সকালের এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি শুধু ক্লান্তিই দূর করে না, অনেকের জন্য এটি বেঁচে থাকার রসদ। কিন্তু কফির এই আসক্তি কি আপনার ধমনীতে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে? সাম্প্রতিক এক গবেষণায় কফি ও কোলেস্টেরলের এই জটিল সম্পর্ক নিয়ে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য, যা কফিপ্রেমীদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।
কফি কি সরাসরি কোলেস্টেরল বাড়ায়?
সাধারণভাবে আমরা যখন কোলেস্টেরলের কথা ভাবি, তখন চর্বিযুক্ত খাবার বা তেলের কথা মাথায় আসে। কফিতে কোনো প্রকৃত চর্বি বা কোলেস্টেরল নেই। তবে রহস্য লুকিয়ে আছে কফির ভেতরে থাকা কিছু প্রাকৃতিক তৈলাক্ত উপাদানে, যাদের বলা হয় ডাইটারপেনস (Diterpenes)। এই গোত্রের দুটি প্রধান উপাদান হলো ক্যাফেস্টল (Cafestol) এবং কাহুয়েল (Kahweol)।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই উপাদানগুলো সরাসরি রক্তে কোলেস্টেরল সরবরাহ করে না, বরং লিভারের সেই প্রক্রিয়াকে বাধা দেয় যা কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। ফলে পরোক্ষভাবে শরীরে এলডিএল (LDL) বা ‘খারাপ কোলেস্টেরল’-এর মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
কফি তৈরির পদ্ধতিই কি আসল ভিলেন?
সব কফি একইভাবে কোলেস্টেরল বাড়ায় না। এখানে মূল ভূমিকা পালন করে আপনার কফি তৈরির পদ্ধতি। আপনি যদি কফি ফিল্টার না করে পান করেন, তবেই এই ঝুঁকির সম্ভাবনা বেশি।
আনফিল্টারড কফি: ফ্রেঞ্চ প্রেস, তার্কিশ কফি বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান পদ্ধতিতে তৈরি কফিতে ক্যাফেস্টল এবং কাহুয়েল প্রচুর পরিমাণে থাকে। কারণ এই পদ্ধতিতে গরম পানি সরাসরি কফির গুড়োর সংস্পর্শে দীর্ঘক্ষণ থাকে এবং কোনো কাগজ বা সূক্ষ্ম ফিল্টার ব্যবহার করা হয় না।
ফিল্টারড কফি: সাধারণ ড্রিপ কফি বা পেপার ফিল্টার ব্যবহার করে বানানো কফিতে এই ক্ষতিকর তৈলাক্ত উপাদানগুলো ফিল্টারে আটকে যায়। ফলে আপনার রক্তে কোলেস্টেরল বাড়ার ঝুঁকি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
এসপ্রেসো: এসপ্রেসো প্রেমীদের জন্য কিছুটা দুঃসংবাদ আছে। এতে ফিল্টার ব্যবহার হয় না বলে এতেও ডাইটারপেনসের উপস্থিতি থাকে, যদিও এক কাপ এসপ্রেসোর পরিমাণ কম হওয়ায় এটি খুব বেশি ক্ষতি করে না। তবে দিনে কয়েক কাপ এসপ্রেসো পানের অভ্যাস আপনার কোলেস্টেরল প্রোফাইল বদলে দিতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য একনজরে
ক্যাফেস্টল: এটি কফির সবচেয়ে শক্তিশালী কোলেস্টেরল বৃদ্ধিকারী উপাদান।
পরিমাণ: গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন ৫-৬ কাপ আনফিল্টারড কফি পান করলে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা ৮-১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
উপকারিতা বনাম ঝুঁকি: কফিতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হৃদরোগ রোধে সাহায্য করলেও, অতিরিক্ত কোলেস্টেরল সেই সুফলকে ম্লান করে দিতে পারে।
দুগ্ধজাত পণ্যের ভূমিকা: কফিতে মেশানো ক্রিম, চিনি বা ফুল-ফ্যাট দুধ কোলেস্টেরল বৃদ্ধির জন্য কফির চেয়েও বেশি দায়ী হতে পারে।
স্বাস্থ্য সচেতনদের জন্য বিশেষজ্ঞ পরামর্শ
স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট ওয়েব এমডি-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যাদের আগে থেকেই উচ্চ কোলেস্টেরলের সমস্যা রয়েছে, তাদের কফি পানের ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া জরুরি। তবে এর অর্থ এই নয় যে কফি ছেড়ে দিতে হবে। বরং পানের ধরনে কিছুটা পরিবর্তন আনলেই ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আপনি যদি প্রতিদিন কয়েক কাপ কফি পানে অভ্যস্ত হন, তবে অবশ্যই পেপার ফিল্টার ব্যবহার করে কফি তৈরি করুন। এছাড়া কফিতে অতিরিক্ত ক্রিম বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট সমৃদ্ধ দুধ এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। ব্ল্যাক কফি বা লো-ফ্যাট দুধ দিয়ে বানানো ফিল্টার কফি হৃদযন্ত্রের জন্য অনেক বেশি নিরাপদ।

