২০১৬ সালের ১লা জুলাই, গুলসান-২ এর হলি আর্টিজান বেকারিতে নব্য জেএমবির পাঁচ জঙ্গি নৃশংসভাবে হত্যা করে দেশি বিদেশী ২০ জন নিরীহ মানুষকে।
১৫ ঘণ্টার জিম্মিদশায় তারা পায় তাদের কাঙ্ক্ষিত আন্তর্জাতিক প্রচার। কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম সিটি বলছে, এটিই ছিল জঙ্গিদের তাৎক্ষণিক লক্ষ।
দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও রোমহর্ষক হামলা ঘটে সেদিন। হলি আর্টিজান নৃশংসতার চার বছর পর আজ।
হলি আর্টিজানের ঘটনা বাংলাদেশকে উজ্জীবিত করে নতুন অঙ্গীকারে। আর তারই আলোকে বড় আকারের ১৭টিসহ বিভিন্ন অভিযানে, নেতৃত্বশূন্য ও ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় শুধু নব্য জেএমবি নয় সবগুলো জঙ্গি সংগঠনই।
সেদিনের জঙ্গি হামলায় দুই পুলিশ কর্মকর্তা ও ১৭ বিদেশি নাগরিকসহ মোট ২২ জন নিহত হন। কয়েকবার প্রস্তুতি নিয়েও রাতে অভিযান চালায়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো সদস্যদের পরিচালিত ‘অপারেশন থান্ডারবোল্টে’ অবসান হয় জিম্মিদশার। পুলিশের অভিযানে মৃত্যু হয় হামলাকারী পাঁচ জঙ্গির।
সংবাদ পেয়ে এসআই রিপন যখন আর্টিজানে যান তখন রেস্তোরাঁর ভেতর থেকে ‘আল্লাহ্ আকবর’ ধ্বনি শুনতে পান তিনি। এরপরই তাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি বর্ষণ ও বোমা নিক্ষেপ করা হচ্ছিল। একপর্যায়ে এসআই ফারুক হোসেন ও কনস্টেবল প্রদীপ চন্দ্র দাস মারাত্মক আহত হন। আহতদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে তাৎক্ষণিক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন এসআই রিপন।
হামলা শুরুর দুই ঘণ্টা পর আনুমানিক রাত সাড়ে ১০টায় সন্ত্রাসীরা আবারও পুলিশ অফিসার ও ফোর্সদের লক্ষ্য করে গ্রেনেড নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণ শুরু করে। এতে অন্তত ২৫ জন পুলিশ মারাত্মক জখমপ্রাপ্ত হয়।
মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে হার মেনে নেন বনানী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সালাহউদ্দিন খান। এর কিছুক্ষণ পরই মারা যান ডিবির সহকারী কমিশনার (এসি) মো. রবিউল করিম।
রাত দেড়টায় ইন্টারনেটে হামলাকারী পাঁচ তরুণের ছবি প্রকাশ করে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)। ২ জুলাই সকাল আনুমানিক ৭টা ৪০ মিনিট। জিম্মিদের উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করার জন্য অভিযান পরিচালনা করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন। ১২ থেকে ১৩ মিনিটের মধ্যেই সব সন্ত্রাসীকে নির্মূল করে ওই এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে তারা।
পরে নিহত ২০ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এদের মধ্যে নয়জন ইতালির নাগরিক, সাতজন জাপানের, একজন ভারতের ও তিনজন বাংলাদেশি।
এরপর জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে নামে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। চলে একের পর এক জঙ্গি আস্তানার সন্ধান। গ্রেফতার করা হয় প্রায় অর্ধশতাধিক জঙ্গি।
আটকের পর তাদের মুখে উঠে আসে নৃশংস সেই হামলার বর্ণনা। তারা জানায়, প্রায় দেড় বছর আগে পরিকল্পনা এবং দীর্ঘ প্রস্তুতি শেষে নৃশংস এ হামলা সরাসরি বাস্তবায়নে দায়িত্ব দেয়া হয় আত্মঘাতী পাঁচ জঙ্গিকে।
তারা জানায়, হামলার প্রথম ২০ মিনিটেই নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায়। তারা দেশি-বিদেশিদের গুলি করে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে বা গলাকেটে মৃত্যু নিশ্চিত করে। হত্যার পর ছবি তুলে অ্যাপের মাধ্যমে বাইরে অবস্থানরত নব্য জেএমবির নেতা তামিম চৌধুরী ও মারজানের কাছে পাঠায় তারা। তারা এতটাই নিষ্ঠুর ছিল যে, লাশের সারি মেঝেতে রেখেই খাবার খায়।
দুই বছরের বেশি সময় ধরে তদন্তের পর ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই এ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয় ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট।
২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন আদালত। রায়ে মামলার আট আসামির সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড ও একজনকে বেকসুর খালাস দেন আদালত। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেক আসামিকে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করা হয়।
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র্যাশ, আব্দুস সবুর খান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, হাদিসুর রহমান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ এবং মামুনুর রশিদ রিপন।
এছাড়া ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানকে বেকসুর খালাস দেন আদালত।

