মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূ-রাজনীতি আর হরমুজ প্রণালীর দীর্ঘস্থায়ী জটিলতা কাটাতে কৌশলী পথে হাঁটল বাংলাদেশ। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবার হরমুজের বিপদসংকুল পথ এড়িয়ে লোহিত সাগর হয়ে সরাসরি সৌদি আরব থেকে এক লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) আমদানির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালী এখন আক্ষরিক অর্থেই বিশ্ব রাজনীতির এক ‘ডেডলক’। যেখানে একের পর এক তেলবাহী ট্যাংকার আটকা পড়ছে, সেখানে বাংলাদেশ বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছে সৌদি আরবের ইয়ানবু কমার্শিয়াল পোর্টকে। লোহিত সাগরের উপকূলে অবস্থিত এই বন্দর থেকে তেলবাহী জাহাজটি কোনোপ্রকার ঝুঁকি ছাড়াই সরাসরি চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পৌঁছাবে। আগামী ২০ এপ্রিল জাহাজটিতে তেল লোড করার কথা রয়েছে।
হরমুজে আটকা পড়া তেলের নেপথ্য সংকট
এই বিকল্প পথের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয় যখন আমরা দেখি ‘এমটি নরডিক পলুকস’ নামক তেলের ট্যাংকারটির দিকে। বর্তমানে এক লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল নিয়ে জাহাজটি সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে নোঙর করে আছে। কিন্তু সমস্যা বেঁধেছে ভৌগোলিক অবস্থানে। রাস তানুরা থেকে বাংলাদেশে আসতে হলে জাহাজটিকে অবশ্যই হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করতে হবে। আর সেখানেই দরকার ইরানের বিশেষ ছাড়পত্র।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরান বাংলাদেশের জন্য ছয়টি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিলেও, দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো—এই তেলের জাহাজটি সেই তালিকার অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে আইনি ও ভূ-রাজনৈতিক জটিলতায় ১ লাখ টন তেল এখন সাগরের মাঝেই অনিশ্চিত গন্তব্যে থমকে আছে। মূলত এই অচলবস্থা থেকেই শিক্ষা নিয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয় লোহিত সাগর রুট ব্যবহারের সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ইয়ানবু থেকে চট্টগ্রাম: কেন এই পথ সেরা?
সৌদি আরবের পশ্চিম উপকূলের ইয়ানবু বন্দরটি লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত। এখান থেকে জাহাজ সরাসরি ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করতে পারে, যার ফলে ইরান বা ওমান উপকূলের স্পর্শকাতর জলসীমায় প্রবেশের কোনো প্রয়োজন পড়ে না। এতে শুধু যে সময়ের সাশ্রয় হবে তা-ই নয়, বরং যুদ্ধের কারণে বীমা খরচ বৃদ্ধি বা জাহাজ জব্দের মতো বড় ঝুঁকি থেকেও বাংলাদেশ মুক্ত থাকবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি সুদূরপ্রসারী কৌশলগত বিজয়। কারণ, দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে মজুত কমে এলে অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। সময়মতো ১ লাখ টন তেল পৌঁছালে সেই ঝুঁকি অনেকটাই প্রশমিত হবে।
একনজরে তেলের বাজার ও পরিবহন পরিস্থিতি:
নতুন চালানের পরিমাণ: ১ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল।
বিকল্প রুট: লোহিত সাগরের ইয়ানবু কমার্শিয়াল পোর্ট থেকে সরাসরি চট্টগ্রাম।
আটকে পড়া জাহাজ: ‘এমটি নরডিক পলুকস’ (রাস তানুরা বন্দরে অবস্থানরত)।
ইরানের অবস্থান: ছয়টি বাংলাদেশি জাহাজকে অনুমতি দিলেও তেলের ট্যাংকারটি এখনো ছাড়পত্র পায়নি।
গুরুত্বপূর্ণ তারিখ: আগামী ২০ এপ্রিল বিকল্প রুটের তেলের চালান লোড হওয়ার সম্ভাবনা।
জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন দিগন্ত
বর্তমানে বিশ্ববাজারে তেলের দামের অস্থিরতা আর সমুদ্রপথের নিরাপত্তাহীনতা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) কর্মকর্তারা মনে করছেন, ইয়ানবু রুটটি সফলভাবে ব্যবহৃত হলে ভবিষ্যতে সৌদি আরব থেকে তেল আমদানির ক্ষেত্রে এটিই হবে নিয়মিত রুট।
হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতা পুরো বিশ্বের সরবরাহ চেইনকে ওলটপালট করে দিলেও, বাংলাদেশের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপ দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। কূটনৈতিক পথে সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আটকা পড়া জাহাজটির জন্য অপেক্ষার পাশাপাশি এই বিকল্প পথই এখন ঢাকার জ্বালানি নিরাপত্তার রক্ষাকবচ।

