ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ মানবাধিকার পুরস্কার পেল আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত



আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) বিশ্বজুড়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখার অদম্য লড়াইয়ে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং বিশ্ব মোড়লদের নজিরবিহীন রাজনৈতিক চাপের মুখে থেকেও সংস্থাটি লাভ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সম্মানজনক সাখারভ পুরস্কার, যা ইইউর সর্বোচ্চ মানবাধিকার স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত।

এমন এক সময়ে এই স্বীকৃতি আসল, যখন বৈশ্বিক রাজনীতির উত্তাপ ও ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা করা সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্য হেগে অবস্থিত এই আন্তর্জাতিক আদালতের প্রধান বিচারপতি তোমোকো আকে জানান, বর্তমান সংকটময় বাস্তবতায় এ পুরস্কার বিচারিক স্বায়ত্তশাসন ও সুশাসনের অপরিহার্যতা বিশ্বমঞ্চে নতুন করে তুলে ধরেছে।

বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিভিন্ন শক্তিশালী দেশের চোখরাঙানির মুখোমুখি হয়েছে। বিশেষ করে, বিশ্বের পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের চরম বিরোধিতা এবং একের পর এক নিষেধাজ্ঞার হুমকিতে আদালতের দৈনন্দিন বিচারিক কার্যক্রম চালানো জটিল হয়ে পড়েছিল।

এমনকি আদালতের বিচারক ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর নানা ধরনের ব্যক্তিগত বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, যাতে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দেওয়া যায়। তবে সব বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে নিরপেক্ষ বিচারিক নীতিতে অবিচল থাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত আজ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট রবার্টা মেটসোলা আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ী হিসেবে আদালতের নাম ঘোষণা করার সময় বলেন, কোনো ভয়ভীতি বা ক্ষমতার দাপট যে ন্যায়বিচারের পথ রোধ করতে পারে না, এই আদালত তা বারবার প্রমাণ করেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার প্রাপ্তির পর আদালতের প্রেসিডেন্ট বিচারপতি তোমোকো আকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেছেন। এক আবেগঘন ও দৃঢ় বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে স্বায়ত্তশাসিত বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখা ব্যক্তিরা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা এই পুরস্কারের মাধ্যমে পুনরায় প্রমাণিত হলো।

আকে জোর দিয়ে বলেন, “আইনের শাসন নিশ্চিত করা ছাড়া যেমন সার্বিক নিরাপত্তা রক্ষা অসম্ভব, তেমনি সত্যিকারের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া জগতে টেকসই শান্তি আসতেই পারে না। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার নয়; বরং এটি নিগৃহীত মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল।” তার মতে, রাষ্ট্রভিত্তিক দ্বন্দ্ব বা ক্ষমতার অপব্যবহার যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন কেবল আইনি কাঠামোই অপরাধীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি আইসিসির কর্মকর্তা ও তদন্তকারীদের লক্ষ্য করে যে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই সাখারভ পুরস্কার প্রদানকে তারই কড়া জবাব হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বিভিন্ন ব্লকের আইনপ্রণেতারা স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো একক রাষ্ট্রের আগ্রাসী অবস্থান কখনোই বিশ্বজনীন বিচারব্যবস্থাকে ভেস্তে দিতে পারে না।

ডাচ ও ইউরোপীয় ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্যরা আহ্বান জানিয়েছেন যেন শুধু পুরস্কৃত করেই ক্ষান্ত না হয়ে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে এই আদালতকে রক্ষা করতে ‘ব্লকিং স্ট্যাটিউট’ সহ নানা আইনি সুরক্ষাবলয় গড়ে তোলা হয়। এতে করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কোনো বিদেশি চাপ বা নিষেধাজ্ঞার ভয়ে স্থবির হয়ে পড়বে না এবং তাদের স্বতন্ত্র বিচার প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যেতে পারবে।