জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর সশস্ত্র হামলার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পাঁচজন পলাতক আসামিকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ট্রাইব্যুনাল-১ এর আদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য এএসএম মাকসুদ কামাল এবং লেখক ও অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালসহ নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের তিন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কথা বলা হয়েছে।
আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, আইনি বাধ্যবাধকতার অংশ হিসেবে পলাতক এই আসামিদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়ার জন্য জাতীয় দৈনিকে এই বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হবে। মামলার অপর তিন গুরুত্বপূর্ণ আসামি হলেন সদ্য নিষিদ্ধ হওয়া ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি মাজহারুল কবির। দেশে ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের মুখে ক্ষমতার পালাবদলের পর থেকেই এই আসামিরা জনসমক্ষ থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন।
গত জুলাই মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় দেশের শীর্ষ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এক নজিরবিহীন সহিংসতার সাক্ষী হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের সশস্ত্র ক্যাডাররা ভয়াবহ ও পরিকল্পিত হামলা চালায়। মামলার এজাহার ও প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, হেলমেট পরিহিত অস্ত্রধারীরা রড, লাঠিসোঁটা ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।
অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য এএসএম মাকসুদ কামাল তার প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিলেন। শুধু তা-ই নয়, হামলাকারীদের প্রতি তার প্রচ্ছন্ন সমর্থন ও পরোক্ষ মদদ দেওয়ার বিষয়টিও মামলার নথিতে উঠে এসেছে। অন্যদিকে, দেশের পরিচিত লেখক ও অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালের বিরুদ্ধেও এই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে অত্যন্ত বিতর্কিত ভূমিকা পালনের অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের ন্যায়সংগত আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা, আক্রমণাত্মক বয়ান তৈরি এবং উসকানিমূলক প্রচারণার মাধ্যমে তিনি মানবতাবিরোধী এই অপরাধে প্ররোচনা জুগিয়েছেন বলে প্রসিকিউশন পক্ষ ট্রাইব্যুনালে দাবি করেছে।
শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত সেই ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত প্রাণঘাতী হামলার ঘটনাটিকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যে ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত, ভিডিও ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দীর্ঘ তল্লাশি এবং সম্ভাব্য অবস্থানগুলোতে অভিযান চালানোর পরও তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এরই ধারাবাহিকতায় বিচারিক প্রক্রিয়ার পরবর্তী আইনি ধাপ হিসেবে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে তাদের আত্মসমর্পণের এই চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হলো।

