গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ: অবহেলা মানেই মা ও শিশুর জীবনঝুঁকি


গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ: অবহেলা মানেই মা ও শিশুর জীবনঝুঁকি

গর্ভাবস্থায় একজন নারীর শরীরে হরমোনের যে বিশাল ওলটপালট ঘটে, তার প্রভাব সরাসরি পড়ে রক্তচাপের ওপর। চিকিৎসকদের মতে, এই সময়ে উচ্চ রক্তচাপকে অবহেলা করলে মা ও গর্ভস্থ শিশুর স্থায়ী ক্ষতি, এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তাই সঠিক সময়ে শনাক্তকরণ ও সতর্কতা এখন সময়ের দাবি।


নীরব ঘাতক যখন গর্ভাবস্থা

গর্ভাবস্থা একটি নারীর জীবনে যেমন আনন্দের, তেমনি শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনের দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়। এই সময়ে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে রক্তচাপের ওঠানামা স্বাভাবিক মনে হলেও, তা যখন নির্দিষ্ট মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, তখন চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘জেস্টেশনাল হাইপারটেনশন’ বলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি প্রি-একলাম্পসিয়ার মতো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গর্ভাবস্থায় শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। এই হরমোনগুলো মূলত ভ্রূণের বিকাশে সাহায্য করলেও রক্তনালির স্থিতিস্থাপকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে রক্তনালি সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং হৃদযন্ত্রকে সারা শরীরে রক্ত সঞ্চালন করতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চাপ প্রয়োগ করতে হয়। এটাই মূলত রক্তচাপ বৃদ্ধির প্রধান কারণ।

হরমোনের খেলা ও শারীরিক জটিলতা

গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপের নেপথ্যে কেবল হরমোন নয়, বরং আরও কিছু জৈবিক কারণ কাজ করে। যখন একজন নারী গর্ভধারণ করেন, তখন তার শরীরে রক্তের পরিমাণ প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে যায়। এই বাড়তি রক্ত পাম্প করতে হৃদপিণ্ডকে অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। যদি হরমোনের প্রভাবে রক্তনালিগুলো সংকুচিত থাকে, তবে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে।

চিকিৎসকদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০ সপ্তাহের পর যদি রক্তচাপ ১৪০/৯০ মিমি পারদ বা তার বেশি হয়, তবে তাকে বাড়তি গুরুত্ব দিতে হবে। এটি কেবল মায়ের কিডনি বা লিভারের ক্ষতি করে না, বরং গর্ভস্থ শিশুর পুষ্টি ও অক্সিজেন সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায়। ফলে শিশুর ওজন কম হওয়া বা সময়ের আগে প্রসবের (Pre-term birth) ঝুঁকি বেড়ে যায়।


ঝুঁকির মুখে কারা? দ্রুত চেনার উপায়

সব গর্ভবতী নারীর রক্তচাপ বাড়বে এমন নয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি থাকে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিচের লক্ষণ বা পরিস্থিতিগুলো থাকলে বাড়তি সতর্কতার বিকল্প নেই:

  • তীব্র মাথাব্যথা: যা সাধারণ ওষুধে সারে না।

  • দৃষ্টিশক্তির সমস্যা: ঝাপসা দেখা বা আলোর ঝিলিক দেখা।

  • শরীরে জল আসা: হাত, পা বা মুখ অতিরিক্ত ফুলে যাওয়া।

  • পেটে ব্যথা: বিশেষ করে পাঁজরের ঠিক নিচে তীব্র ব্যথা অনুভূত হওয়া।

  • প্রস্রাবের পরিবর্তন: প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া বা প্রোটিনের উপস্থিতি।


জীবনযাত্রায় পরিবর্তনই কি সমাধান?

গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে চিকিৎসার পাশাপাশি জীবনযাত্রার পরিবর্তন অপরিহার্য। লবণ খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং মানসিক চাপমুক্ত থাকা এক্ষেত্রে ওষুধের মতোই কাজ করে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ সেবন করা ভ্রূণের জন্য মারাত্মক হতে পারে। নিয়মিত প্রসবপূর্ব পরীক্ষা বা এন্টিন্যাটাল চেকআপের (ANC) মাধ্যমে রক্তচাপের নিয়মিত রেকর্ড রাখা এখন বাধ্যতামূলক বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য ও পরিসংখ্যান

গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপের প্রভাব নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের কিছু পর্যবেক্ষণ লক্ষ্যণীয়:

  • বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫-১০ শতাংশ গর্ভবতী নারী এই সমস্যায় ভোগেন।

  • প্রসবকালীন মাতৃমৃত্যুর একটি বড় কারণ হলো রক্তচাপজনিত খিঁচুনি বা একলাম্পসিয়া।

  • অতিরিক্ত ওজন এবং বংশগত উচ্চ রক্তচাপ থাকলে ঝুঁকি প্রায় তিনগুণ বেড়ে যায়।

  • প্রথমবার মা হওয়ার ক্ষেত্রে এবং যমজ সন্তান ধারণ করলে সতর্ক থাকা জরুরি।


গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ কোনো সাধারণ শারীরিক অসুস্থতা নয়, বরং এটি একটি সতর্কবার্তা। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সহায়তায় এবং সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয়ের মাধ্যমে এই ঝুঁকি প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। সচেতনতাই পারে একটি সুস্থ মা ও একটি সুস্থ শিশুর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে। মনে রাখবেন, গর্ভাবস্থায় মায়ের সুস্থতার ওপরই নির্ভর করে আগামীর একটি সুস্থ প্রজন্ম। তাই ছোট কোনো উপসর্গকেও অবহেলা না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া একান্ত প্রয়োজন।