিরিন।
‘এসেছো?’ – জিজ্ঞেস করল শিরিন।
‘দেখতেই তো পারছো।’ – তমালের জবাব। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘এভাবে একা একা বসে আছো যে?’
‘তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।’
‘কেন?’
‘ঘুরতে যাবো।’
‘কোথায়?’
‘আমি কি জানি? তুমি আমাকে নিয়ে যাও ঘুরতে।’ – সরল মিষ্টি ভাষায় ভাইয়ার কাছে বায়না ধরছে ছোট বোন।
কি যেন ভাবল তমাল। তারপর বলল, ‘ঠিক আছে। আগে দাদিকে সালাম করে আসি।’
দাদার বাসায় থাকে তমালরা। ঠিক যৌথ পরিবারের মত, দ্বিতীয় তলায় বড় চাচা থাকে। সেখানেই আছে দাদি। তমালরা তৃতীয় তলায় এবং ফুফু থাকে চতুর্থ তলায়। তাদের আরেক চাচা থাকে মিরপুরে। শিরিনের বাবা ছোট ও তমালের বাবা মেজো। শিরিনকে নিয়ে বড় চাচার ফ্ল্যাটে গেল তমাল।
সেখানে দাদিকে এবং বড় চাচা-চাচীকে সালাম করে ফুফুর ফ্ল্যাটে গেল দেখা করতে। সেখান থেকে ফুপা-ফুপিকে সালাম করে বেরিয়ে গেল। কুরবানীর ঈদ। এই ঈদে গরু জবাই দেখা এক আনন্দ। রাস্তায় ঘুরে ঘুরে গরু জবাই দেখছে দুই ভাইবোন। এমন সময় তমালের মোবাইল বেজে উঠেছে।
‘হ্যালো।’
‘তমাল ভাইয়া, তুমি কোথায়?’ – জনির ফোন। জনি তমালদের আরেক কাজিন। বড় চাচার ছেলে। জনির এক বড় বোন আছে অনি। বিয়ে হয়ে গেছে। এক ছেলে সন্তানও আছে তার। তমাল জনির দুই বছরের বড় আর অনি তমালের থেকে বড় বছর পাঁচেক।
‘আমি তো শিরিনকে নিয়ে একটু বাইরে এসেছি। ও ঘুরতে চাইছিল।’
‘আমি আসতে পারবো?’
‘অবশ্যই। কোথায় আছ এখন?’
‘বাসায়।’
‘তাহলে তপুকেও নিয়ে এসো।’
‘ঠিক আছে।’ – বলে ফোন কেটে দিল জনি।
‘কে ফোন করেছে? – শিরিনের প্রশ্ন।
‘জনি। আসবে বলল।’
খুশি মনে শিরিন বড় ভাইয়ের হাত ধরে ঘুরছে। ছোট চাচীর নির্দেশ। বোনের হাত যেন কোনো মতেই না ছাড়ে তমাল। ঘুরে ফিরে দেখছে গরু কুরবানী। এলাকায় এলাকায় ঘুরছে দু’জন। এমন সময় তাদের সাথে যোগ দিল জনি ও তপু। ভাইবোনদের মধ্যে ছোটখাট খুনসুঁটি, হাসি আনন্দে সময় পার হতে চলল আলোর বেগে। সেই সাথে আত্মীয় স্বজনদের বাড়ি ঘুরেও ঈদের কুশল বিনিময় করল তারা।
রাস্তায় হাটছে চারজন। হঠাৎ শিরিন জিজ্ঞেস করল, ‘মাইশা আপুরা কখন আসবে?’
মাইশা তাদের সেজো চাচার বড় মেয়ে। তমালের দুই বছরের বড়। মিরপুরে থাকে। মাইশার ছোট বোন জিনিয়া তমালের বয়সী। আর তাদের আরেক ছোট ভাই আছে ইফতি। এবার এসএসসি পরীক্ষা দিবে। ইফতি তমাল-শিরিনের মতই হই-হুল্লোড় করতে ভালবাসে।
‘কি জানি? বিকেলে মনে হয়।’ – জবাব দিল তমাল।
‘দুপুরে না আসার কথা?’ – জনির প্রশ্ন।
‘ফোন দিয়ে দেখি।’ – বলে মাইশা আপুর নম্বরে ডায়াল করল তমাল। রিং হচ্ছে। ওপাশ থেকে মিষ্টি মেয়েলী কন্ঠে মাইশা বলল, ‘হ্যালো।’
‘মাইশা আপু, ঈদ মোবারক।’
‘ঈদ মোবারক, তমাল। কেমন আছ?’
‘জ্বী, ভালো আছি। তোমারা সবাই ভালো আছ?’
‘হুম, আছি।’
‘তোমরা কখন আসবে?’
‘এইতো একটুপর বের হবো। মিরপুর থেকে আসতে যতক্ষন লাগে।’
‘ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি এসো।’
‘ওকে, ভালো থেকো। বাই।’
‘বাই।’
‘কি বলল?’ – তপু জিজ্ঞেস করল।
‘বলল তো একটু পর বের হবে।’ মাইশা আপু একটু পর বের হওয়ার কথা বললেও তমালের মনে শঙ্কা থেকেই গেলো। মেয়েমানুষ তো! সাজগোজে কত প্রহর পার হয় কে জানে।
মাইশা আপুরা আসুক বা আসতে সময় নিক, তমাল-শিরিনদের আনন্দে কোনো ভাটা পড়েনি। সারা এলাকা ঘুরে অবশেষে দুপুর একটার দিকে বাসায় আসলো তারা।
‘এইতো চার সৈনিক হাজির।’ – ছোটচাচী মজা করেই তাদের উদ্দেশ্যে বলল।
কিছু না বলে তমাল এক মিষ্টি হাসি ফিরিয়ে দিল। দুপুরের লাঞ্চ সেরে বিছানায় গা এলিয়ে দিল তমাল। শিরিন তার বাবার কাছে গেল সারাদিনের গল্প বলতে। খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, সারাদিনের হইচই। ক্লান্তিতে রাজ্যের ঘুম এসে ভর করছে চোখে। তন্দ্রা মতও এসে গেল। কতক্ষণ ঘুমিয়েছে বলতে পারবে না, মনে হয় এইমাত্র চোখ বুজেছে। এরমধ্যে শিরিনের ডাক কানে এলো।
‘ভাইয়া উঠো। মাইশা আপুরা এসে গেছে। উঠো না।’ – চিৎকার করে ডাকছে আর সমানে ধাক্কা দিচ্ছে। এভাবে কি ঘুমিয়ে থাকা যায়?
চোখ ডলতে ডলতে উঠে বসল তমাল। তমাল জানে মাইশা আপু, জিনিয়ারা আসা মানে তার ঘরেই আসর জমানো। তার প্রমাণ মিলল কিছুক্ষণ পরেই। মাইশা আপু চলে এসেছে। সাথে জিনিয়া, ইফতিও হাজির। তপু ও জনিও এসে গেছে।
‘কি খবর তমাল?’ – জিজ্ঞেস করল জিনিয়া।
‘এইতো ভালো। তোমরা ভালো আছো?
‘হুম, আছি।
‘এসো, বসো তোমরা।’ এক পাশে সরে সবাইকে বসার জায়গা করে দিল তমাল। সবাই বসল। বিছানার পাশে থাকা একটি গিটারে নজর পড়ল মাইশার।
‘ওইটা কার গিটার?’ – মাইশার প্রশ্ন।
‘আমার।’ – জবাব দিল তমাল।
‘তোমার মানে? তুমি গিটার বাজাও নাকি?’ – জিনিয়া অবাক।
‘এই টুকটাক শিখছি।’ – বলল তমাল।
‘কিন্তু কখনো তো বলো নি?’ – মাইশা বলল।
‘বলার কি আছে? শিখছি তো কিছুদিন হলো। ভালো মত আয়ত্ব করে নেই। তারপর সবাই জানবে।’
‘না মাইশা আপু। তমাল ভাইয়া অনেক ভালো গিটার বাজায়। শুনলে মুগ্ধ হয়ে যাবে।’ – শিরিন জানালো।
‘যাক ভালোই হলো। মাইশা আপুর কন্ঠে গান ও তমাল ভাইয়ার গিটারে জমবে বেশ।’ – ইফতির কন্ঠে খুশি খুশি ভাব।
‘তাহলে এখনই শুরু করা যাক’ – জিনিয়া আর ধৈর্য্য ধরে রাখতে পারছে না। তমালের গিটার শোনার ইচ্ছে তো আছেই।
‘ওকে।’ – বলে গিটার হাতে নিলো তমাল।
‘কি দিয়ে শুরু করব?’ – নিজেকেই যেন প্রশ্ন করল মাইশা।
‘তোমার ও রে নীল দরিয়া দিয়ে শুরু করো।’ – বাতলে দিল তমাল।
মাইশা অনেক সুন্দর গান গায়। কন্ঠ যেন যেকোনো গায়িকাকে হার মানায়। তমালের মনে হয় নিয়মিত গান গেলে তার মাইশা আপু খুব নাম করতে পারবে। আর মাইশার কন্ঠে ও রে নীল দরিয়া গান যেন মধু ছড়ায়। কিন্তু গানকে শখেই রাখতে চায় মাইশা। পেশা করার ইচ্ছা নেই।
গান শুরু হলো। মাইশার কন্ঠ আর তমালের গিটারের যুগলবন্দী যেন এক অদ্ভুত আবহ সৃষ্টি করল। গান শেষে সকলের করতালি ভালো লাগারই অংশ।’খুব ভালো গিটার বাজাও তুমি।’ – মাইশার কন্ঠে প্রশংসা।
‘থ্যাঙ্ক ইউ।’ – তমাল খুশি।
এভাবে একের পর এক গানে আড্ডার আসর জমে উঠল। একসময় তাদের ফুপাতো বোন ফারহানা আসলো তার জামাইকে ও ছেলে-মেয়েকে নিয়ে। বছর পাঁচেক আগে বিয়ে হয়েছে। ছেলে মঞ্জু ও মেয়ে সামিরা সব মামা-খালার নয়নের মনি। ভাগ্নে-ভাগ্নিকে মেয়ে সবাই যেন আরো খুশি। এরপর জনির বড় বোন অনিও তার ছেলে দীপকে নিয়ে হাজির। সবাই মিলে হইচই, আনন্দ উৎসবে মেতে উঠেছে। সময় যেন ফুড়ুৎ করে উড়ে চলেছে। এতেই তো আনন্দ, এতেই তো ভালো লাগা। ভাইবোনের এই মিলনমেলা যেন সব থেকে খুশির।
মাইশার গানে আরো মুখর তাদের আড্ডা। তমাল এক মনে গিটার বাজাচ্ছে। মাঝে মাঝে সবাই মিলে গাইছে, সুর দিচ্ছে মাইশার তালে। হঠাৎ বাঁধা দিল তপু।
‘এভাবে জমছে না। খেলার মত কিছু করলে কেমন হয়?
‘গানের কলি।’ – অনির সাজেশন
‘চলে।’ – সম্মত তমাল
‘লেডিস ভার্সেস জেন্টস?’ – মাইশার চ্যালেঞ্জ।
‘ওকে, সমস্যা নেই। উই আর রেডি।’ – ইফতি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করল।
একে একে নতুন, পুরোনো সব গানে যেন আনন্দ ছড়াতে থাকল। কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। সবাই খুশি মনে গান গাইছে, পারুক আর না পারুক। এটাই তো ঈদ। যেখানে সবথেকে বেশি আনন্দ মানুষের মনে বাসা বাঁধে।
রাত নয়টা। উপর মহল থেকে ডাক এসেছে। ডিনারের সময়। ইচ্ছে না থাকলেও অগত্যা সবাইকে যেতে হল। খাওয়া দাওয়ার পর যেন আসর আর জমছে না। সারাদিনের ক্লান্তিতে সকলেই বিধস্ত। কিছুক্ষণ পর মাইশা, জিনিয়া ও ইফতিকে ডাকতে তাদের মা এলো। এখন যাওয়ার সময়। যেতে হবে।
‘আরেকটু থাকি না মা।’ – জিনিয়ার আকুতি।
‘না মা। রাত হয়ে যাচ্ছে। দূরে যেতে হবে তো।’ – জিনিয়ার মা বলল।
‘ঠিক আছে।’ বিছানা থেকে নামল তিন ভাইবোন।
‘ভালো থেকো তমাল। আবার দেখা হবে।’ – বলল মাইশা।
‘ইনশাআল্লাহ।’ – ছোট করে তমালের জবাব।
এক এক করে সবাই চলে যেতে লাগল। ঈদের দিন শেষ। থেকে গেলো কেবল তমাল, শিরিন আর তপু। পরিবারের কনিষ্ঠতম দুই সদস্য তপু ও শিরিন সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্তির শেষ বিন্দুতে উপস্থিত। শিরিন তমালের কাঁধে আর তপু কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। তাদের আস্তে করে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে উঠল সে। ছাদের চাবি খুঁজে নিয়ে ছাদে যাচ্ছে তমাল। যখন কিছু ভালো লাগে না, ছাদে গিয়ে একা সময় কাটায়।
ছাদে দাঁড়িয়ে, ওই আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। ঈদের বাঁকানো চাঁদ যেন কেমন অদ্ভুত মায়ার সৃষ্টি করে, ভাবছে তমাল। দিনটি অনেক আনন্দের ছিল। ঈদের দিন বলে কথা। এই এক দিনেই তো সব ভাইবোন একসাথে হতে পারে। কত হাসি-ঠাট্টা, তামাশায় কেটে গেল দিনটি। ঈদ শেষ, সবাই এক এক করে চলে যাচ্ছে। আবার সেই একাকিত্বের জগৎ। কিছুটা যেন মন খারাপই হয়ে গেল। আবার আগামী ঈদের অপেক্ষা, এক বছর পর। এক বছর সময়টা অনেক, কত কি পরিবর্তন হতে পারে। তমাল বিশ্বাস করে তাদের এই ভাইবোনের সম্পর্কে কোনো পরিবর্তন আসবে না। অনেক বছর তো হলো, কিছুতেই কিছু পরিবর্তন হয় নি।
ভাইবোনের সম্পর্কগুলো এমনই থাক। খুনসুঁটি, ভালোবাসায় টিকে থাক। বেঁচে থাক, অটুট থাক সারাজীবন, প্রতিটিক্ষণ…

