প্লাস্টিকের বদলে ব্যবহৃত হচ্ছে কলাপাতা!



আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বাজার থেকে আমরা কতকিছুই না ক্রয় করে থাকি। আর সেসব জিনিসপত্র আমরা বেশীরভাগ সময়ে পলিথিনের ব্যাগে করেই বহন করি। কিন্তু যদি পলিথিনের বদলে ব্যবহার হয় কলাপাতার!

শহরে কলাপাতার তেমন কোনো ব্যবহার চোখে না পড়লেও গ্রামে এখনো এর প্রচলন রয়েছে।

কলাপাতার ব্যবহার অনেকটাই চাপা পরে গেছে প্লাস্টিক আর পলিথিনের কারনে। কিন্তু বর্তমানে প্রাকৃতিক উপাদান কলাপাতার ব্যবহার বাড়তে দেখা যাচ্ছে এশিয়ার বিভিন্ন সুপারমার্কেটে।

এর মধ্যে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম এর বিভিন্ন সুপারমার্কেট গুলো অন্যতম। সেখানকার অভিজাত বিপণিকেন্দ্রগুলোর এমন উদ্যোগ নেয়ার কারন প্লাস্টিকের ব্যবহার হ্রাস করা।

পরিবেশ সম্পর্কিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে, আশঙ্কাজনক হারে সারা বিশ্বে বাড়ছে প্লাস্টিকজনিত দূষণ। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একজন মানুষ প্রতি সপ্তাহে হজম করছে ৫ গ্রাম পরিমাণ প্লাস্টিক।

এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন পানীয় সহ খাদ্যদ্রব্যে পাওয়া যাচ্ছে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা। গবেষকগণ বলছেন, ধীরেধীরে এটি বৈশ্বিক সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। পুরো বিশ্বে ২০০০ সাল থেকে যে পরিমাণ প্লাস্টিক উৎপাদন করা হচ্ছে তা বিগত বছরগুলোতে উৎপাদিত মোট প্লাস্টিকের সমান। যার এক তৃতীয়াংশই প্রকৃতির সংস্পর্শে সরাসরি আসছে।

এই প্লাস্টিক দূষণের মাত্রা অঞ্চলভেদে কমবেশি হয়ে থাকে। প্লাস্টিক দূষণ নেই এমন কোনো স্থান এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে নেই।

গবেষকরা আরো বলেন, শুধুমাত্র পানি থেকেই প্রতি সপ্তাহে ১ হাজার ৭৬৯টি প্লাস্টিক কণা গ্রহণ করছে মানুষ। ইউরোপের পানিতে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্লাস্টিক দূষণ কম। যুক্তরাষ্ট্রে কলে সরবরাহ করা পানির প্রতি লিটার পানিতে থাকে গড়ে ৯ দশমিক ৬টি প্লাস্টিক ফাইবার। আর ইউরোপের পানির প্রতি লিটারে পাওয়া গেছে ৩ দশমিক ৮টি প্লাস্টিক ফাইবার।

গোটা বিশ্বে সমুদ্রের পানিতে প্লাস্টিক দূষণের দিক থেকে ভিয়েতনাম রয়েছে চতুর্থ স্থানে। এজন্যই প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশ রক্ষার জন্য তারা বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, সবজির মোড়ক হিসেবে ভিয়েতনাম এর দোকানীরা পলিথিনের বদলে কলাপাতা ব্যবহার করছে এমন এক পোস্টে তাদের প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছে ফেইসবুক ব্যবহারকারীরা। সর্বপ্রথম সবজির মোড়ক হিসেবে কলাপাতার ব্যবহার শুরু করে দেশটির রাজধানী হ্যানয়ে সাইগন ইউনিয়ন অব ট্রেডিং কো-অপারেটিভস নামের একটি ভিয়েতনামভিত্তিক কোম্পানি ও থাইল্যান্ডের রিটেইল কোম্পানি বিগ সি।

কলাপাতায় পণ্য বেঁধে বিক্রি সর্বপ্রথম শুরু করে থাইল্যান্ডের চাইমাই শহরে অবস্থিত রিম্পিং সুপারমার্কেট। এরপর ভিয়েতনাম বাজারেও একই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় যখন এই খবরটি ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের বিক্রিও এতে বেড়েছে। এভাবেই এই প্রক্রিয়া গোটা দেশে ধীরেধীরে ছড়িয়ে পরে।

লোটে মার্ট নামক ভিয়েতনামভিত্তিক একটি কোম্পানিও দেশটির হো চি মিন শহরে সবজির মোড়ক হিসেবে প্লাস্টিকের পরিবর্তে কলাপাতা ব্যবহার করছে। যদিও এসব কোম্পানি এখন কলাপাতা পরীক্ষামূলক হিসেবেই ব্যবহার করছে। অন্যদিকে থাইল্যান্ডের স্টোরগুলোকে অনুকরণ করে সাইগন করপোরেশন, বিগ সির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো শুরু করেছে কলাপাতার প্যাকেজিং।

এগুলো তারা তাদের দোকানে প্রদর্শন করছে বিকল্প প্যাকেজিং হিসেবে। ভিয়েতনাম গণমাধ্যমকে লোটে মার্টের এক প্রতিনিধি জানান, ‘এখন পরীক্ষামূলকভাবে স্বল্প পরিসরে কলাপাতা ব্যবহার করা হলেও খুব শীঘ্রই এটি দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া হবে’। তিনি আরো জানান মাংস বিক্রিতেও তারা কলাপাতার ব্যবহার করতে চান। তাদের এ প্রচেষ্টা প্রচুর প্রশংসা পাচ্ছে ক্রেতাদের থেকে। যখন আমি সবজিগুলো কলাপাতা দিয়ে সুন্দরভাবে মোড়ানো অবস্থায় দেখলাম, তখন আমার অন্য দিনের চেয়ে একটু বেশি সবজি কেনার ইচ্ছা হলো। আমি মনে করি, এই পদক্ষেপ স্থানীয় লোকজনকে পরিবেশ সুরক্ষা সম্পর্কে আরও সচেতন করবে। মনে হচ্ছিল, কেনার উৎসাহ দ্বিগুণ বেড়ে গেছে’ এমনটাই জানিয়েছেন হোয়া নামের এক স্থানীয় ক্রেতা।

গণমাধ্যমটি আরো জানায়, কলাপাতার ব্যবহারকে স্বাগত জানানো হচ্ছে ভিয়েতনামে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে। শস্যদানা থেকে তৈরি পরিবেশবান্ধব ব্যাগ ব্যবহার করছে বিগ সির মতো প্রতিষ্ঠান। প্লাস্টিকের ব্যাগ প্রত্যাহারের প্রবণতা বাড়ছে এশিয়ায় বিভিন্ন সুপারমার্কেটে। বর্তমানে অপচনশীল প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে দক্ষিন কোরিয়া। প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার কমানোর ব্যাপারে সিঙ্গাপুরের সুপারমার্কেট গুলোতে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করতে এর দাম বেশী নির্ধারণ করছে তাইওয়ান এর দোকানগুলো। গত এক দশকে চীনে প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার কমেছে ৬৬ শতাংশ। চীন ২০০৮ সালে পাতলা প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ করে।